Coronavirus

অজ্ঞতা এবং গুজবে বেড়ে যাচ্ছে সমস্যা

না-জানা আর গুজবে-বিশ্বাস — নোভেল করোনাভাইরাসের মোকাবিলায় এই দুইয়ের সঙ্গেই আপাতত লড়তে হচ্ছে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার স্বাস্থ্য দফতরকে। 

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২০ ০৯:১৯
Share:

ফাইল চিত্র

সবাই হঠাৎ করে মুখ ঢেকে ঘুরছে কেন, বুঝতে পারছেন না বিষ্ণুপুরের মড়ার পঞ্চায়েতের ভীমারডাঙা গ্রামের বধূ। কুদরির মাচা তৈরি করতে করতে বৃহস্পতিবার বললেন, ‘‘ফোন করলেই একটা লোক কাশছে। একটা রোগের কথা বলছে। ব্যাপারটা কী, খুব একটা বুঝতে পারছি না। ছেলেমেয়েগুলো টিউশনে যায়। চিন্তায় থাকি।’’

Advertisement

বাঁকুড়া শহরে বেসরকারি সংস্থার চাকুরে যুবক আবার বেশ বেপরোয়া। বলছিলেন, ‘‘গরম এলাকায় এই রোগ হয় না। ভয়ের কিছুই নেই।’’ কথা বলে জানা গেল, ‘সোশ্যাল মিডিয়া’য় ঘোরা গুজবের ভরসাতেই এ ভাবে ‘নিশ্চিন্ত’ রয়েছেন তিনি। না-জানা আর গুজবে-বিশ্বাস — নোভেল করোনাভাইরাসের মোকাবিলায় এই দুইয়ের সঙ্গেই আপাতত লড়তে হচ্ছে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার স্বাস্থ্য দফতরকে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চিনের উহান প্রদেশে প্রথম নোভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এটির চরিত্র এখনও পুরোপুরি বুঝে ওঠার চেষ্টা করছেন পৃথিবীর তাবড় চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা। নতুন ভাইরাসকে ঠেকিয়ে রাখার লড়াইটা বেশ কঠিন। দুই জেলার স্বাস্থ্য-কর্তারাই পরামর্শ দিচ্ছেন, সরকার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জারি করা নির্দেশিকার উপরে ভরসা রাখতে। অন্য কোনও গুজবে কান না দেওয়ার জন্য পইপই করে সতর্ক করছেন তাঁরা।

Advertisement

পথে নেমেছে প্রশাসন। খবরের কাগজ বা টিভিতে নিরন্তর চলছে প্রচার। ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ও ছেয়ে গিয়েছে এই সংক্রান্ত কথাবার্তায়। সব মিলিয়ে, নোভেল করোনাভাইরাসের নামটা দুই জেলার অধিকাংশ মানুষেরই শোনা। বৃহস্পতিবার নানা এলাকায় ঘুরে এমনটাই দেখা গেল। বিষ্ণুপুরের বেলশুলিয়ার বাসুদেবপুরের এক খেতমজুর বলছিলেন, ‘‘শুনলাম, গলা ব্যথা বা জ্বর হলে দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া চলবে না। হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু সেখানে তো খুব ভিড়।’’ তিনি শুনেছেন, ‘মাস্ক’-এ মুখ ঢেকে ঘোরা দরকার।

তেমনটাই জানেন রঘুনাথপুর থানার সামনের এক ফল বিক্রেতা, হাটতলার আনাজ বিক্রেতার মতো দুই জেলার অসংখ্য মানুষ। বান্দোয়ান সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে চিলাট্যাড় আর রিঠোগোড়া গ্রাম। নাম শোনা থাকলেও সেখানে অনেকেই জানেন না এই রোগের লক্ষণগুলি। অনেকে যেমন গুজবের ভিত্তিতে মুরগির মাংস খাওয়া ছেড়েছেন বলে জানা গেল। ঝালদার নামোপাড়ার একটি ইটভাটার মহিলা শ্রমিক বললেন, ‘‘পোল্ট্রির মুরগি থেকে রোগটা বাড়ছে বলে সে দিন গল্প হচ্ছিল। অনেকে নাকি এতে মারাও যাচ্ছে।’’ রঘুনাথপুর পুরসভার কাছে একটি মিষ্টির দোকানের কর্মচারিরা জানালেন, রোগের লক্ষণ তাঁরা জানেন না। তবে মালিকের কথায় রোজ স্নান করে দোকানে ঢুকছেন।

অনেকেই দাবি করেছেন, এলাকায় স্বাস্থ্য দফতর কোনও শিবির করেনি। স্বাস্থ্য দফতর জানাচ্ছে, আশাকর্মী বা অঙ্গনওয়াড়িকর্মীদের মতো নিচুতলায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দিয়ে মানুষকে সচেতন করতে চাইছে তারা। কিন্তু হঠাৎ হাজির হওয়া বিপত্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেটা করতে কিছুটা সময় লাগছে। তার উপরে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ আর মুখে মুখে ফেরা নানা গুজবের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে। পুরুলিয়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক (‌জেলা পরিষদ) আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর নিজেও এক জন চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘‘নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা দরকার। রাস্তাঘাটে কিছু ছুঁলে হাতে ভাইরাস চলে আসতে পারে। কিন্তু সংক্রমণটা হয় মুখের থেকে। ফলে, ঘনঘন হাত পরিষ্কার করা খুব জরুরি। আর জরুরি সামাজিক কিছু সুঅভ্যাস গড়ে তোলা।’’

পার্থপ্রতিম প্রধানও জানান, এই ভাইরাসের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটা যেমন জরুরি, তেমনটাই জরুরি ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আটকানো। এ জন্য রাস্তাঘাটে কেউ যাতে থুতু না ফেলেন, হাঁচি-কাশির সময়ে মুখ ঢেকে রাখেন— তা সামাজিক ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘স্বাস্থ্য দফতরের পাশাপাশি সেই দায়িত্ব প্রতিটি ব্যক্তিরও।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement