ব্লকের দ্বিতীয় মেয়েদের স্কুল পেল মহম্মদবাজার

কর্ণিকে হাত লাগালেন জমিদাতা দুই ভাই। তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালেন বিডিও-ও। স্বাধীনতার ৬৯ বছর পরে মহম্মদবাজার ব্লক পেল তার দ্বিতীয় বালিকা বিদ্যালয়। বুধবার নতুন স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল সোতসালে, মোরগ্রাম-রানিগঞ্জ ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে খুশির হাওয়া আদিবাসী অধুষ্যিত ওই এলাকায়।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০১৫ ০০:৩৩
Share:

কর্ণিকে হাত লাগালেন জমিদাতা দুই ভাই। তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালেন বিডিও-ও। স্বাধীনতার ৬৯ বছর পরে মহম্মদবাজার ব্লক পেল তার দ্বিতীয় বালিকা বিদ্যালয়। বুধবার নতুন স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল সোতসালে, মোরগ্রাম-রানিগঞ্জ ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে খুশির হাওয়া আদিবাসী অধুষ্যিত ওই এলাকায়।

Advertisement

এত দিন ব্লকে মেয়েদের স্কুল বলতে ছিল প্যাটেলনগর অতুল ভবানী বালিকা বিদ্যালয়। নতুন যে স্কুলটি হচ্ছে তার জন্য নিজেদের ২০ শতক জমিদান করেছেন পাথর ব্যবসায়ী দুই ভাই হাজি আবদুল আলিম এবং শেখ সালাউদ্দিন। বুধবার সকালে সিউড়িতে রেজিস্ট্রি অফিসে বিডিও-র উপস্থিতিতে তাঁরা নিয়ম মেনে জেলাশাসকের নামে জমিটি হস্তান্তর করেছেন। দুই ভাই বলছেন, ‘‘নিজেরা বহু কষ্ট করে উপার্জন করে বড় হয়েছি। বছর ২০-২২ আগে এখানে অনেকটা জমি কিনেছিলাম। এলাকায় একটি হাইস্কুলের খুবই প্রয়োজন। পরিবার ও এলাকার অনেককেই সে কথা বলে। আমাদের বর্তমান বিডিও-ও স্কুলের ব্যাপারে আমাদের আরও উৎসাহিত করেন।’’ দিন কয়েক আগে বিডিও-র প্রস্তাবে তাঁরা স্কুলের জন্য জমি দিতে রাজি হন। এলাকায় নারী শিক্ষার প্রসারই ওই তাঁদের লক্ষ্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, স্বাধীনতার ৬৯ বছর পরেও পিছিয়ে থাকা এই এলাকায় নারীশিক্ষার তেমন প্রসার ঘটেনি। কারণ, শুধু বালিকা বিদ্যালয় না থাকাই নয়, আসলে যে সব স্কুল আছে, সেগুলি বহু দূরে দূরে। তাই ইচ্ছা থাকলেও যোগাযোগ বা যাতায়াতের অসুবিধের জন্য অনেক নিম্ন পরিবারের লোকজন গ্রাম বা এলাকার প্রাথমিকের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণত আর স্কুলমুখী হয় না। অনেকে আবার হাইস্কুলে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। বিশেষ করে মেয়েরা। কারণ, মেয়েদের কাছে দূরের স্কুলে যাতায়াত করাটাই হল প্রধান অন্তরায়। সোতসালের বাসিন্দা দিলরুবা বিবি বলেন, ‘‘আমার মেয়ে রিয়া গ্রামের স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। খুব ভাবনা হতো, এরপর কী ভাবে পড়াবো। কারণ, কাছাকাছি কোনও হাইস্কুল নেই। যাতায়াত নিয়ে সত্যিই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। যাতায়াতের সমস্যার জন্য গ্রাম ও আশপাশ এলাকার অনেক মেয়েকেই চতুর্থ শ্রেণির পরে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে।’’ গ্রামে স্কুল হচ্ছে শুনে যেন হাঁফ ছাড়লেন কাপাসডাঙা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া টিনা খাতুনের বাবা, পেশায় দিনমজুর হিলাল শেখ। তাঁর কথায়, ‘‘ওর মায়ের খুব শখ ছিল মেয়েকে পড়ানোর। কিন্তু আমার উপর সব দায়িত্ব দিয়ে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। মায়ের সাধে পুরনো মেয়েকে ভর্তিও করেছি। কিন্তু, এতটা দূর, কী ভাবে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াব তাই ভাবতাম। গ্রামে মেয়েদের স্কুল হলে তো আর ভাবনাই থাকবে না।’’ অন্য দিকে, দেউচা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া মানোয়ারা খাতুনের মা মতিহার বিবি, কাপাসডাঙা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া শিউলি খাতুনের বাবা আনারুল শেখরা বলেন, ‘‘কাছাকাছি স্কুল না থাকা ও যাতায়াতের জন্য আমাদের এলাকার মেয়েদের পড়াশোনা করাটা খুব সমস্যা। গ্রামে স্কুল হলে এলাকায় নারীশিক্ষার প্রসার ঘটবে। বাল্য বিবাহও রোখা যাবে।’’

Advertisement

বিডিও সুমন বিশ্বাস জানান, সোতসাল এলাকায় কোনও স্কুল ছিল না। যে হাইস্কুলগুলি আছে, সেগুলির দূরত্ব আড়াই থেকে ৪-৫ কিলোমিটারের মতো। ব্লকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকায় স্কুল গড়ার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। তাঁর কথায়, ‘‘স্কুল গড়তে জমির প্রয়োজন। জমিদাতা খুজতে গিয়ে দেখি স্থানীয় বাসিন্দা স্কুলের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী। জমি দিতেও প্রস্তুত। শুধু জমি দেওয়া নয়, ওঁরা যে জমি দিয়েছেন তার বাজারমূল্যও অনেক। যোগাযোগের দিক থেকেও খুব ভাল। একেবারে সোতসাল বাসস্টপেজ লাগোয়া। খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে দেওয়া হবে।’’

তিনি আরও জানান, আপাতত পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল খোলা হবে। তারপর নিয়ম মেনে মাধ্যমিক হবে। এখানে স্কুল হওয়ায় সোতসাল, আলিনগর, দ্বিগলগ্রাম, সেকেড্ডা, শালুকা, মথুরাপাহাড়ি, শালবুনি, চাঁদা হারমাডাঙাল, প্রভৃতি গ্রামের মেয়েরা উপকৃত হবে। স্কুল তো হবে। কিন্তু, মাত্র ২০ শতক জমিতে ভবিষ্যতে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল হওয়া কি সম্ভব? জমিদাতা দুই ভাইয়ের ছেলেরা নুর আলম শেখ এবং আব্বাসউদ্দিন শেখরা বলেন, ‘‘কোন চিন্তা নেই। ওই ২০ শতক জমি লাগোয়া আমাদের আরও আড়াই বিঘে জমি আছে। প্রয়োজনে সবটাই স্কুলের জন্য দেওয়া হবে। আমরা চাইছি, শুরুটা হোক। দেখবেন জায়গা কেন, কোনও কিছুরই অভাব হবে না।’’ বিডিও-র ওই শুভ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তাঁরা।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement