আপাতত ঠাঁই মেয়ের বাড়িতে। রবিলোচন ও মঞ্জু গড়াই।— নিজস্ব চিত্র।
একটি মাত্র ঘর। সেখানেই থাকতেন বাবা-মা ও ছোট ছেলে। কাজ হারিয়ে বড়ছেলে সপরিবারে এসে বাবা-মাকে সেই ঘর থেকেই উৎখাত করলেন। পরে দুই ভাই মিলে বাবা-মাকে মারধর করে একেবারে বাড়ি ছাড়া করলেন। এমনই অভিযোগ উঠেছে মানবাজারের বড়তোড় গ্রামে। বৃদ্ধ দম্পতি থানায় দুই ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর তিনদিন পরেও পুলিশের কোনও ভূমিকা চোখে পড়েনি। ঘরছাড়া বৃদ্ধ দম্পতি বাঁকুড়া রেলস্টেশনে ঠাঁই নিয়েছিলেন। খবর পেয়ে তাঁদের বড় মেয়ে বাবা-মাকে ইঁদপুরে নিজের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন।
গত শনিবার মানবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করার পরেও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয়নি? মানবাজার থানার পুলিশ জানিয়েছে, আগেও ওই দুই ছেলেকে ডেকে আলোচনা করা হয়েছিল। আবার কথা বলা হবে। কিন্তু তিনদিনেও কেন কথা বলা হয়নি, তার সদুত্তর মেলেনি। জেলা পুলিশ সুপার রূপেশ কুমারও বলেন, ‘‘ওঁরা চাইলে আপাতত বয়স্কদের কোনও হোমে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমরা দুই ভাইয়ের সঙ্গে প্রথমে কথা বলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’’ কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত পুলিশের তরফে সেই চেষ্টা চোখে পড়েনি।
বড়তোড় গ্রামের বাসিন্দা ওই বৃদ্ধ দম্পতির নাম রবিলোচন গড়াই ও মঞ্জু গড়াই। তাঁদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। প্রায় ৬৩ বছরের রবিবাবু মানবাজারে এক মশলা দোকানে কাজ করেন। তিনি স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে খড়ের চালার একটি ঘরে থাকতেন। ছোট ছেলে দয়াময় অবিবাহিত। তিনিও মানবাজারের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি দোকানে কাজ করেন।
ওই দম্পতির অভিযোগ, গোলমালের সূত্রপাত মাস তিনেক আগে। তাঁদের বড়ছেলে সন্দীপ টাটায় একটি দোকানে কাজ করতেন। বছর চারেক আগে সেখানকারই মেয়েকে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু সম্প্রতি কাজ চলে যাওয়ায় সন্দীপ স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। দম্পতির অভিযোগ, সন্দীপ এসেই তাঁদের ঘর ছেড়ে দিতে হবে বলে বাবা-মাকে হুমকি দিয়ে বের করে দেয়। মঞ্জুদেবী বলেন, ‘‘বড়ছেলের পরিবারের সঙ্গে ছোটছেলে ওই ঘরেই থাকতে শুরু করে। সেও কেমন বদলে যায়। আমরা স্বামী-স্ত্রীতে কোনও রকমে টিনের চালার ছোট্ট রান্নাঘরে থাকতে শুরু করি। কিন্তু তাও ওদের সহ্য হল না। মাঝে মধ্যেই বড়ছেলে আমাদের হুঁশিয়ারি দিত। একদিন ওর শ্বশুর এসে আমাকে মারধর করে। কিন্তু শুক্রবার রাতে সব মাত্রাজ্ঞান ছাড়িয়ে যায়। আমরা তখন খেতে বসেছিলাম। নেশা করে এসে বড়ছেলে ওর বাবার খাবার থালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করে। আটকাতে গেলে সে আমাকেও মারধর করে বলে আমি নাকি ডাইনি। আমি থাকলে নাতিদের ক্ষতি হবে! ছোটছেলেটাও আমাদের গায়ে হাত দেয়। কাঁদতে কাঁদতে আমরা রাতেই বাড়ি ছাড়ি।’’
বৃদ্ধ রবিবাবুর অভিযোগ, ‘‘মাসখানেক আগেও বড় ছেলে মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সে বার থানায় অভিযোগ জানানোর পরে পুলিশের ধমক খেয়ে ছেলে একটু সংযত হয়েছিল। কিন্তু আবার মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। তাই আর বাড়ি ফিরতে সাহস হয়নি।’’
তাঁরা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুক্রবার রাতে চিকিৎসা করিয়ে শনিবার পুলিশে ফের দুই ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। তারপর ইতিউতি ঘুরতে বাঁকুড়া স্টেশনে চলে আসেন। খবর পেয়ে বড় মেয়ে রেখা বাবা-মাকে বাঁকুড়া স্টেশন থেকে নিজের শ্বশুরবাড়ি ইঁদপুরের হীরাশোল গ্রামে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘‘এক পড়শির মুখে ভাগ্যিস খবর পেয়েছিলাম। তাই বাবা-মাকে স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছি। না হলে তাঁরা কোথায় চলে যেতেন, কে জানে! কিন্তু ভাই দু’টো কী ভাবে বদলে গেল ভেবে পাচ্ছি না।’’
তবে দুই ভাই বাবা-মাকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সন্দীপের পাল্টা অভিযোগ, ‘‘মা নানা অজুহাতে আমার স্ত্রীর সঙ্গে গণ্ডগোল করত। আমি ছাড়াতে গেলে কখনও সখনও ধাক্কা খেয়ে হয়তো পড়ে গিয়ে থাকবে। কিন্তু মারধর করিনি।’’ দয়াময়েরও দাবি, ‘‘আমাদের বিরুদ্ধে বাবা মিথ্যা অভিযোগ করেছে।’’ তাহলে ওঁরা বাড়ি ছাড়লেন কেন? দুই ভাইয়ের কাছে সদুত্তর মেলেনি। স্থানীয় বিসরি পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা দিলীপ বাউরি বলেন, ‘‘আগেও আমরা দু’পক্ষকে নিয়ে একটা সুষ্ঠু মীমাংসা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্নেহের বশে দুই ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রবিবাবুই তখন এগিয়ে আসেননি। এখন কী করা যায় দেখছি।
পুরুলিয়া শহরেই বছরখানেক আগে এক বৃদ্ধাকে ঘর থেকে বের করে তাঁর নাতি দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। খবর পেয়ে প্রশাসনের আধিকারিকরা গিয়ে তালা ভেঙে সেই বৃদ্ধাকে নিজের ঘর ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন যিনি প্রধান ভূমিকায় ছিলেন, সেই অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) সবুজবরণ সরকার মানবাজারের ঘটনাটি শুনে আশ্বাস দিয়েছেন, ‘‘খোঁজ নিয়ে দেখছি, কী করা যায়।’’