এ ভাবেই সেজে উঠছে মণ্ডপ।—নিজস্ব চিত্র।
মণ্ডপময় বিভিন্ন মুখোশ। ছোট থেকে বৃহদাকার নানা আকারের মুখোশে ছয়লাপ। টালিগঞ্জের কাছে হরিদেবপুর অজেয় সংহতির মণ্ডপ সেজে উঠেছে রাবণ, জটায়ু, হনুমান, রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন-সহ রামায়ণের বর্ণময় চরিত্রে। আর এই মণ্ডপ সজ্জার নেপথ্যে রয়েছেন পুরুলিয়ার সেই বাঘমুণ্ডির চড়িদা গ্রামের ছৌ মুখোশ শিল্পীরা। কিশোর সূত্রধর, তাঁর বাবা দ্বিজেন সূত্রধর-সহ গ্রামের দশ-বারোজন শিল্পী টানা একমাস ঘাঁটি গেড়েছেন কলকাতায়। তাঁরাই হাতের কাজে ফুটিয়ে তুলছেন এই মণ্ডপ ভাবনা।
মণ্ডপের দেওয়ালে রাম-রাবণের যুদ্ধের কাহিনী বা সীতাকে বাঁচাতে জটায়ুর লড়াই সহ রামায়ণের নানা দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ। পুরুলিয়ার বীররসের ছৌ নাচে যে ধরনের মুখোশ ব্যবহার করা হয়, সেই মুখোশেই সেজে উঠছে মণ্ডপ। শিল্পী কিশোরের কথায়, ‘‘মণ্ডপের গোটা ভাবনাটা ফুটিয়ে তুলতে ৫৪০টি মুখোশ লাগছে। মুখোশগুলির বেশির ভাগ পুরুলিয়ায় তৈরি করা হয়েছে। তিন মাস আগে থেকে বাড়িতে কাজ শুরু করেছিলাম। কিছু মুখোশ মণ্ডপেও তৈরি করেছি। সেগুলি বেশ বড়। রঙের বেশির ভাগ কাজ অবশ্য কলকাতাতেই করেছি।’’
মণ্ডপের মূল তোরণে ৩০ ফুটের জটায়ু, ৫০ ফুটের জটায়ু, বড় রাবণের মুখ-সহ মণ্ডপের গায়ে রামায়ণের বিভিন্ন দৃশ্যাবলী শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন পুরাণের বিভিন্ন চরিত্রের মুখোশ ব্যবহার করে। টানা একমাসের নিরলস পরিশ্রমের পর মহালয়ার দিনে চড়িদা ঘুরে যাওয়ার পথে কিশোরের বাবা দ্বিজেন সূত্রধর বললেন, ‘‘পুরুলিয়ার ছৌ নাচের তো একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। আমরা সেই সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। তার জন্য আমরা পরিশ্রমে কোনও খামতি দিইনি।’’
গোটা বছর এই পুজোর দিকে চেয়ে থাকেন চড়িদার শিল্পীরা। পুজো মানে তাঁদের কাছে দুটো পয়সার মুখ দেখা। গত বৈশাখ মাসে এই পুজো কমিটি তাঁদের বায়না করেছিল বলে জানালেন কিশোর। তাঁর কথায়, কমবেশি আট লক্ষ টাকায় বায়না হয়েছিল। বায়নার পর থেকেই কাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা। ৫০০-র বেশি মুখোশ তৈরি করতে বেশ সময় লেগেছে। মাটি, কাপড়, কাগজ ভিজিয়ে বারবার প্রলেপ দিয়ে শুকোতে সময় লাগে। তাই হাতে সময় থাকতেই তাঁরা কাজে নেমে পড়েছিলেন।
পুজো কমিটির কর্মকর্তা রাহুল সাউ বলেন, ‘‘এ বার আমাদের মণ্ডপ ভাবনা পুরাণ। মণ্ডপে বড়বড় পাথর রয়েছে। সেই পাথরের গায়ে শিলালিপির মতো খোদাই করে পুরাণের কাহিনী বর্ণিত করা হয়েছে। চড়িদার শিল্পীরাই আমাদের মণ্ডপ তৈরি করছেন। আর প্রতিমা তৈরি হয়েছে ডোকরার আদলে। সব মিলিয়ে জঙ্গলমহলের শিল্পীদের দিয়েই মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে।’’
কিশোরের সঙ্গে শিল্পীরা যেমন টানা একমাস ধরে কলকাতার এই মণ্ডপে রয়েছেন, তেমনই চড়িদার আর এক মুখোশ শিল্পী জগদীশ সূত্রধরের সঙ্গেও শিল্পীদের আর একটি দল ঘাঁটি গেড়েছে গড়িয়ার কাছে বোড়ালে। তিনিও মহালয়াতে চড়িদা ছুঁয়ে গেলেন। জগদীশবাবু জানালেন, তাঁরা ছৌ এর আদলে প্রতিমা তৈরি করছেন। মুখোশগুলি এখানে তৈরি করে তাঁরা নিয়ে গিয়েছেন। তাঁরা মণ্ডপে তুলে আনছেন চড়িদা গ্রামটিকেই। গ্রামের মাটি ও খড়ের ছাউনি দেওয়া বাড়ি, ধানখেত, মেঠো রাস্তা সবই তুলে আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে রয়েছে ছৌ নাচও। এখন অনুশীলনে ব্যস্ত ছৌ দলের শিল্পীরা। এই দলের ওস্তাদ দিলীপ মাহাতো বলেন, ‘‘কলকাতায় সমঝদার দর্শকের সামনে পালা করতে হবে। আমাদের উপরে পুরুলিয়ার সুনাম অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব।’’