সমরেশের টাকার উৎস ভাবাচ্ছে পুলিশকে

দোতলা বাড়ি, সামনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অনর্গল ডাকাডাকিতেও সোমবার তা খোলেনি। বাড়ির পিছনে পাঁচিলের গায়ে ছোট লোহার গেট।

Advertisement

বিতান ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:৪৭
Share:

দোতলা বাড়ি, সামনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অনর্গল ডাকাডাকিতেও সোমবার তা খোলেনি। বাড়ির পিছনে পাঁচিলের গায়ে ছোট লোহার গেট। পড়শিরাই চেনাচ্ছেন— দুর্গাপুরের ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সমরেশ সরকারের পৈতৃক বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশের সেই দ্বিতীয় পথ।

Advertisement

পঞ্চাননতলার এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন সমরেশের বাবা কুমুদরঞ্জন। পুরনো বাড়ি, বেশ কিছু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। জানালার গ্রিলে মরচে। খাঁ খাঁ দোতলা বাড়ির একতলার তিনটি ঘরেই অগোছালো আসবাব। মাঝের ঘরে কাঠের সিংহাসনে সার দিয়ে অসংখ্য ঠাকুর-দেবতার ছবি। সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা সে ছবির সামনে উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছেন আর নাগাড়ে বিড় বিড় করছেন—‘হে গোবিন্দ রক্ষা কর আমার ছেলেটাকে।’ কখনও বা দেবতার পায়ে হাত ঠেকিয়ে অঝোরে আকুতি তাঁর, ‘‘আমার কালু এমন কাজ করতে পারে না ঈশ্বর, ও কথা কানে নিও না!’’

শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে জানাচ্ছেন, হাত কেটে গেলে যে ছেলে রক্ত সহ্য করতে পারে না, চোখ বন্ধ করে ফেলে সে ছেলে মানুষ কাটতে পারে? আবার নিজের মনেই কখনও বা বলে ফেলছেন, ‘‘তবে যদি সত্যিই এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার সঙ্গে ও জড়িত থাকে তা হলে আমি ওকে চরম শাস্তি দেব।’’ পুতুলরানির বড় ছেলে কুমারেশ একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তেমন স্বচ্ছল নয় অবস্থা, পড়শিরা এমনই দাবি করেছেন। তাঁর কাছেই থাকেন বৃদ্ধা। সেই হতশ্রী সংসারের হাল ধরেছিলেন সমরেশই। এমনই দাবি পুতুলরানির। তাঁর মাইনের টাকাতে পৈতৃক বাড়ির সংস্কার হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সমরেশের স্ত্রী উৎসাও। একতলা সারানোর পরে দোতলায় হাত পড়েছে। প্লাস্টারের কাজ প্রায় শেষ। উৎসাদেবী বলছেন, ‘‘টাকার টানাটানি চলছিল। অনেক টাকা ঋণ হয়ে গিয়েছে। এক দিকে বাড়ি ভাড়া, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, অন্য দিকে, আনন্দপুরী হরিসভায় নতুন ফ্ল্যাটের জন্য মোটা টাকা দেওয়া, সেটাকে সাজানোর প্রস্তুতি নেওয়া কম টাকার ধাক্কা তো নয়? এর মধ্যে বাড়িটাকেও সারিয়ে দোতলা করা, সাজানো গোছানো সব তো ও একা হাতে সামলাচ্ছিল।’’

Advertisement

সে কি শুধুই তাঁর উপার্জিত মাইনে না আয়ের অন্য কোনও উপায় ছিল? দুর্গাপুরের জনা কয়েক ব্যাঙ্ক গ্রাহকের কথায় কিন্তু সে সন্দেহ মিলেছে। আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীরা জানেন না, কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের মামড়াবাজার শাখার গ্রাহকদের কয়েক জনের অভিযোগ, ঋণ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ইদানীং মোটা টাকা দাবি করতেন সমরেশ। তবে চেনা গণ্ডিতে সমরেশের সে স্বভাব অচেনা। সেখানে তিনি নিরীহ, নিপাট ভদ্রলোক।। ব্যারাকপুরে কখনও কারও কাছে হাত পেতেছেন এমন নজির নেই।

চাকরির গোড়া থেকেই দূরে দূরে থেকেছেন সমরেশ। তাঁর মায়ের দাবি, ‘‘কিন্তু কী সুন্দর সকলকে নিয়ে সংসার সামলেছে। আগের রবিবার এ বাড়ির জন্য বাজারহাট করে পাঠালো।’’ সোমবার সকালে উৎসাদেবী মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় কলেজে গিয়েছিলেন। সে দিনই কুমারেশবাবুও অফিসের কাজে রাঁচি গিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি। পঞ্চাননতলার প্রতিবেশীরাও সমরেশবাবুকে চেনেন কম কথার, শান্ত স্বভাবের মানুষ বলে। প্রবীণ বাসিন্দা শান্তনু মণ্ডল বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকেই দেখেছি খুব কম কথা বলত।’’ সে ছেলে এমন হয়ে উঠল? ঘোর কাটছে না ব্যারাকপুরের।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement