১৭ বছরের বিচ্ছেদ শেষে

হারানো ছেলেকে ফিরে পেলেন মা

মা এবং ছেলে— মাঝে বিচ্ছেদের সতেরোটা বছর। শুক্রবার বিকেলে সেই ঘর-হারানো ছেলেবেলাটাই ফিরে এল মোমিনের পায়ে পায়ে। বিস্ময়-অভিমান এবং অনর্গল কান্না শেষে চব্বিশ বছরের সমর্থ যুবক বলছেন, ‘‘ঘরের মতো আর কিছু হয়, আর কোত্থাও যাব না!’’

Advertisement

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০১৫ ০১:২০
Share:

মা মানোয়ারের সঙ্গে মোমিন। শনিবার সকালে দুবরাজপুরে তোলা নিজস্ব চিত্র।

মা এবং ছেলে— মাঝে বিচ্ছেদের সতেরোটা বছর। শুক্রবার বিকেলে সেই ঘর-হারানো ছেলেবেলাটাই ফিরে এল মোমিনের পায়ে পায়ে।

Advertisement

বিস্ময়-অভিমান এবং অনর্গল কান্না শেষে চব্বিশ বছরের সমর্থ যুবক বলছেন, ‘‘ঘরের মতো আর কিছু হয়, আর কোত্থাও যাব না!’’ ছেলের মাথায় বিলি কেটে মা-ও বলছেন, ‘‘পেটে ধরা ছেলে ফিরে পাওয়ার মতো সুখ কিছুতে আছে?’’

দিন দুয়েক ধরেই দুবরাজপুরের রাস্তায় দেখা যাচ্ছিল অচেনা মুখটা। পাগলের মতো কী যেন খুঁজছেন। এক পড়শির হাত ধরে শুক্রবার সে ফিরে পেল তার চেনা উঠোন, পুকুর পাড়, অগোছাল ঘরের হারানো সুঘ্রাণ।

Advertisement

কী ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল মোমিন, শনিবার সে গল্পটাই শোনালেন মা মানোয়ারা— সাত বছর বয়স তখন মেজ ছেলে মোমিনের। বাপ-মরা ছেলে, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা। তিন ছেলেকে নিয়ে প্রায় অথৈ জলে হাবুডুবু খাচ্ছেন মানোয়ারা। বলছেন, ‘‘পেটের জ্বালা বড় কষ্ট, ছেলেগুলো খেতে পাচ্ছে না দেখে বড় রাজীবকে একটি হোটেলে বাসন ধোয়ার কাজে লাগিয়েছিলাম। আর মোমিনকে পাঠিয়েছিলাম ভিক্ষা করতে। নিজে বছর তিনেকের ছোটটাকে নিয়ে ভিক্ষা করতাম।’’ বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে তখন চিমনি তৈরি হচ্ছে। মনোয়ারা জানান, মোমিন ওই চিমনির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। ছেলেকে সেই কারখানার শ্রমিক-ভিড়ে ঠেলে দিয়ে ভিক্ষার অপেক্ষায় তাকতেন মা। এ ভাবেই চলছিল।

কিন্তু এক দিন সেই বক্রেশ্বরের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে থেকেই হারিয়ে গেল মোমিন। খোঁজাখুঁজি কম হয়নি। পুলিশে নিখোঁজ ডায়েরি থেকে পাড়ার ক্লাবের ছেলেদের উদ্যোগে মাইকে প্রচার— বাদ যায়নি কিছুই। মোমিনের আর খোঁজ মেলেনি। মানোয়ারা বলছেন, ‘‘শেষে উপরওয়ালার উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ খোদা বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন।’’

Advertisement

মোমিন শোনাচ্ছেন তাঁর হারানো-বেলার কথা—‘‘হঠাৎ ট্রেনে চেপে পালাতে ইচ্ছে হয়েছিল। কোন ট্রেন মনে নেই, সটান ইন্দৌর। সেখানে নেমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, কাঁদছিলাম বোধহয়। তখনই নতুন বাবা-মা পেলাম। আংটি ব্যবসায়ী শেখ এহমদ এবং ওঁর স্ত্রী শায়রা বিবি।’’ স্টেশন থেকে ওই দম্পতিই তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন মোমিনকে। তাঁদের পাঁচ ছেলের সঙ্গে অতঃপর কেটে গিয়েছিল ১৭টা বছর।

বলছেন, ‘‘লেখাপড়া না শিখলেও রাজমিস্ত্রির কাজ শিখেছি। পালিত মা-দাদারা আমার বিয়েও ঠিক করেছিলেন। কিন্তু, নিজের মায়ের কথা মনে হতেই ইন্দৌর ছেড়ে চলে আসি দিল্লি।’’ সেখান থেকে ১৫ অগস্ট বেরিয়ে দুবরাজপুর পৌঁছন ১৯ তারিখ। কিন্তু মাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুক্রবার দুবরাজপুরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের এক মহিলা সব শুনে তাঁকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেন।

ইন্দৌরের যে পরিবারটি মোমিনকে বড় করেছিলেন সে পরিবারের বড় ছেলে সেলিম বলছেন, ‘‘ও বাড়ি ফিরতে চাইলে আমরা বাধা দেব কেন, আমি নিজে গিয়ে ভাইকে পৌঁছে দিতাম। কিন্তু মা খুব দুঃখ পেয়েছেন। এত দিন ওকে মা বারবার জিজ্ঞাসা করেছে, কোথায় তোর বাড়ি। কিন্তু ও তেমন কিছুই বলতে পারেনি। ওর বিয়েও ঠিক করেছিলাম। আর্শীবাদও হয়ে গিয়েছিল।’’ পালিত মা’কে ‘দুঃখ’ দিয়ে কিংবা যে মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল তাদের কথা ভেবে অবশ্য মাথা নীচু করে ফেলছেন মোমিন। বলছেন, ‘‘মাকে দুঃখ দিয়েছি ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে।’’ তবে বাড়ি ছেড়ে আর ফিরে য়াওয়ার ইচ্ছে নেই তাঁর।

মোমিন ফেরায় বেজায় খুশি ছোটবেলার বন্ধু শেখ রহিমও। দুবরাজপুরে টোল আদায়ের কাজ করেন তিনি। বলছেন, ‘‘ছোটবেলায় এক সঙ্গে খেলতাম। খুব আনন্দ হচ্ছে ও ফিরে আসায়। বেশি ভাল লাগছে ওর মায়ের কথা ভেবে।’’ শুধু রহিম নন মোমিন প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে দুবরাজপুরের বাড়িতে এখন ভিড় ভেঙে পড়ছে। যা দেখে নিজের মনেই বিড় বিড় করছেন বাংলা ভুলে যাওয়া মোমিন, ‘‘ইসি কো কহেতা হ্যায় ঘর-কা পেয়ার!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement