—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
বাঁকুড়া শহর থেকে গাড়িতে বড় জোর মিনিট কুড়ি। রাস্তা পাকা। তবে শহুরে হালচাল সেখানে আচমকাই বদলে গিয়েছে। সামান্য এগোতেই চালা ঘর। পুরন্দরপুরের রাস্তার মুখে পনেরো ছুঁই ছুঁই যে মেয়েটি এগিয়ে এল, তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, অল্প কিছু দিন আগে সে ঘর ছেড়েছিল বিয়ের জন্য। চাইল্ডলাইন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরত আনা হয়েছে তাকে। যাকে বিয়ে করার জন্য এই দুঃসাহস, সে ছেলে এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
চালাঘরের সামনের চিলতে অংশে বসতেই নজরে এল, ঘরের পাশে অনেকটা অংশ খোঁড়া। সরকারি প্রকল্পে তৈরি হচ্ছে নতুন ঘর। রেশন দোকানে মালপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ করা বাবা অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন। ‘‘ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? ভুল করে ফেলেছিল।’’ মেয়ের হাতে এখন আর মোবাইল নেই। বাবা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। ‘‘এখানে খেতে পাক না পাক, বাচ্চা-বুড়ো সবার হাতেই মোবাইল। মেয়েকেও দিয়েছিলাম। আর ওটাই বাচ্চা মেয়েটার সর্বনাশ করে দিয়েছিল। বুঝতে পারিনি।’’
জানলাম, এলাকার অদূরেই এক সপ্তাহের পরিচয়ে একটি ছেলেকে বিয়ে করেছিল এক ১৩ বছরের মেয়ে। বাড়ির লোক যখন পৌঁছয় ততক্ষণে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ফেরত আনার কথা বলায় মেয়ে বলে গলায় দড়ি দেবে, তাই বাবা-মা আর সাহস করেননি। বালিকা বধূ এখন স্কুল ছেড়ে ‘সংসার করছে’। চেহারায় অপুষ্টির বাসা, মুখ ম্লান, চোখ স্বপ্নহীন।
বাঁকুড়া শহর সংলগ্ন জুনবেদিয়ায় আর একটি পরিবারে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর মা-ও বলছিলেন একই কথা। ভিন্ রাজ্যে কাজে গিয়েছেন স্বামী। সংসারে আর টাকা পাঠান না। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করছেন তিনি। লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। সেই মেয়েই ১৫-য় পড়ে ঘর ছাড়ল বিষ্ণুপুরের এক তরুণের সঙ্গে। চাইল্ডলাইনের সাহায্য নিয়ে মেয়েকে সেই ছেলের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে আনলেন মা। মেয়ে বলল, “আমার সংসার ভাঙলে তুমি! পারবে তো আটকে রাখতে?” মা-মেয়েকে পাশাপাশি বসিয়ে যখন কথা বলছিলাম, মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “সংসার গড়ার আগে যে নিজেকে গড়তে হয়, এ মেয়েকে সেটা কে বোঝাবে? লেখাপড়া করতেই চায় না। বললে বলে, কী হবে লেখাপড়া শিখে?” এই মা-ও মেয়ের হাত থেকে মোবাইল কেড়েছেন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে মেয়ে অন্য কারও মোবাইল থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে কি না সে ব্যাপারে তিনি অন্ধকারে।
বাড়ি থেকে জোর করে মেয়েকে ‘পাত্রস্থ করার’ তাগিদ কিংবা বিশেষ কয়েকটি জেলায় বিয়ের মিথ্যাচারে পাচারই শুধু নয়। নাবালিকা বিয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন মেয়েদের স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ার আখ্যান। প্রতি বছর বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা। স্কুলে স্কুলে সচেতনতার বার্তা, কন্যাশ্রী ক্লাব গড়া— তার ফল তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে?
আশা কর্মীরা বলছেন, “মেয়েরা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে নিচ্ছে। বাড়ির লোক চেষ্টা করেও ফেরাতে পারছে না অনেক ক্ষেত্রেই। আমরা ওই বাচ্চা মেয়েগুলোর হাতে কনডোম তুলে দিচ্ছি। বলছি, বরকে ব্যবহার করতে বোলো। সেই বর-ও হয়তো নাবালক। কোথাও কোথাও আবার জানতে পারছি কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই ওই মেয়েরা গর্ভনিরোধক বড়ি খাওয়া শুরু করছে। কিশোরী বয়সে, অপুষ্টিতে ভোগা শরীরে তার ফল কী মারাত্মক হতে পারে তারা জানেই না।”
চাইল্ডলাইন, পুলিশ, শিশুকল্যাণ বিভাগের কর্তারা অনেকেই জানাচ্ছেন, আগে নাবালিকা বিয়ের ক্ষেত্রে আটকানোর চেষ্টা করে ফোন আসত স্কুল থেকে, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। ফোন করত মেয়েদের তথাকথিত ‘বয়ফ্রেন্ড’-রাও। কারণ বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হত। পুলিশ ও চাইল্ডলাইনের প্রতিনিধিরা গিয়ে বিয়ে আটকাতেন। কিন্তু এখন বেশির ভাগ ফোনই আসে বাবা-মায়ের কাছ থেকে। কিছু কিছু জেলার ক্ষেত্রে অল্প পরিচয়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের ঘটনা যেমন সামনে আসছে, তেমনই স্রোতের মতো আসছে এমন ঘটনার খবর, যার নেপথ্যে রয়েছে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই ‘সংসার’ শুরু করার বাসনা।
সরকারি তথ্যই বলছে, বিভিন্ন জেলায় একই ছবি। কোভিডের পর থেকে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। কয়েক মাস, এমনকি কয়েক সপ্তাহের পরিচয়েও বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বহু নাবালিকা। কোথাও প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছচ্ছে, কোথাও সকলের চোখের সামনে সব ঘটলেও প্রতিকার হচ্ছে না। অথচ এ রাজ্যে নাবালিকা বিয়ে ঠেকানোর জন্য আলাদা পোর্টাল রয়েছে। সেখানে অভিযোগ এলে দ্রুত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করার বিধান রয়েছে। নাবালিকা বিয়ে আটকানোই শুধু নয়, পরবর্তী সময়ে তা মানা হচ্ছে কি না, রয়েছে তার যথাযথ নজরদারির বিধানও। তবু জেলায় জেলায় নাবালিকা বধূর ভিড়। কেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে করা ঠিক নয়, এ ব্যাপারে কী আইন আছে, আইন না মানলে কী শাস্তি, এ নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ঘুরেও খুব বেশি প্রচার চোখে পড়েনি।
নাবালিকা বিয়ে আটকানোর ক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে আকছার। বাঁকুড়ায় কন্যাশ্রী ক্লাবের এক সদস্য বলে, “খবর দিতে গিয়ে নিজেরা ঝামেলায় পড়ি। বার বার পুলিশ ডেকে পাঠায়। যাদের বাড়ির বিয়ে আটকানো হল, তারা শাসায়। আমাদের বাড়ি থেকেই এখন বলা হয়েছে এ সবে না জড়াতে।”
প্রশাসনের একটা অংশ স্বীকার করছে, রাজ্য জুড়ে বেকারত্ব যে ভাবে বাড়ছে, তাতে শিক্ষা, স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দানাই বাঁধছে না অনেকের কাছে। বাঁকুড়ার নাবালিকা নববধূ একাধিক প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে থাকার পর এক সময় কিছুটা ধৈর্য হারায়, “কী হবে লেখাপড়া শিখে? আমার বর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। এখনও তার বাপের টাকায় খায়। চাকরি পায়নি। লেখাপড়া শিখলেই কাজ পাব নাকি? তার চেয়ে বিয়ে করেছি বলে বাপের ঘরে একটা পেট কমেছে।”
সচেতনতার প্রচার নেই, নিজের পায়ে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস নেই, কিছু ভাতা আর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পিছনে ক্রমশ জমি হারাচ্ছে কিশোরী মেয়েদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। ভোটব্যাঙ্কে সমস্যা হতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতারা সব জেনেও এ নিয়ে মাথা ঘামান না।
বাল্যবিবাহ ঠেকাতে এবং মেয়েদের লেখাপড়ার হার বাড়াতে চালু হয়েছিল কন্যাশ্রী প্রকল্প। এই প্রকল্পে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মেয়েরা, যারা কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, তাদের মাসে ১০০০ টাকা এবং ১৮ বছরের পরে অবিবাহিত মেয়েদের এককালীন ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাঁকুড়ার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক চঞ্চল নাথ বললেন, “পরিস্থিতি এমনই যে এই টাকার প্রলোভনেও আর বিয়ে আটকে রাখা যাচ্ছে না। কারণ অল্প বয়সে বিয়ের ক্ষতির দিকটা ওরা বুঝছেই না। আরও বিস্তারিত প্রচার জরুরি। আরও একটা সর্বনাশ দেখি, একাদশ শ্রেণিতেই ট্যাবের টাকা পেয়ে যাচ্ছে। সেই টাকায় মোবাইল কিনছে, আর তার পরেই স্কুল কামাই শুরু। অনেকে দ্বাদশ পর্যন্ত আর পড়াশোনাই করে না।” তাঁর কথায়, “গ্রামেগঞ্জে কিশোরীদের মধ্যে ক্রমশ যা হারাতে বসেছে তা হল স্বপ্ন। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন।”
(চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে