শপথ গ্রহণের মঞ্চে বিজেপি নেতারা, শনিবার ব্রিগেডে। ছবি: পিটিআই।
কেউ বলেন ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। কেউ বাংলায় তার আক্ষরিক অনুবাদ এড়িয়ে বলেন ‘সামাজিক সমীকরণ’। পরিভাষা যা-ই হোক, তার প্রয়োগ শুরু হয়েছিল ভোটের আগে। ফল পাওয়া গিয়েছিল গণনার দিন। আর ‘প্রতিদান’ দেওয়া শুরু হল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ পর্ব থেকে।
মুখ্যমন্ত্রী এবং পাঁচ পূর্ণমন্ত্রী শনিবার শপথবাক্য পাঠ করলেন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের মঞ্চে। ব্রাহ্মণ থেকে তফসিলি, ওবিসি থেকে মতুয়া, আদিবাসী থেকে মহিলা— পশ্চিমবঙ্গের সব রকমের সামাজিক রঙের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হল ছ’জনের সেই সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও।
শুধু মন্ত্রিসভার তালিকা নয়, রঙিন হয়ে রইল গোটা আয়োজনও। হুডখোলা গাড়িতে করে মাঠে প্রধানমন্ত্রীর প্রবেশ, এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রী-উপমুখ্যমন্ত্রীদের সমাহার, এনডিএ-র বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষনেতাদের উপস্থিতি— ব্রিগেডের মঞ্চ ‘নক্ষত্রের মেলা’ হয়ে উঠল।
মুখ্যমন্ত্রী-সহ যে মোট ছ’জন শনিবার শপথ নিয়েছেন, তাঁদের সামাজিক প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত তাৎপর্য বিজেপি নিজেই তুলে ধরতে শুরু করেছে। রাজ্য বিজেপির অন্যতম সহ-সভাপতি তথা সিউড়ির নবনির্বাচিত বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন, ‘ঐতিহাসিক শপথের প্রথম পর্ব। ব্রাহ্মণ, ওবিসি, মহিলা, মতুয়া, আদিবাসী, রাজবংশী।’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ব্রাহ্মণ। তাঁর পরেই যিনি শপথ নিয়েছেন, সেই দিলীপ ঘোষ ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত। তৃতীয় শপথগ্রহীতা অগ্নিমিত্রা পাল দলের প্রথম সারির মহিলা মুখ। অশোক কীর্তনিয়া মতুয়া, ক্ষুদিরাম টুডু আদিবাসী সমাজের এবং নিশীথ প্রামাণিক রাজবংশী। অর্থাৎ, রাজ্য জুড়ে সমাজের যে যে অংশের ভোট বিজেপি বিপুল পরিমাণে পেয়েছে, তাদের প্রায় সকলের প্রতিনিধিত্ব মন্ত্রিসভার সংক্ষিপ্ততম রূপটিতেও নিশ্চিত করা হল। যদিও মাহাতো তথা কুড়মি সমাজ এবং ওবিসি তালিকায় ঠাঁই না-পাওয়া মাহিষ্য সমাজের ভোটও পদ্মফুলে বড় সংখ্যায় পড়েছে বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছেন। আগামী কয়েক দিনেই মন্ত্রিসভার যে সম্প্রসারণ হবে, সেখানে বাকিদের প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত করা হবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর।
শুধু সামাজিক শ্রেণি বা বর্ণ নয়, প্রথম দিনের শপথগ্রহীতা তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সুষম আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন উপকূলীয় এলাকা থেকে। বাকি মন্ত্রীদের মধ্যে দিলীপ এবং ক্ষুদিরাম জঙ্গলমহলের। অগ্নিমিত্রা রাঢ়বঙ্গ তথা শিল্প ও খনি অঞ্চলের। অশোক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার। নিশীথ উত্তরবঙ্গের। অর্থাৎ যে সব অঞ্চল বিজেপিকে দু’হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছে, প্রথম দিনে সেই সবক’টি এলাকার প্রতিনিধিত্বই মন্ত্রিসভায় নিশ্চিত করা হল।
মতুয়া এলাকার প্রতিনিধি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিজেপি ঈষৎ ‘কৌশলী’ অবস্থান নিল বলেও অনেকে মনে করছেন। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া ঠাকুরবাড়ি থেকে দু’জন বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। বাগদায় প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী সোমা ঠাকুর। গাইঘাটায় প্রার্থী ছিলেন মতুয়া মহাসঙ্ঘের একাধিক শাখার একটির প্রধান সুব্রত ঠাকুর। দু’জনেই জিতে এসেছেন। কিন্তু এঁদের দু’জনের মধ্যে কোনও একজনকে মন্ত্রী করলে ঠাকুরবাড়ি চত্বরে বিজেপির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য টাল খেতে পারত বলে অনেকে মনে করছেন। তাই মন্ত্রিসভার জন্য মতুয়া সমাজের প্রতিনিধি খুঁজতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ি থেকে আপাতত দূরেই থাকল বিজেপি। মতুয়া সমাজেরই ঠাকুরবাড়ি-বহির্ভূত বিধায়ককে মন্ত্রী করা হল।
পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভায় আরও অন্তত ৩০-৩৫ জনের নাম জুড়বে। সে ক্ষেত্রেও সামাজিক এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের বিন্যাসে সর্বাত্মক ভারসাম্য বহাল রাখা সম্ভব হবে কি না, বলা শক্ত। কারণ, দক্ষতা বা পারদর্শিতা যদি মন্ত্রী বাছাইয়ের মাপকাঠি হয়, তা হলে সামাজিক বা আঞ্চলিক সমীকরণে সর্বাত্মক ভারসাম্য রেখে মন্ত্রিসভা সাজানো দুরূহ কাজ। অনেকের মতে, সেই কারণেই বিজেপি মন্ত্রিসভার প্রাথমিক তথা সংক্ষিপ্ততম রূপটিতে ‘সামাজিক সমীকরণ’কে সম্মান জানানোর বার্তা দিল। মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ চেহারা যা-ই দাঁড়াক, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ যে ‘সামাজিক সমীকরণে’ ভারসাম্য বহাল রেখেই করা হবে, শপথের দিনেই তা বুঝিয়ে দেওয়া হল বলেই অনেকের অভিমত।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ব্রিগেডের মঞ্চে পৌঁছোনোর কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদীর। কিন্তু তিনি সময়ের বেশ কিছুটা আগেই ব্রিগেডের অদূরে হেলিপ্যাডে পৌঁছে যান। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে ব্যারাকপুরের জনসভার মঞ্চ থেকে মোদী বলে গিয়েছিলেন, ‘‘এর পরে আমি আসব পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের কর্মসূচিতে।’’ পশ্চিমবঙ্গে যে বিজেপি সরকারই শপথ নিচ্ছে এবং তিনি যে কথা রেখেছেন, সে কথা মুখে না-বলেও শনিবার মোদী অন্য ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ব্রিগেড ময়দানে তিনি ঢুকেছেন হুডখোলা গাড়িতে চেপে। একপাশে শুভেন্দু, অন্য পাশে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে নিয়ে। এ দৃশ্য যে ব্রিগেডে তৈরি হবে, তা আগে থেকে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে জনতা চমকে গিয়েছে। পাল্লা দিয়ে উদ্বেলও হয়ে উঠেছে।
মাঠে পৌঁছে গেলেও মোদী নির্ধারিত সময়ের আগে মঞ্চে ওঠেননি। মঞ্চের পিছনে অপেক্ষা করছিলেন। মঞ্চে তখন অপেক্ষায় অমিত শাহ, রাজনাথ সিংহ, জেপি নড্ডা, নিতিন গডকড়ী, শিবরাজ সিংহ চৌহান, ধর্মেন্দ্র প্রধানদের মতো প্রথম সারির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। হাজির মিঠুন চক্রবর্তী। ছিলেন ২০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উপমুখ্যমন্ত্রীরা। যাঁদের মধ্যে ছিলেন শরিক দলের চন্দ্রবাবু নায়ডু, একনাথ শিন্ডে, সুনেত্রা পওয়ার, নেফিউ রিও, কনরাড সাংমারা। ছিলেন ললন সিংহ, চিরাগ পাসওয়ান, জিতনরাম মাঝি, জয়ন্ত চৌধ্রি, অনুপ্রিয়া পটেলদের মতো শরিক দলের নেতানেত্রীরাও। অতিথি হিসাবে মাঠে হাজির সঞ্জীব গোয়েন্কার মতো শিল্পপতি বা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ, মমতাশঙ্কর, যিশু সেনগুপ্তের মতো খ্যাতনামীরা।
ঠিক সাড়ে ১১টায় মোদী মঞ্চে উঠতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা জমায়েত। মোদী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে জমায়েতের দিকে হাত নাড়েন। তার পরে বিস্ময় তৈরি করেন হাঁটু গেড়ে বসে, মঞ্চের মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে, হাতজোড় করে পশ্চিমবঙ্গের জনতাকে প্রণাম জানিয়ে।
ব্রিগেডের এই কর্মসূচি বিজেপির শক্তি প্রদর্শনের কর্মসূচি ছিল না। যে শপথগ্রহণকে বিজেপি ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিচ্ছে, যতজন সে কর্মসূচির সাক্ষী থাকতে ইচ্ছুক, তাঁরা সকলেই যাতে জায়গা পান, তার জন্যই ব্রিগেডে আয়োজন। তাই শনিবার সংগঠিত ভিড় আনার উপরে জোর দেওয়া হয়নি। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মোদী মঞ্চে ওঠার আগে থেকেই ভিড় সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ, মাঠের অনেকটা অংশ জুড়ে ছাউনি তৈরি করা হলেও প্রায় সমপরিমাণ অংশ ছাউনিহীন ছিল। কিন্তু প্রবল রোদ এবং ভ্যাপসা গরম থেকে বাঁচতে ছাউনিহীন অংশে কেউ দাঁড়াতেই চাইছিলেন না। গোটা জমায়েতটাই ছাউনির নীচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। যে ভিড়টা গোটা ব্রিগেড জুড়ে ছড়িয়ে থাকার কথা ছিল, তার পুরোটাই ছাউনিতে ঢাকা এলাকার মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। ফলে কোথাও ব্যারিকেড ভেঙে পড়ে। কারও কারও শ্বাসের সমস্যা শুরু হয়। ভিতরে পানীয় জলের কোনও ব্যবস্থা না-থাকায় বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিজেপি কর্মীরাই দ্রুত তাঁদের মাঠ থেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিগেডে এত বড় কর্মসূচির আয়োজন করতে হয়েছে বলেই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা। ৪ মে ভোটগণনা হয়েছে। ৫ মে প্রথম বার শোনা যায় যে ব্রিগেডে শপথগ্রহণ হতে পারে। ৬ মে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় এবং তড়িঘড়ি কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু প্রথমত, ব্রিগেডে এত বড় কর্মসূচি আয়োজনের জন্য তিন-চার দিন সময় একেবারেই যতেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, সদ্য ক্ষমতাসীন হওয়া দলের ঘাড়ে শপথগ্রহণের আগে কত রকমের কাজ এসে চাপতে পারে, রাজ্য বিজেপির অনেকেরই সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সব কিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে রাজ্য বিজেপি-কে কিছুটা বেকায়দাতেই পড়তে হয়েছে।
শপথ-মঞ্চের পটভূমিকায় শনিবারও উজ্জ্বল ছিল ‘বাঙালি হিন্দুত্ব’। দুর্গাপ্রতিমার ছবি, কালীঘাট মন্দিরের ছবি, সিঁদুরখেলা, ধুনুচি নাচ, আরতির ছবি। ঠিক যেমন গত ১৪ মার্চ বিজেপির ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চেও পটভঊমিকা জুড়ে ছিল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদল। সেই ব্রিগেড এবং এই ব্রিগেড— বিজেপি বুঝিয়ে দিল পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্বই লাইন, তবে বাঙালির ‘নিজস্ব হিন্দুত্ব’।