দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। (ইনসেটে) কুণাল ঘোষ। — নিজস্ব চিত্র।
দিল্লির পুরনো বঙ্গভবনে শুক্রবার মুখোমুখি দেখা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত জানান, শুক্রবার আচমকাই শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁর। সৌজন্য বিনিময়ও হয়েছে। ঘটনাচক্রে, শুক্রবারই তৃণমূলের আর এক বিধায়ক কুণাল ঘোষকে বিসি রায় শিশু হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য করা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। তিনি জানিয়েছেন যে, সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ঘটনাচক্রে, ভোট-পরবর্তী সময়ে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে কয়েক জন বিধায়ক সুর চড়িয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঋতব্রত এবং কুণাল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে শুক্রবার প্রথম বার দিল্লি সফরে গিয়েছেন শুভেন্দু। সেখানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। তাঁর ফাঁকে দিল্লির পুরনো বঙ্গভবনে তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা যায় তাঁর। তাঁর কাঁধে হাত রেখে কথা বলতেও দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রীকে। শুভেন্দুর সঙ্গে ছিলেন দিল্লির রেসিডেন্ট কমিশনার দুষ্মন্ত নারিওয়ালা। ঋতব্রত জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আচমকাই দেখা হয়েছে তাঁর।
দিল্লির বঙ্গভবনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছেন শুভেন্দু অধিকারী। —নিজস্ব চিত্র।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন তৃণমূলের বিধায়ক? তিনি জানিয়েছেন, রাজ্যসভায় তাঁর সাংসদপদের মেয়াদ শেষ হয়েছে এপ্রিলের গোড়ায়। তার পরে এক মাস, অর্থাৎ ৩ মে পর্যন্ত তাঁর নামে বাংলো বরাদ্দ ছিল। সেই মেয়াদ শেষ হয়েছে। রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণা হয়েছে ৪ মে। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত জানিয়েছেন, ভোটের ফলঘোষণা, তার পরে বিধায়ক হিসাবে তাঁর শপথগ্রহণ— এ সব কারণে দিল্লি যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। নিয়ম অনুসারে, মেয়াদ পেরোনোর পরেও সরকারি বাংলো না-ছাড়লে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হয়। ঋতব্রত জানান, সেই ভাড়া মেটাতে তিনি দিল্লি গিয়েছেন। পাশাপাশি, কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট সংগ্রহ করাও ছিল উদ্দেশ্য। তিনি যখন রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন, তখন তাঁর কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল। এখন তিনি বিধায়ক। বিধায়কদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয় না। ঋতব্রত জানান, সেই সব কাজ মেটানোর পরে পুরনো বঙ্গভবনে মধ্যাহ্নভোজ সারতে গিয়েছিলেন তিনি। তখনই সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।
বঙ্গভবন সূত্রের খবর, ঋতব্রতকে দেখে শুভেন্দু এমএলএ সাহেব বলে সম্বোধন করেন। তিনি বঙ্গভবনে উঠেছেন কি না জিজ্ঞেস করেন। এর পরে সৌজন্য বিনিময় করেন দু’জন। ঋতব্রতের কাঁধে হাত দিয়েও কথা বলতে দেখা যায় শুভেন্দুকে। সূত্রের খবর, শুভেন্দু ঋতব্রতকে জানান, রাজ্য সরকারের কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিধায়কদের ডাকা হচ্ছে। ঋতব্রত যদি তাঁর এলাকার (উলুবেড়িয়া পূর্ব) সরকারি কর্মসূচিতে যোগ দেন, তা হলে তা হবে ইতিবাচক বার্তা।
রাজ্য সরকারের কর্মসূচিতে কি যোগ দেবেন ঋতব্রত? তিনি বলেন, ‘‘আমি দলের প্রতি অনুগত। দল যা বলবে, তা-ই করব। সরকারি কর্মসূচিতে যেতে বললে যাব, না হলে যাব না।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘ব্যক্তি হিসাবে আমি মনে করি, মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিমুখ ইতিবাচক ও সদর্থক। এটাই হওয়া উচিত।’’
বিধানসভা ভোটের পরে তৃণমূলের অন্দরে যাঁরা সবচেয়ে বেশি সরব, প্রকাশ্যে নেতৃত্বের ‘সিদ্ধান্ত’ নিয়ে মুখ খুলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঋতব্রত। সেই তাঁর সঙ্গেই কাকতালীয় ভাবে বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রীর দেখা হওয়ায় তৃণমূলের অন্দরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে বলে খবর। ঋতব্রতের ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, এর মধ্যে অন্য কোনও গন্ধ বা মানে খুঁজতে যাওয়া অমূলক। নেহাতই ‘আচমকা’ শুভেন্দুর সাক্ষাৎ হয়েছে তৃণমূলের বিধায়কের। যদিও রাজনীতির কারবারিদের অভিমত, রাজনীতি চিরকাল ‘সম্ভাবনার শিল্প’।
ঋতব্রতের মতোই কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে সরব হয়েছিলেন কুণাল। তিনি দাবি করেছিলেন, মন খুলে দলে কথা বলতে দিতে হবে। পথে নামতে হবে নেতাদের। ভোটের দু’দিন আগে ময়দান ছেড়ে দেওয়া ফলতার জাহাঙ্গির খানকে সামনে রেখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তুলেছিলেন তিনি এবং ঋতব্রত। সঙ্গে ছিলেন এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাও। পরে তাঁদের ডেকে কথা বলেছিলেন অভিষেক। দলের এক্স হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করে তৃণমূলের তরফে লেখা হয়, দলের অন্দরে কথা বলার গণতান্ত্রিক পরিসর রয়েছে। সেই কুণালকে এ বার বিসি রায় শিশু হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি কি সেই নিয়োগ গ্রহণ করবেন? জবাবে কুণাল বলেন, ‘‘অবশ্যই করব।’’
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে বিএসএনএলের উপদেষ্টা কমিটিতে থাকার জন্য কুণালকে জানানো হয়েছিল। সেই সময়ে যদিও সেই প্রস্তাব কুণাল গ্রহণ করেননি। কিন্তু শুক্রবার তা করলেন। আর ঘটনাচক্রে, সেই দিনই দিল্লির বঙ্গভবনে শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা হল আর এক ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূল বিধায়কের। ঋতব্রতের দাবি, সেই সাক্ষাৎ ছিল ‘আচমকাই’।