উচ্ছেদের প্রতিবাদে হকার সুরক্ষা সমিতির ডাকে বিক্ষোভ মিছিলে বাম ও কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা। দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে। — নিজস্ব চিত্র।
হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-আন্দোলনের গতি রাজ্য জুড়ে আরও বাড়ছে। ‘আন্তর্জাতিক হকার দিবসে’র দিন, মঙ্গলবার বামেদের পাশাপাশি এ বার পথে নামল কংগ্রেসও। উচ্ছেদ-প্রশ্নে নবগঠিত বিজেপি সরকারকে তীব্র নিশানা করে হকারদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। বিরোধীদের এমন ধারাবাহিক সক্রিয়তায় শাসক শিবিরেও চাপ বাড়ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ। এই প্রেক্ষিতেই হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টিকে সামনে রেখে বিজেপি বিধায়কদের একাংশ রেলের সঙ্গে কথাও বলেছেন।
তৃণমূল নেত্রী মমতা এ দিন বলেছেন, ‘যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার হকারদের উপরে অত্যাচার চালাচ্ছে, উচ্ছেদ করছে, তাঁদের দোকান ভেঙে দিচ্ছে, তাঁদের চোখের জলকে তোয়াক্কা না-করে পথে বসাচ্ছে, সেটা দেখে আমি বিস্মিত, ক্রুদ্ধ, মর্মাহত। অত্যাচারীরা এর জবাব নিশ্চয়ই পাবে।’ হকার প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়, ‘হকার-আইন, ২০১৪’-র কথাও উল্লেখ করেছেন মমতা। তবে ‘হকার যৌথ মঞ্চ’ আগেই অভিযোগ করেছিল, ‘হকার-আইন ২০১৪’ অনুযায়ী সাবেক তৃণমূল সরকার হকার সংগঠন এবং কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘টাউন ভেন্ডিং কমিটি’ গঠন করেনি এবং আইন প্রয়োগে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না, এই দাবিতে ‘দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন রেলওয়ে হকার যৌথ সংগ্রাম কমিটি’র ডাকে দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কংগ্রেসের (সদর) সভাপতি তাপস মজুমদার-সহ অন্যেরা। হকারেরা ২৯ মে-র মধ্যে উঠে না-গেলে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রেল পুলিশ। তার প্রেক্ষিতেই প্রতিবাদ আরও জোরালো হচ্ছে। আইএনটিইউসি-র পাশাপাশি সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু-র নেতা-কর্মীরাও প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। ছিলেন সদ্য হয়ে যাওয়া বিধানসভা ভোটে দমদমের সিপিএম প্রার্থী ময়ূখ বিশ্বাস-সহ অন্যেরা। প্রতিবাদ মিছিলে পাশাপাশি হেঁটেছেন শুভঙ্কর, ময়ূখ। এই প্রেক্ষিতে বিধানসভা ভোটের আগে যে কংগ্রেস সমঝোতা করতে চায়নি, তারাই কেন বামেদের পাশাপাশি একসঙ্গে প্রতিবাদে যোগ দিল, তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে দুই শিবিরেই। তবে প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর বলেছেন, “গরিব, খেটে খাওয়া মানুষের এই লড়াইয়ে যে কোনও দল-মত-রঙের মানুষ জড়ো হতে পারেন। এর সঙ্গে দলীয় রাজনীতি গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।’’ তাঁর সংযোজন, “মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ে অমানবিক ভাবে হকার উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছিলেন। এখন এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া দরকার।” ময়ূখের বক্তব্য, “রেল কর্তৃপক্ষ, রেল হকার সংগঠন এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে উন্নয়ন ও জীবিকার মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান বার করা জরুরি। কিন্তু উন্নয়নের নামে গরিবের রুটি-রুজি কাড়া যাবে না।”
উচ্ছেদের নোটিসের প্রতিবাদে মিছিল করেছে ‘দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন রেলওয়ে হকার যৌথ সংগ্রাম কমিটি’। ওই কমিটিতে বাম এবং কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনের সদস্যেরা রয়েছেন। তাঁরা রেলের আধিকারিকের কাছে দাবি জানান, আলোচনা কিংবা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। দাবি পূরণ না-হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামা হবে।
এরই মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় বর্ধমান স্টেশনে গিয়ে স্থানীয় হকারদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আরপিএফ-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বর্ধমান দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। বিধায়ক জানিয়েছেন, স্টেশন লাগোয়া এলাকায় উচ্ছেদের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের জীবিকার সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেই এই পদক্ষেপ। রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন বিধায়ক। মৌমিতার বক্তব্য, “কোনও পরিবারের রুজি-রুটির উপরে যাতে আঘাত না-আসে, তা মাথায় রাখা দরকার।” বর্ধমান স্টেশনের আরপিএফের এক আধিকারিক জানান, কত উচ্ছেদ হয়েছে এবং এখনও কত জন হকার রেলের জায়গায় রয়েছেন, সে সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন বিধায়ক।
সিটু-র ডাকে গত কয়েক দিনের মতো এ দিনও গড়িয়া, হালিশহর, নুঙ্গি, আগরপাড়া, টিটাগড়-সহ রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। হালিশহরে সিটু-র সঙ্গে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছিল সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের শ্রমিক সংগঠন এআইসিসিটিইউ। পাশাপাশি, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না-সহ শ্রমক্ষেত্র সংক্রান্ত ৩৩টি দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছে এসইউসি-র শ্রমিক সংগঠন এআইইউটিইউসি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে