শুভেন্দু অধিকারী। — ফাইল চিত্র।
শুধু রাজ্যে নয়, ভিন্রাজ্যের হাজার হাজার হাসপাতালে এ বার বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। এ রাজ্যের নাগরিক, যাঁরা ভিন্রাজ্যে থাকেন, তাঁরাও পাবেন পরিষেবা। পশ্চিমবঙ্গে চালু হল কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প। সোমবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্যের সেই মউ সই হল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নড্ডা-সহ কেন্দ্র এবং রাজ্যের আমলারা। মউ সই হওয়ার পরে কেন্দ্রীয় সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি এবং মুখ্যসচিব জানিয়েছেন, এ রাজ্যের মানুষজন কী কী সুবিধা পাবেন এ বার থেকে।
রাজ্যে কত জন পাবেন সুবিধা
মনোজ জানান, এত দিন এ রাজ্যের ১১ কোটি মানুষ বঞ্চিত ছিলেন। এ বার তারা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সবিধা পাবেন। মনোজ বলেন, যাদের জন্য প্রকল্প তারাই পাবেন। তিনি আরও জানান, ৭০ বছরের বেশি বয়স, রাজ্যে এমন ৪০ লক্ষ মানুষের জন্য রয়েছে বিশেষ প্যাকেজ। তাঁদের জন্য মোদী সরকার বরাদ্দ করেছে পাঁচ লক্ষ টাকা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুপ্রিয়া পটেল জানিয়েছেন, এ বার দেশের প্রবীণেরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন। মনোজ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে আশা কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষের বেশি। তাঁরাও পাবেন সুবিধা।
ভিন্রাজ্যে চিকিৎসার সুবিধা
মুখ্যসচিব মনোজ জানান, এত দিন এজিআই হায়দরাবাদ, শঙ্কর নেত্রালয়ের মতো হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গেলে এ রাজ্যের মানুষজনকে হয় নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হত অথবা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা ব্যবহার করতে হত। এখন আর তার প্রয়োজন নেই। প্রকল্পের অন্তর্গত যত হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে পারবেন রাজ্যবাসী। পশ্চিমবঙ্গ এবং তার আশপাশের রাজ্যেও সেই সুবিধা মিলবে। যাঁদের বয়স ৭০ বছর, তাঁদের সুবিধা দ্বিগুণ। মনোজ জানান, রাজ্যের পূর্বতন সরকারের দেওয়া কার্ডে মাত্র আড়াই-তিন হাজার হাসপাতালেই সেই সুবিধা মিলত। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুপ্রিয়া জানান, দেশের মোট ৩৬ হাজারের বেশি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে পারবেন বঙ্গবাসী। অবশ্যই সেই হাসপাতালগুলি এই প্রকল্পে নথিভুক্ত থাকতে হবে। কার্ড থাকলেই সেখানে চিকিৎসা হবে।
প্রবাসীদেরও সুবিধা
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানিয়েছেন, এমন অনেকে রয়েছে, যাঁদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে, এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে, আধার রয়েছে, কিন্তু থাকেন হয়তো দিল্লিতে, এ বার তাঁরাও কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। দেশের যে কোনও প্রান্তে পরিষেবা পাবেন তাঁরা। এত দিন সেই সুবিধা পেতেন না ভিন্রাজ্যে বসবাসকারী এ রাজ্যের নাগরিকেরা।
শুভেন্দু জানান, দেশের উন্নতির সঙ্গে এখন জুড়েছ পশ্চিমবঙ্গ। আর তাতে বড় ভূমিকা নড্ডার। তিনি অনুপ্রিয়া, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সচিব পুণ্যসলিলা শ্রীবাস্তবকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তার পরেই একহাত নেন পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে। তিনি জানান, আগের সরকার নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কোনও সুবিধা নিতে চায়নি। ২০১৮ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর রাঁচি থেকে মোদী এই প্রকল্প শুরু করেন। শুভেন্দু মনে করিয়ে দেন, সে সময় তিন রাজ্য সেই সুবিধা নেয়নি। ওড়িশা, দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গ। ওড়িশা, দিল্লির পরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও ‘বিকাশ বিরোধী সরকারকে টাটা’ করেছে।
জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযানে গত দুই আর্থিক বর্ষে রাজ্যের পূর্বতন সরকার কোনও কাজ করেনি, এমনটাই জানান শুভেন্দু। কেন্দ্র থেকে যে গাইডলাইন পাঠানো হয়, তা-ও কার্যকর করা হয়নি। এর পরেই তিনি বলেন, ‘‘ওদের ভাবনাচিন্তা দেখুন! ওখানে লেখা ছিল আয়ুষ্মান মন্দির। বলে, মন্দির কেন লেখা, করব না (কার্যকর)। আজ মানুষ ডবল ইঞ্জিনের সুফল পাচ্ছে। চুক্তি হয়ে গেল।’’ শুভেন্দু জানান, ১ কোটি ৪৩ লক্ষ পরিবার সুবিধা পাবে। ‘ইন্ডিভিজুয়াল কার্ড’ দেওয়া হবে। যোজনায় কেন্দ্রের যে ৯৭৬ কোটি টাকার ভাগ ছিল, তা-ও বাংলাকে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘ভাষণ নয়, কাজে করে দেখাচ্ছে সরকার মোদীজির নেতৃত্বে।’’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, গোটা দেশে কিশোরীদের এইচপিভি টিকা ফেব্রুয়ারিতেই দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার তা চালু করতে দেয়নি। রাজ্যের জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টিকার ডোজ বরাদ্দ হয়। কিন্তু প্রকল্প শুরু করতে দেয়নি। বর্তমান সরকার তা চালু করেছে। সাংসদ, বিধায়কদের প্রকল্পের সঙ্গে কী ভাবে জুড়তে হবে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন। সেই মতো কাজ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্রকে প্রস্তাব দিয়েছিল, রাজ্যে আরও ৪৬৭ প্রধানমন্ত্রী জনৌষধি কেন্দ্র করার অনুমতি যাতে মেলে। এতে আর্থিক ভাবে দুর্বল জনতা স্বস্তি পাবে।’’ তিনি এ-ও জানান, আগের সরকারের জন্য ২০২৩ থেকে ২০২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত যে বরাদ্দ থেকে বাংলার মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন, তা এখন দেওয়া হলে সুবিধা হবে।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে ভারতে এখন পর্যন্ত ৪৪ কোটি কার্ড বিতরণ হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৩৬ হাজার ১৯৩টি হাসপাতাল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। তার মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ১৬ হাজার ৫৫৭। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১২.১৭ কোটি মানুষকে ১.৮২ লক্ষ কোটি টাকা দিয়েছে মোদী সরকার। ৪৯ শতাংশ আয়ুষ্মান কার্ড মহিলাদের জন্যই অনুমোদিত হয়। হাসপাতালে যাঁরা উপকৃত হয়েছেন, তাঁদের ৪৯ শতাংশ মহিলা।