পশ্চিমে মুসাম্বির চাষ

মোসাম্বি, মুসাম্বি, আবার কেউ বলে মৌসুমী— রসালো, অত্যন্ত উপকারী এই ফলটির চাহিদা বাজারে বছরভর। কিন্তু গাছে ফলে বছরে মাত্র এক বার। আমাদের রাজ্যের চাহিদা পূরণের জন্য মহারাষ্ট্র বা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ চেয়ে থাকতে হয়।

Advertisement

সত্যনারায়ণ ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৪ অগস্ট ২০১৬ ০১:১১
Share:

মোসাম্বি, মুসাম্বি, আবার কেউ বলে মৌসুমী— রসালো, অত্যন্ত উপকারী এই ফলটির চাহিদা বাজারে বছরভর। কিন্তু গাছে ফলে বছরে মাত্র এক বার। আমাদের রাজ্যের চাহিদা পূরণের জন্য মহারাষ্ট্র বা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ চেয়ে থাকতে হয়। অথচ এই রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল—বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম বা পশ্চিম মেদিনীপুরের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল অনাবাদী হয়ে পড়ে রয়েছে, তাতে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে চাষ করলে মিষ্টি মুসাম্বি লেবু পাওয়া যাবে। এখানে বলে রাখা দরকার, মুসাম্বির কোনও জাত হয় না। মুসাম্বি নিজেই মিষ্টি লেবু(sweet orange)-র জাত। মুসাম্বি ফল দেখতে গোলাকার, গায়ে লম্বালম্বি খাঁজ কাটা থাকে, যা মিষ্টি লেবুর অন্য জাতে নেই। এছাড়াও ফলের বোঁটার দিকে একটি গোলাকার রিং থাকে এবং ফলের ডগার দিকেও একটি গোলাকার রিং থাকে। ফলের রং পাকার আগে সবুজ, পাকার পর ধীরে ধীরে হলুদ হতে থাকে, তখন পেড়ে নিতে হয়।

Advertisement

মুসাম্বি লেবু চাষের প্রধান বাধা ভাল চারা। ভাল চারা বলতে দু’টি বিষয় বলতে হয়—

প্রথমটি হচ্ছে মা গাছ, মানে যে গাছ থেকে চারা তৈরি করা হবে, সেটি যেন অবশ্যই মুসাম্বি হয়। শত গুটি লেবু (অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক হারে চাষ হয়) এবং সরবতী লেবু জাতকে মুসাম্বি লেবু বলে অধিকাংশ নার্সারি চালায়।

Advertisement

দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুসাম্বি যে টক লেবু জাতের উপরে চোখ কলম পদ্ধতিতে চারা তৈরি করা হবে, সেই টক লেবুর জাতটি হতে হবে রংপুর লাইম অথবা কারনা খাট্টা। পশ্চিমবঙ্গের কোনও নার্সারিতেই এই টক লেবুর জাত দু’টি নেই। তবে, গ্রামে-গঞ্জে যে টক জামির লেবু পাওয়া যায়, সেই লেবুর বীজ থেকে চারা তৈরি করে তার উপর মুসাম্বি কলম করে চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, গুটি কলমের চারা বসাতে নেই।

কলমের চারা লাগাতে হবে ১৫ ফুট দূরে দূরে। সারি থেকে সারির দূরত্বও হবে ১৫ ফুট। জমিতে গাছ লাগানোর প্রকৃষ্ট সময় হল বর্ষা শেষের মুখে মানে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে। গাছ বসানোর আগে প্রতি গর্তে এক ঝুড়ি গোবর বা কম্পোস্ট সার, ৫০০ গ্রাম-এক কেজি হাড় গুঁড়ো এবং দুই চামচ থাইমেট মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়। বিকেলের দিকে গাছ বসানো উচিত। গাছ বসানোর পর প্রতি গাছে দুই-তিন লিটার জল ঝারিতে করে দিতে হবে।

গাছ বসানোর পর গাছে ঠেক দিতে হয়, যাতে কলমের জোড় অংশ ঝড়ে বা জোর বাতাসে ভেঙে না যায়।

কলমের নীচের অংশ থেকে মানে জংলি লেবুর গাছ থেকে কোনও ডালপালা নজরে আসা মাত্র ভেঙে দিতে হবে। কলমের অংশ থেকে একটি মাত্র ডালকেই প্রথম থেকে নির্বাচন করে বাড়তে দিতে হবে। বাকি ডালগুলি কেটে দিতে হয়। যে ডালটিকে বাড়তে দেওয়া হবে, সেটির মাথার দিকের ডগা দু’ফুট উচ্চতায় কেটে দিন। মাথা কাটা হলেই কাটার নীচের অংশ থেকে অনেকগুলি ডাল বের হবে। তখন তিন-চারটি ডাল রেখে বাকিগুলিকে কেটে দিতে হবে। তিন-চারটি ডালকে বাড়তে দিলে এদের গা থেকে প্রশাখা ডাল বেরিয়ে গাছের কাঠামো তৈরি করবে। গাছের শক্ত কাঠামো তৈরির উপর নির্ভর করে আয়ু এবং ফলন ক্ষমতা।

গাছ যখন বড় হয়ে যাবে, অর্থাৎ চার-পাঁচ বছর বয়সের পর প্রতি শীতকালে শুকনো, রোগাক্রান্ত, সরু ডাল কেটে দিতে হবে। এছাড়া গাছের ভিতর যদি অতিরিক্ত ডালপালা থাকে, সেগুলো কেটে দিতে হবে যাতে গাছে রোদ ঢুকতে পারে।

প্রথম থেকে ঠিক মতো পরিচর্যা করলে গাছ লাগানোর দুই-তিন বছর বাদে ফল ধরতে শুরু করে। ফুল আসে মাঘ মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহ থেকে। মনে রাখতে হবে, ফুল আসার আগের সময়টা গাছে কোনও মতে সেচ দেওয়া চলবে না। বর্ষার পর গাছে সেচ দেওয়া বন্ধ। গাছে যখন মটর দানার মতো ফল ধরবে, তখন থেকে তিন সপ্তাহ অন্তর জল দিতে হবে, যত দিন না বর্ষা আসে। ড্রিপ-এর মাধ্যমে সেচ দেওয়া ভাল। এক দিন অন্তর দুই ঘণ্টা হিসাবে ড্রিপ-এর মাধ্যমে সেচ দিতে হয়।

প্রতি বছর উৎকৃষ্ট মানের এবং আকারের মুসাম্বি পেতে হলে নিয়ম করে সার দিতে হবে। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে (পাঁচ বা তার বেশি বয়স) ৩০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার, ৪০০ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১৫০ গ্রাম ফসফরাস, ৩০০ গ্রাম পটাশ, ডলোমাইট বা চুন ৩০০ গ্রাম দিতে হবে। মোট এই সারের পরিমাণ তিনটি পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে মানে ফল যখন মটর দানা আকারের হবে, তখন জৈব সারের অর্ধেক অংশ, নাইট্রোজেন সারের তিন ভাগের এক ভাগ, ফসফরাস অর্ধেক অংশ এবং ডলোমাইট বা চুন অর্ধেক দিতে হবে। প্রথম সার প্রয়োগের দু’মাস বাদে দিতে হবে নাইট্রোজেন সারের তিন ভাগের দু’ভাগ, ফসফরাস সারের বাকি অংশ এবং পটাশ সারের অর্ধেক অংশ। শেষ পর্যায়ে মানে আষাঢ় মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বাকি যা পড়ে রয়েছে, তা প্রয়োগ করতে হবে গাছে। সার দিতে হয় গাছের গোড়া থেকে তিন ফুট দূরে দু’ ফুট চওড়া এবং ছয় ইঞ্চি গভীর গোলাকার রিং-এর ভিতর। প্রতি বছর গাছে দু’বার অণুখাদ্য সার প্রয়োগ করতে হয়। অণুখাদ্য সার জলে গুলে পাতায় স্প্রে করা ভাল। চৈত্র মাসে এক বার ও আষাঢ় মাসে আর এক বার।

মুসাম্বি গাছে এক ধরনের শুঁয়ো পোকা লাগে, যার গায়ে শুঁয়ো নেই। গাছ লাগানোর প্রথম দু’-তিন বছরে এদের প্রাদুর্ভাব না ঠেকাতে পারলে গাছ বড় করা বেশ কষ্টসাধ্য। নিয়মিত ভাবে রোগর ২ মিলি বা হোস্টাথিয়ন ১ মিলি বা স্পার্ক ১ মিলি প্রতি লিটার জলে পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ করতে হবে।

রোগের মধ্যে মরচে পড়া রোগ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এই রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে দেদো দাগ দেখা যায়, পাতায় ছিট ছিট দাগ, পাতা এবং ফল ঝরে যায়। এই রোগ দমন করতে পাতায় ভাল ভাবে স্প্রে করতে হবে স্ট্রেপ্টোসাইক্লিন ১/২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে, সাত দিন বাদে ব্লাইটক্স ৫ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে এবং তার ১৫ দিন বাদে স্ট্রেপ্টোসাইক্লিন ৩ গ্রাম প্রতি ১৫ লিটার জলের সঙ্গে + ব্লাইটক্স ২.৫ গ্রাম প্রতি লিটার হিসাবে।

মুসাম্বি পাকা শুরু হয় অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে এবং ওই মাসের শেষে ফল পাড়া শেষ হয়ে যায়। ফলের রং যখন হলদে হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে ফল পাকা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফল পাকা শুরু হলেই গাছ থেকে ফল পেড়ে নিতে হয়। না হলে ফলের ঔৎকর্ষ কমে। সাত-আট বছরের একটি গাছ থেকে ৩০০-৫০০ ফল পাওয়া যায়। এক-একটি গাছ ১৮-২০ বছর অবধি ভাল ফলন দেয়।

একটি কথা বলে রাখা দরকার, মুসাম্বি যেহেতু ১৫ ফুট দূরে-দূরে বসানো হয়, সেহেতু দু’টি গাছের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় প্রথম পাঁচ-ছ’বছর বর্ষাকালে বিভিন্ন ধরনের সব্জি, বিরি কলাই, চিনা বাদাম, বরবটি ইত্যাদি চাষ করে আয় বাড়ানো যায়।

লেখক: বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ( ফল ও উদ্যান পরিচর্যা বিভাগ)। যোগাযোগ: ৯৪৭৫২১৩৪৭৪।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement