বিধাননগর সেক্টর ফাইভে বিজেপি দফতরে শুক্রবার বিকেলে সঙ্কল্পপত্র তৈরির পরামর্শ-বাক্স ঘিরে দলের নেতাকর্মীরা। —নিজস্ব চিত্র।
যাঁরা দরজায় দরজায় পৌঁছে ক’দিনের মধ্যেই ভোট চাইবেন বা চাইতে শুরু করেছেন, তাঁদের মুখ থেকে নিজের পছন্দ মতো প্রতিশ্রুতি আদায় করার সুযোগ। সব দল এখনও সে রাস্তা খোলেনি। তবে বিজেপি খুলে দিয়েছে। নির্বাচনী ‘সঙ্কল্পপত্র’ (ইস্তাহার) তৈরির জন্য জনতার মতামত নেওয়া শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকেই। দু’সপ্তাহ ধরে প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন মণ্ডলে সেই মতামত সংগ্রহ চলার পরে কলকাতায় বিশেষ নজর দিল বিজেপি। দলের রাজ্য দফতরে তো বটেই, দিন কয়েকের জন্য কলকাতার অন্যান্য প্রান্তেও মতামত সংগ্রহের বাক্স বসিয়ে লিখিত পরামর্শ নেওয়া শুরু হল। শুক্রবার সন্ধ্যায় তেমনই এক কর্মসূচিতে রাজ্য সরকারের সচিবালয় নবান্ন থেকে মহাকরণে সরিয়ে আনার পরামর্শ সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
‘বিশিষ্ট নাগরিক’দের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে মধ্য কলকাতার একটি হোটেলে বিজেপি পরামর্শ-বাক্স রেখেছিল। বিজেপির তরফ থেকে ফোনে বা হোয়াট্সঅ্যাপে অনেককে সে কর্মসূচির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী-সহ নানা পেশার লোকজন ছিলেন। লিখিত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি অনেকে সেখানে নাতিদীর্ঘ ভাষণও দেন। কারও দাবি ছিল, বিদ্যুৎ বিল কমানো সংক্রান্ত। কারও বক্তব্য ছিল, সরকারি কর্মীদের প্রাপ্য মহার্ঘ্য ভাতার বিষয়ে। কেউ বলেছেন, কলকাতায় পেট্রল-ডিজ়েলের চড়া দামের কথা। কেউ কলকাতার বস্তি এলাকাগুলির পরিস্থিতি এবং নিকাশির উন্নতিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া উঠে এসেছে, রাজ্যের সামগ্রিক পরিকাঠামো বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা প্রস্তাব। তার মধ্যে রয়েছে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির কথা। রয়েছে পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নতির কথা। চিকিৎসকদের তরফ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সঙ্কল্পপত্রে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাকে গরিব মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলার প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। সরকারি সম্পত্তির বেসরকারিকরণ রোখা, সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনা, কর্মসংস্থানে জোর, সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি প্রণয়ন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আনার কথা সঙ্কল্পপত্রে রাখার প্রস্তাব উঠে এসেছে। উত্তরবঙ্গে এমস তৈরির প্রস্তাবও বিজেপির সঙ্কল্পপত্রে রাখার দাবি উঠেছে।
তবে মধ্য কলকাতার হোটেলটিতে শুক্রবার যাঁরা হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই রাজ্যের সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব তথা পরামর্শে সমর্থন জানিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আড়াই বছর পরে সচিবালয়কে মহাকরণ থেকে সরিয়ে নিয়ে যান গঙ্গার অন্য পারে, নবান্নে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তা যেন আবার কলকাতায় তথা মহাকরণের লালবাড়িতেই ফেরে, সে কথা সঙ্কল্পপত্রে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন একাধিক আমন্ত্রিত।
শনিবার কলকাতার আইসিসিআর প্রেক্ষাগৃহেও সকাল ১০টা থেকে পরামর্শ-বাক্স রাখা থাকবে। আমন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। যে কেউ সেখানে গিয়ে পরামর্শ জমা দিতে পারবেন বলে বিজেপির তরফে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজেপির সঙ্কল্পপত্র কমিটির চেয়ারম্যান তাপস রায় জানিয়েছেন, শনিবার উত্তর কলকাতার কিছু বিশিষ্ট নাগরিকের জন্যও আলাদা করে এই কর্মসূচির আয়োজন হচ্ছে। তাপসের কথায়, ‘‘আমরা চাই আমাদের সঙ্কল্পপত্র জনতার মাঝখান থেকে এবং সমাজের সব অংশ থেকে উঠে আসুক। ক্ষমতায় এলে সরকারও আমরা এ ভাবে জনতার মত তথা পরামর্শ নিয়েই চালাব।’’
গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই মতামত সংগ্রহ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন। বিধাননগর সেক্টর ফাইভের বিজেপি দফতরে মতামত জমা নেওয়ার বাক্স উন্মোচন করা হয়েছিল। শমীক জানিয়েছিলেন যে, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে মোট এক হাজার বাক্স পাঠানো হচ্ছে। তা ছাড়া দলের জেলা দফতরগুলিতেও বাক্স রাখা হচ্ছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই সব বাক্সে লিখিত পরামর্শ জমা নেওয়া হবে বলেও শমীক সে দিন জানিয়েছিলেন। সাধারণ জনতা সরকারের কাছ থেকে কী চান, তা লিখিত আকারে জনতার কাছ থেকেই জেনে নেওয়া হবে এবং তার ভিত্তিতেই বিজেপির সঙ্কল্পপত্র তৈরি হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজ্য জুড়ে পরামর্শ সংগ্রহের সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে কলকাতায় বিশেষ অভিযান শুরু করল বিজেপি।
শুক্রবার বিধাননগরের বিজেপি দফতরের গাড়িবারান্দায় ফের পরামর্শ সংগ্রহের বাক্স রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার থেকেই সমাজমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যাঁরা বিজেপি-কে সঙ্কল্পপত্র সংক্রান্ত পরামর্শ দিতে ইচ্ছুক, তাঁরা বিধাননগরের দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে বাক্সে তা জমা দিতে পারেন। দুপুরের পর থেকে সে বাক্স ঘিরে বিজেপি দফতরে বেশ উৎসাহও দেখা গিয়েছে। তবে সে বাক্সে যাঁরা পরামর্শ জমা দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই বিজেপির বিভিন্ন শাখা সংগঠনের কর্মী।