এ ভাবেই জমিতে আলু ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। রাজকুমার মোদকের তোলা ছবি।
অতিরিক্ত ফলন এবং উপযুক্ত দাম না পাওয়া এই সাঁড়াশি চাপে রাজ্যে একই দিনে আত্মঘাতী হলেন দুই আলুচাষি। ঘটনাস্থল, রাজ্যের প্রধান দুই আলু উৎপাদক জেলা হুগলি ও বর্ধমান। আগেও চাষ করে দাম না পেয়ে আলুচাষিদের আত্মহত্যা দেখেছে এ রাজ্য। কিন্তু এ বারে চাষিদের দাবি, সে সব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে মরসুমের শেষ পর্বে। যখন চাষিদের কাছে সেই অর্থে ফসল বিক্রি করে টাকা ফিরে পাওয়ার রাস্তা প্রায় বন্ধ। এ বার মাঠ থেকে আলু ওঠা শুরু হতে না হতেই জোড়া আত্মহত্যাকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন কৃষির সঙ্গে যুক্তরা। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই রাজ্য সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।
ভাল আবহাওয়া এবং সে ভাবে রোগ বা পোকার আক্রমণ না হওয়ায় রাজ্যে আলুর ফলন এ বার অনেকটাই ভাল। গত বার ফলন ছিল ৮৫ লক্ষ টন। চাষিদের দাবি, এ বার আলু হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টন। তার উপরে যোগ হয়েছে মজুত রাখার সমস্যা। রাজ্যে এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় হিমঘর কম। যেটুকু জায়গা আছে, তা তুলনায় সম্পন্ন চাষিরা নিয়ে নেওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের পক্ষে আলু মজুত করা এক রকম অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই আবহেই আলুর দাম কমতে শুরু করেছে। শহরাঞ্চলের বাজারে জ্যোতি আলু প্রতি কিলো ১০ থেকে ১১ টাকা হলেও গ্রামাঞ্চলে ওই আলু বিক্রি করে গড়ে বড় জোর কেজি প্রতি ২-৩ টাকা আসছে চাষির হাতে! কোথাও তার থেকেও কম!
সম্প্রতি এই সমস্যার মোকাবিলায় ৫০ হাজার টন আলু সরকারি ভাবে সহায়ক মূল্যে কেনার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এখনও আলু কিনতে শুরু করেনি সরকার। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সহায়ক মূল্যে আলু কেনার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গে হুগলির বৈঁচি থেকে উত্তরবঙ্গের ধূপগুড়ি রাস্তায় আলু ফেলে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন চাষিরা। পথ অবরোধও করা হয় বহু জায়গায়।
বিঘা চারেক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন খানাকুলের কেটেদল গ্রামের কৃষিজীবী স্বপন কুণ্ডু (৫৫)। এ দিন সকালে বাড়ি লাগোয়া গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর দেহ মেলে। স্বপনবাবুর স্ত্রী শিখার দাবি, “সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন স্বামী। বস্তাপিছু (৫০ কেজি) ১৫০ টাকা দরে আলু বিক্রি করে কী ভাবে ধার শোধ করবেন, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন।” ফলন নিয়ে চিন্তা থেকেই বর্ধমানের ভাতারের আলুচাষি গুড্ডু মুর্মু (৫০)ও আত্মঘাতী হন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।
আত্মঘাতী স্বপনবাবুর পড়শি আলুচাষি চঞ্চল কুণ্ডুর বক্তব্য, “বিঘাপিছু আলু চাষের খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা। ১৫০ টাকা দরে ৫০ কেজি আলু বেচে স্বপনবাবুর বিঘাপিছু পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে এলাকার সব আলুচাষিই এখন কম-বেশি হতাশ!”
বর্ধমানের আলুচাষিরা আবার সমস্যার অন্য দিকটি তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, মাঠ থেকে ৪০ শতাংশ আলু এখনও তোলাই হয়নি। তার মধ্যেই জেলার হিমঘরগুলি ভর্তি হয়ে গিয়েছে! কৃষি দফতর সূত্রে খবর, জেলার ১১৭টি হিমঘরে প্রায় ১৩ লক্ষ টন আলু মজুত করা সম্ভব। সেখানে এ বার জেলায় ফলন হয়েছে ২৩ লক্ষ টনের কাছাকাছি। ফলে, মাঠ থেকে আলু আর তুলছেনই না চাষিরা।
বর্ধমানের গুশকরায় হিমঘর আলু নিতে না চাওয়ার প্রতিবাদে গত রবিবার বোলপুর-বর্ধমান রাজ্য সড়কে অবরোধ করেন চাষিরা। এ দিন ঠিক একই কারণে ধূপগুড়ির কিছু চাষি ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। ওই চাষিদের বক্তব্য, “ব্যবসায়ীরা এখন আলুর দর দিচ্ছেন না। হিমঘরে আলু রাখার জায়গা নেই। সরকার কিছু না করলে, আমরা যাব কোথায়?”
সহায়ক মূল্যে আলু কেনা ছাড়াও এ বার চাষিদের কাছ থেকে ২ লক্ষ টন আলু কিনে ব্যবসায়ীরা ভিন্-রাজ্যে বা বিদেশে রফতানি করতে পারবেন বলে ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। ব্যবসায়ীরা অবশ্য দাবি করেছেন, আলু কিনে লাভ করার মতো পরিস্থিতি নেই তাঁদেরও। কারণ অসম, ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যগুলিতে এ বার আলুর ফলন ভাল। এ রাজ্য থেকে এক মাত্র পঞ্জাব কিছুটা আলু কিনবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে তাঁদের ২ লক্ষ টনের ‘কোটা’ পূর্ণ হবে না।
সম্প্রতি বিধানসভায় আলুর দাম নিয়ে বামেদের প্রশ্নের জবাবে কৃষি বিপণনমন্ত্রী অরূপ রায় দাবি করেন, “আলুর অভাবী বিক্রি হচ্ছে বলে খবর নেই সরকারের কাছে।” যদিও এ দিন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু বলেন, “আলুর কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই তার থেকে কিছু বেশি দর দিয়ে সরকার চাষিদের থেকে আলু কিনবে।” তবে সহায়ক মূল্য ঠিক কত হবে বা কবে থেকে সরকারি ভাবে আলু কেনা শুরু হবে, তা নিয়ে মন্তব্য করেননি কৃষিমন্ত্রী।
‘প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতি’র রাজ্য সম্পাদক বরেন মণ্ডলের কথায়, “গত দু’বছর রাজ্য সরকার এখান থেকে আলু রফতানিতে কড়াকড়ি করায় এখান থেকে আলু কেনায় উৎসাহ হারিয়েছেন ভিন্-রাজ্যের ক্রেতারা। সরকার এখনই আলু কেনা শুরু না করলে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
(চলবে)