ক্ষতিপূরণ চেয়ে ইঁদপুরের ব্রাহ্মণডিহা গ্রাম পঞ্চায়েতে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ।—নিজস্ব চিত্র
বছরে একশো দিন কাজের প্রকল্পে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে আস্ত আমবাগান গড়ে গোটা দেশের নজর কেড়েছিল বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন। কয়েক হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী সেই আমবাগান থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে ফি বছর। একই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ইঁদপুরেও। তবে আম ফলার আগেই কয়েকশো বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা বাগানের হাজার খানেক চারা ঝলসে গেল আগুনে! এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে গ্রাম জুড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বিক্ষোভ দেখান ওই জন্য বাগানের জমিদাতা ও এলাকাবাসীরা।
মঙ্গলবার দুপুরে ইঁদপুর ব্লকের ফুলকুসমা গ্রামের আমবাগানে অগ্নিকাণ্ড হয়। খবর পেয়ে বাঁকুড়া দমকল বাহিনীর একটি ইঞ্জিন কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে অবশ্য ওই বাগানের বেশির ভাগ চারাই আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে এ দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্থানীয় ব্রাহ্মণডিহা গ্রাম পঞ্চায়েতে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ দেখান বাগানের জমিদাতারা। পঞ্চায়েত অফিসের গেটে পোস্টার ঝুলিয়ে ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তেরা। তাঁদের অভিযোগ, এই অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নয়। বরং এর পিছনে কোনও দুষ্কৃতী চক্রের হাত রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তেরা।
ইঁদপুরের বিডিও তপনকুমার দাস জানিয়েছেন, ব্লক প্রশাসনের তরফে ইঁদপুর থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ভাবেও ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশও জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পিছনে কারও হাত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমবাগানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার প্রসঙ্গে জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু বলেন, “ঘটনাটি দুঃখজনক। বহু মানুষের বার্ষিক আয় সুনিশ্চিত করার জন্যই আমরা এই প্রকল্প নিয়েছিলাম। ঘটনাটি সম্পর্কে আমি বিশদে খোঁজ নেব।’’
ওই পঞ্চায়েত সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই বিশাল আমের বাগান গড়ে তোলা হয়েছিল। বাগানে আলফান্সো থেকে শুরু করে ল্যাংড়া, আম্রপালির মতো সাতটি প্রজাতির প্রায় সাড়ে ৯ হাজার আমের চারা লাগানো হয়েছিল। গ্রামের প্রায় ৮০ জন মানুষ বাগান গড়তে ৩০০ বিঘা জমি দান করেছিলেন। সাতটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে আমবাগান চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য তথা আমবাগানের অন্যতম জমিদাতা শান্তিময় পাঠক জানান, শর্ত অনুযায়ী বাগানের আম-ফলনের ৫০ শতাংশ পাবেন জমিদাতারা। ৪০ শতাংশ পাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি। বাকি ১০ শতাংশ যাবে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতের তহবিলে। লভ্যাংশের ওই টাকা দিয়ে পঞ্চায়েত আম বাগান রক্ষণাবেক্ষণ করবে, এমনই ঠিক হয়েছিল।
ওই বাগানের আমের চারাগুলির এখনও ফলন দেওয়ার মতো গড়ন হয়নি। তবে, গত বছর মুকুল এসেছিল গাছগুলিতে। জমিদাতা বাসবজেতা পাঠক, তরুণেশ পাত্র, অমিয় পাত্রেরা জানান, গাছগুলি যাতে বাড়তে পারে, তার জন্য গত বছর মুকুল কেটে ফেলা হয়েছিল। তবে এই বছর কয়েক’টি গাছে আম হত। তাঁদের ক্ষোভ, “গ্রামের মানুষের লাভ হবে ভেবেই আমরা জমি দিয়েছিলাম। কিন্তু, সেই লাভের মুখ আর দেখা হল না! তার আগেই দুষ্কৃতীদের লাগানো আগুন ছারখার করে দিল আমাদের স্বপ্নকে।’’
ব্রাহ্মণডিহা গ্রাম পঞ্চায়েতটি বর্তমানে বামেদের দখলে রয়েছে। পঞ্চায়েতের ১৮টির মধ্যে ১০টি আসন রয়েছে বামেদের দখলে। আটটি আসন তৃণমূলের। ফলে, বাগান পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি নিয়েও কিছুটা রাজনৈতিক কাজিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূল সদস্য শান্তিময়বাবুর অভিযোগ, বাগানটি নিয়মিত পরিচর্যা করত না পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ। তার জন্য বাগানে অনেক আগাছা গজিয়ে উঠেছিল। তাঁর বক্তব্য, “আগাছাগুলি না থাকলে হয়তো আগুন লাগলেও এত বড় ক্ষতি এড়ানো যেত। পঞ্চায়েতের উদাসীনতাই এই ঘটনার জন্য দায়ী।’’ অভিযোগ অস্বীকার করে পঞ্চায়েত প্রধান দ্রৌপদী সিংহ সর্দারের দাবি, “বাগান পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিন স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে। তারা ঠিকঠাক সাফাই কাজ চালাতো কিনা, খোঁজ নেব”।
গত কয়েক বছরে বাঁকুড়া জেলায় প্রায় ২৯২টি আমবাগান গড়া হয়েছে বছরে একশো দিনের কাজ প্রকল্পের আওতায়। কয়েক হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা সেই আম বিক্রি করে উপকৃত হন। একশো দিনের কাজ প্রকল্পে স্থায়ী সম্পদ গড়ে মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করে কেন্দ্রীয় পুরস্কারও পেয়েছে জেলা প্রশাসন। বাঁকুড়ার বাগানের আমই গত বছর রাজ্য আম মেলায় মালদহ, মুর্শিদাবাদের আমের স্বাদকে পিছনে ফেলে সেরা হয়েছিল। জেলায় এখনও কিছু আমবাগান গড়ার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন জেলার একশো দিনের কাজ প্রকল্পের আধিকারিকি সৌভিক মুখোপাধ্যায়।