আম, আঙুরের পরে লাল মাটিতে শুরু বেদানা চাষও

বাঁকুড়ার আমের স্বাদ পিছনে ফেলে দিয়েছে মালদা, মুর্শিদাবাদকেও! মাস খানেক আগেই কলকাতার আম মেলায় নিজের কদর প্রমাণ করে বাঁকুড়া জেলা স্বাদে সেরার পুরস্কার নিয়ে এসেছে। তাক লেগে গিয়েছিল আম প্রেমিকদের। এ বার এই জেলার লাল মাটির কাঁকুড়ে জমিতে ফলবে টকটকে লাল বেদানা! যা কি না বদলে দিতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতিকেও।

Advertisement

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৪৫
Share:

চলছে বেদানা গাছের পরিচর্যা। ছবি: অভিজিৎ সিংহ।

বাঁকুড়ার আমের স্বাদ পিছনে ফেলে দিয়েছে মালদা, মুর্শিদাবাদকেও! মাস খানেক আগেই কলকাতার আম মেলায় নিজের কদর প্রমাণ করে বাঁকুড়া জেলা স্বাদে সেরার পুরস্কার নিয়ে এসেছে। তাক লেগে গিয়েছিল আম প্রেমিকদের। এ বার এই জেলার লাল মাটির কাঁকুড়ে জমিতে ফলবে টকটকে লাল বেদানা! যা কি না বদলে দিতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতিকেও। জাতীয় বেদানা গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা অন্তত এমনই আশার কথা শোনাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, চারা পাঠিয়ে জেলায় একশো দিনের প্রকল্পে রীতিমতো বাগান গড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে বেদানা চাষ।

Advertisement

জেলার বাঁকুড়া ১, ওন্দা, সিমলাপাল ও রানিবাঁধ ব্লকের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে পরীক্ষামূলক ভাবে বাগান গড়ে বেদানা চাষের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মাস খানেক আগেই। ইতিমধ্যেই ব্লকগুলিতে জায়গা চিহ্নিত করে চারা পোঁতার কাজও শেষ হয়ে গিয়েছে বলে জানাচ্ছে জেলা এমজিএনআরইজিএস সেল। প্রতি হেক্টর জমিতে ৭৪০টি চারা লাগানো হয়েছে। লালমাটির বাঁকুড়ার জন্য ‘ভাগবা’ জাতের সাড়ে তিন হাজার হাজার বেদানা চারাও জাতীয় বেদানা গবেষণা কেন্দ্রের তরফে পাঠানো হয়েছে জেলায়। বাগান গড়ার পাশাপাশি তালড্যাংরায় উদ্যানপালন দফতরের ফার্ম হাউসেও কিছু চারা চাষ করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই জাতীয় বেদানা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা জেলার বেদানা বাগান পরিদর্শনও করে গিয়েছেন।

এমনিতে বেদানা চাষ এই রাজ্যে সে ভাবে দেখাই যায় না। তা ছাড়া রাঢ়বঙ্গ বাঁকুড়ায় বেদানা চাষের সম্ভাবনাই বা কেমন তা নিয়েও অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় বেদানা গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর রামকৃষ্ণ পালের অবশ্য দাবি “শুধু বাঁকুড়াই নয়, গোটা রাঢ়বঙ্গেই এই চাষের সম্ভাবনা প্রবল।” তিনি জানান, মূলত কম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকার ঢালু জমিতেই বেদানা চাষ হয়। রাঢ়বঙ্গে বৃষ্টিপাত এমনিতেই কম হয়। তাছাড়া ঢালু মোরাম জমিরও অভাব নেই এখানে। ফলন কেমন পাওয়া যেতে পারে? রামকৃষ্ণবাবু জানান, বেদানা গাছে ফল আসে দুই থেকে আড়াই বছরের মাথায়। ধীরে ধীরে ফলন বাড়ে। পাঁচ বছরের মাথায় এক একটি বেদানা গাছে অন্তত ১৫০টি বেদানা ফলে। বছরে একবারই বেদানার ফলন হয় শীত নয়তো বর্ষা বা শরৎকালে।

Advertisement

বাঁকুড়ার আবহাওয়ায় এই তিনটি মরসুমের মধ্যে কোন সময়টিতে ফলন হবে তা পরীক্ষামূলক চাষের পরেই জানা যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “ফল হিসেবে বাজারে বেদানার চাহিদা মারাত্মক। তাছাড়াও এই ফল থেকে ওয়াইনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক রঙ, প্রসাধনী নানা জিনিস তৈরি করা যেতে পারে। বাজারে এই সবের চাহিদা ব্যাপক।” তাঁর অভিমত, বেদানা চাষের এই উদ্যোগে বাঁকুড়ার অর্থনৈতিক দিকে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

বছরে একশো দিনের প্রকল্পে গত কয়েক বছর ধরেই জেলায় স্থায়ী সম্পদ গড়ার নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ডিভিসি-র পরিত্যক্ত ছাইয়ে ইটভাটা গড়া হয়েছে বাঁকুড়া ১ ব্লকে। যেখানে নিয়মিত কাজের সুযোগ পেয়েছেন বহু মানুষ। ওন্দার রামসাগরে এই প্রকল্পে পুকুর কেটে ডিমপোনা চাষও করা হচ্ছে। যার দায়িত্বে রয়েছে একাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী। জেলার একাধিক ব্লকে একশো দিনের কাজ প্রকল্পে প্রায় ২৫৩টি আম বাগান গড়া হয়েছে। যার দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে প্রায় ৫০০ গোষ্ঠীর হাতে। ফি বছর আম বিক্রি করে এই গোষ্ঠীগুলির পাঁচ হাজার পরিবার আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন বছর-বছর। এই উদ্যোগের জন্য কেন্দ্রীয় পুরস্কারও পেয়েছে বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন।

জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসুর কথায়, “একশো দিনের প্রকল্পে আম বাগান, ইটভাটা গড়ে বা পুকুর কেটে মাছচাষ করে বহু মানুষকেই স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা আমরা করে দিতে পেরেছি। আমি নিশ্চিত বেদানা বাগান গড়ার প্রকল্পেও আমরা একই রকম সফল হব।” তিনি জানান, একশো দিনের কাজের প্রকল্পে আরও নানা নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা নেওয়া হচ্ছে। সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া জেলার একশো দিনের প্রকল্প আধিকারিক বাবুলাল মাহাতো বলেন, “জাতীয় বেদানা গবেষণা কেন্দ্র বাঁকুড়ায় এই চাষে এগিয়ে এসেছে। ওই কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের নজরদারিতেই এই চাষ হবে। আপাতত চারটি বাগান চারটি গোষ্ঠীর হাতে দেওয়া হচ্ছে।” অচিরেই গোটা জেলায় এই চাষ ছড়িয়ে পড়বে বলে আশাবাদী তিনি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement