Suvendu-Dilip Equation

প্রকাশ্য মঞ্চে দিলীপের প্রতি ‘সৌজন্য’ ক্রমে বাড়ছে শুভেন্দুর! দিল্লির নির্দেশ? না কি নেপথ্যে অন্য কারণ? জল্পনা ঘরে-বাইরে

দিলীপ নিজেও আগের চেয়ে সংযত। কোনও সতীর্থ সম্পর্কে বাঁকা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন। কোনও দলীয় কর্মসূচিতে ডাক না-পেলেও তা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন না।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
Share:

(বাঁ দিকে) শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

কখনও ‘দাদা’ ডাক। কখনও ‘সম্মানীয়’ বলে সম্বোধন। কখনও ‘বর্ষীয়ান নেতা’ বিশেষণ। দু’দিনে তিন বার প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে দিলীপ ঘোষের প্রতি ‘গভীর সৌজন্য’ প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কারণ কী? জল্পনা শুরু হয়েছে রাজ্য বিজেপির ভিতরে-বাইরে। প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। কিন্তু একান্ত আলোচনায় ব্যাখ্যার কমতি নেই।

Advertisement

গত ২৭ এবং ২৮ জানুয়ারি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের কর্মসূচি ছিল দুর্গাপুরে। ২৭ তারিখ রাতে দুর্গাপুর চিত্রালয় ময়দানে কমল মেলার মঞ্চে এবং ২৮ তারিখ দুপুরে ওই মাঠেই আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে শুভেন্দু ও দিলীপ একসঙ্গে ছিলেন। নেতৃস্থানীয়দের নাম একে একে বলার সময়ে প্রথম দিন শুভেন্দু বলেন, ‘‘উপবিষ্ট আছেন ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, প্রাক্তন সাংসদ, আমাদের বর্ষীয়ান নেতা মাননীয় দিলীপ ঘোষ।’’ দ্বিতীয় দিনেও প্রায় একই রকম শব্দচয়নে তিনি বলেন, ‘‘প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, প্রাক্তন সাংসদ সম্মানীয় দিলীপ ঘোষ।’’

সেখানেই শেষ নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোটের দিনগুলিতে কোন কোন বিজেপি প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই তালিকা শোনাতে গিয়ে নিশীথ প্রামাণিক, লকেট চট্টোপাধ্যায় বা প্রণত টুডুর নাম শুভেন্দু বলেন পদবি জুড়েই। কিন্তু দিলীপের ক্ষেত্রে বলেন, ‘‘মন্তেশ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন দিলীপদা।’’ পদবি জুড়ে নয়। ‘দাদা’ সম্বোধন। আর ঘাটাল লোকসভার বিজেপি প্রার্থী হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বলতে গিয়ে শুভেন্দু নাম-পদবি বা দাদা-ভাই কিছুই বলেননি। শুধু বলেন, ‘‘কেশপুরে আমাদের ঘাটালের প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছিলেন।’’

Advertisement

বিজেপির অন্দরে দিলীপ-শুভেন্দু সম্পর্ক বরাবরই ‘মধুর’। লোকসভা ভোটে দিলীপের আসন পরিবর্তন এবং তাঁর পরাজয়ের পর তা ‘মধুরতর’ হয়েছিল। যা ‘মধুরতম’ হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে দিলীপ সস্ত্রীক দিঘার জগন্নাথ ধাম দর্শনে যাওয়ার পরে। তখন দিলীপ দলের মূলস্রোত থেকে খানিকটা দূরেই ছিলেন বা তাঁকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি অমিত শাহ কলকাতা সফরে এসে দিলীপকে আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনেন। তখন থেকেই বিজেপির অন্দরে দিলীপ-শুভেন্দু সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা নতুন করে শুরু হয়েছিল। শুভেন্দুর দিলীপের প্রতি ক্রমবর্ধমান ‘সৌজন্য’ সেই জল্পনা আরও বাড়িয়েছে।

দিলীপের সঙ্গে ‘দূরত্ব’ মিটিয়ে ফেলার কোনও বার্তা কি উচ্চতর নেতৃত্বের কাছ থেকে পেয়েছেন শুভেন্দু? এ প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর বিজেপির কোনও নেতা দিতে চান না। কারণ, তাতে শুভেন্দু আর দিলীপের ‘মনোমালিন্যের’ তত্ত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির এক নেতা জানাচ্ছেন, তেমন কোনও স্পষ্ট নির্দেশ নেই। তবে কলকাতায় বৈঠক করতে এসে শাহ যখন দিলীপকে ডেকে নিয়েছিলেন, তখনই সর্বত্র বার্তা চলে গিয়েছিল। সকলে বুঝে গিয়েছিলেন, রাজ্যে যাঁরা দলের প্রথম সারির মুখ, তাঁদের প্রত্যেককেই আপাতত পারস্পরিক সম্মান রেখে চলতে হবে।

বস্তুত, দিলীপও আগের চেয়ে সংযত। কোনও সতীর্থ সম্পর্কে বাঁকা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন। কোনও দলীয় কর্মসূচিতে ডাক না-পেলে তা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন না। সংবাদমাধ্যমকে যিনি কখনও ফেরাতেন না, সেই দিলীপ ইদানীং কোথাও কোথাও চ্যানেলের ‘বুম’ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত ২৪ জানুয়ারি কাকদ্বীপে ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’ শেষে দিলীপ মঞ্চ থেকে নামতেই সংবাদমাধ্যম তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। দিলীপ এড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। না-পেরে শেষে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন। তবে সংযমের সঙ্গে।

বিজেপির একাংশের ব্যাখ্যা, শুভেন্দু নেতৃস্থানীয়দের প্রতি ‘প্রকাশ্য অসৌজন্য’ দেখানোর পক্ষপাতী নন। দিলীপের সঙ্গে শুভেন্দুর সম্পর্কের সমীকরণ যে নানা সময়ে নানা খাতে বয়েছে, তা বিজেপির নেতারা মানছেন। কিন্তু প্রকাশ্য মন্তব্যে শুভেন্দু কখনও তার প্রতিফলন রাখতে চাননি বলেই তাঁদের দাবি। দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনের দিনে শুভেন্দু উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন বটে। তবে সে দিনও দিলীপের নাম উচ্চারণ করেননি বলে বিজেপি কর্মীরা মনে করাতে চান।

শুভেন্দু প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে অসৌজন্য আগে দেখাতেন না ঠিকই। কিন্তু দিলীপকে এত ‘সশ্রদ্ধ’ বা ‘আন্তরিক’ সম্বোধনও কি করতেন? না কি বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এখন তিনি অতিরিক্ত সতর্ক? বিজেপির অন্দরমহল সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। এ বারের বিধানসভা নির্বাচন শুধু বিজেপির জন্য নয়, রাজনীতিক শুভেন্দুরও ‘অগ্নিপরীক্ষা’। ২০২১ সালে শুভেন্দু দলের প্রধান মুখ ছিলেন না। কিন্তু পাঁচ বছর বিরোধী দলনেতা থাকার সুবাদে ২০২৬ সালের নির্বাচনে শুভেন্দু রাজ্য বিজেপির দুই প্রধান মুখের অন্যতম। ফলাফলের দায় তাঁর উপরেও বর্তাবে। অতএব দলে ‘ঐক্যের’ ছবি তুলে ধরায় শুভেন্দু জোর দিচ্ছেন।

তাঁদের পারস্পরিক সৌজন্যের ছবি যে কর্মীদেরও উজ্জীবিত করে, তাও শুভেন্দু জানেন। দুর্গাপুরেই সে ছবি দেখা গিয়েছে। শুভেন্দুর মুখে ‘সম্মানীয় দিলীপ ঘোষ’ শব্দবন্ধ শুনে স্বতঃপ্রণোদিত করতালিতে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে জমায়েত।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দিলীপকে মেদিনীপুর আসন থেকে বর্ধমান-দুর্গাপুরে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে শুভেন্দুর ভূমিকা ছিল বলে দিলীপের অনুগামীরা দাবি করেন। দিলীপ নিজেও আসন বদল নিয়ে প্রকাশ্যেই উষ্মা দেখিয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি অন্য রকম। বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে আগ্রহী দিলীপ নিজের পুরনো আসন খড়্গপুর সদর ফিরে চান। কিন্তু সেখানকার বর্তমান বিজেপি বিধায়ক হিরণ সে আসন দিলীপকে ছাড়তে চান না। কিন্তু আপাতত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিরূপ চর্চার ঘূর্ণিপাকে জড়িয়ে পড়েছেন হিরণ। তাঁকে খড়্গপুর সদরে প্রার্থী হিসাবে শুভেন্দু আর চাইবেন, না কি দিলীপকে সে আসনে ফেরাতে আগ্রহী হবেন, তা নিয়ে বিজেপির অন্দরে জোরদার জল্পনা রয়েছে। দুর্গাপুরের মঞ্চে দিলীপকে শুভেন্দুর ‘দাদা’ সম্বোধন আর হিরণের নাম উচ্চারণই এড়িয়ে যাওয়া সে জল্পনা আরও বাড়িয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement