তৃণমূলের ধর্না মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলায়। — নিজস্ব চিত্র।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে গোড়া থেকেই নিশানা করে আসছে তৃণমূল কংগ্রেস। এ বার এক ধাপ এগিয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে বিজেপিকে ‘সামাজিক বয়কটে’র ডাকও দিয়েছেন তিনি। এসআইআর-কে কেন্দ্র করে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অভিষেকের এই আহ্বানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক শিবির।
ভোটার তালিকা থেকে যথেচ্ছ নাম বাদ দেওয়া এবং ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রেখে দেওয়ার প্রতিবাদে শুক্রবার ধর্মতলায় ধর্নায় বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক বক্তৃতা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করে দিলেও রাতে ধর্নাস্থলেই তাঁবুতে থাকছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চ শহরে আসা পর্যন্ত ওই অবস্থান কর্মসূচি চালু থাকবে বলেই একটি সূত্রের ইঙ্গিত। প্রথম দিনে একেবারে গোড়ায় স্বল্প বক্তৃতা ছাড়া মূলত সূত্রধারের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তৃণমূল নেত্রীকে। মূল বক্তব্যের জন্য তিনি এগিয়ে দিয়েছিলেন অভিষেককেই।
ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে (মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির অজুহাত দেখিয়ে), এমন ২২ জনকে এ দিন হাজির করানো হয়েছিল ধর্না-মঞ্চে। তাঁদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করি, তাই খুঁজে বার করেছি।’’ তাঁর মন্তব্য, ‘‘লজ্জা রাখার জায়গা নেই। বিজেপি একটা নির্লজ্জ, বেহায়া দল!’’
ওই মঞ্চ থেকে ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র নামে মানুষকে হয়রান করা এবং ভোটার তালিকায় নাম তোলার ফর্ম ৬ ও নাম বাদ দেওয়ার ফর্ম ৭-এর সংখ্যার নিরিখে ‘জালিয়াতি’র অভিযোগ তুলে ফের সরব হয়েছেন অভিষেকও। সেই সূত্রেই তিনি বলেছেন, “২০২১-এ কয়েকটি সামাজিক সংগঠন ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলেছিল। এই মঞ্চে ১০ কোটি বঙ্গবাসীকে সাক্ষী রেখে বলছি, শুধু ‘নো ভোট টু বিজেপি’ নয়, এ বার বিজেপিকে বয়কট করতে হবে। বিজেপিকে সামাজিক ভাবে বয়কট করুন।” ‘বয়কট বিজেপি’ স্লোগান তুলেই তাঁর সংযোজন, ‘‘যে ভাবে এরা অপমান করেছে, বাঙালির সামান্য বিবেক বোধ থাকলে বিজেপিকে ভোট দেওয়া উচিত নয়! যাকে ইচ্ছে ভোট দিন, বিজেপিকে দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। তৃণমূলকে পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু বিজেপিকে নয়। এদের শিক্ষা দিতে হবে।’’ পাশাপাশিই, দলের কর্মীদের প্রতি তাঁর আহ্বান, ‘‘অপরিকল্পিত এসআইআর-এর জন্য বিজেপি ১৭২ জনের প্রাণ নিয়েছে। বাংলায় ১৭২টা বুথেও যেন এদের অস্তিত্ব না থাকে।’’
নির্বাচন কমিশনের আসন্ন রাজ্য সফরের প্রতি ইঙ্গিত করে অভিষেক এ দিন বলেছেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমারকে বলব, ক’টা বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা বাদ গেল, তাঁদের তালিকা নিয়ে আসুন। না হলে বিজেপি নেতারা কান ধরে ওঠবোস করুন! কমিশন তো আমরা চালাই না।’’ এই সূত্রেই বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে অভিষেকের তোপ, ‘‘ভোটার তালিকায় ৬০ লক্ষ যদি বিচারাধীন থাকে, আপত্তি নেই। কিন্তু তা হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চেয়ারও বিচারাধীন থাকবে। আর যদি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার বিচারাধীন না থাকে, তা হলে ৬০ লক্ষকেও ভোটাধিকার দিতে হবে। ন্যায্য অধিকার না-পেলে মমতার নেতৃত্বে তৃণমূল রাস্তায় থাকবে।’’
বিজেপি প্রত্যাশিত ভাবেই মমতা-অভিষেকের ধর্না কর্মসূচিকে কটাক্ষ করেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ে ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প যাত্রায়’ গিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তিনি বলেছেন, ‘‘কার জন্য ধর্না? বেকার যুবক, শিল্প, কৃষক, নারী শিক্ষার সুরক্ষার জন্য নয়। শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের জন্য নয়। আরও বন্দর, বিমানবন্দর কিংবা রেললাইনের জন্য নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় ধর্নায় বসে আছেন বাংলাদেশের মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর জন্য। আমাদের এই লড়াই পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচানোর জন্য।’’ পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র সভায় বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের দাবি, ‘‘বহু ভুয়ো ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তাই উনি খুবই চিন্তায় আছেন। জেতার আর কোনও সুযোগ নেই তো!”
তবে বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলকে ভোট দেওয়ার জন্য অভিষেকের আহ্বানের প্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘এ বারের ভোট যে বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার, এতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে তৃণমূলকেও ছাড় দেওয়ার জায়গা নেই। বিকল্প একমাত্র বামপন্থীরা। বামেরা যে ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হচ্ছে, সব পক্ষই বুঝতে পারছে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে