দিল্লির গোপনস্থানে বৈঠকে তৃণমূল সাংসদেরা। (বাঁ দিক থেকে) শর্মিলা সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুখেন্দুশেখর রায়, জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়া, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, অসিত মাল। ছবি: সংগৃহীত।
তৃণমূলের ভাঙনের আঁচ এ বার কলকাতা থেকে পৌঁছে গেল দিল্লিতেও। একটি সূত্র বলছে, রবিবার রাতে দিল্লির কোনও এক গোপন স্থানে দলের প্রায় ২০ জন সাংসদ বৈঠকে বসেছেন। ঘটনাচক্রে, যখন এই বৈঠক চলছিল, তখন দিল্লিতে উপস্থিত ছিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে রয়েছেন তাঁরা। বৈঠকের একটি ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে আট জন সাংসদকে দেখা গিয়েছে। যদিও সূত্র বলছে, ২০ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। তৃণমূলেরই একটি সূত্র বলছে, এক মহিলা সাংসদের না জানিয়ে সেই ছবি তোলা নিয়ে বাক্বিতণ্ডাও হয়েছে বৈঠকে।
দিল্লিতে গোপন স্থানে ওই গোপন বৈঠকে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা করছিলেন তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদেরা। একটি সূত্র বলছে, দু’টি সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এক, স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চিঠি দিয়ে জানাবেন যে, তাঁদের নেতা আর অভিষেক নন। তাঁদের এ বার থেকে সংসদে ‘ভিন্ন গোষ্ঠী’ বলে চিহ্নিত করা হোক। দুই, গণইস্তফা দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও উপস্থিত সাংসদেরা আলোচনা করেছেন বলে দাবি একটি সূত্রের। দু’টির একটি সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হলে দিল্লিতে বসে বড়সড় ধাক্কা খেতে পারেন মমতা। ‘ইন্ডিয়া’ জোটে আরও কোণঠাসা হতে পারেন।
বৈঠকের যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা গিয়েছে, সেখানে ছিলেন বর্ধমান পূর্বের সাংসদ শর্মিলা সরকার, হাওড়ার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, কোচবিহারের জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়া, বাঁকুড়ার অরূপ চক্রবর্তী, ঝাড়গ্রামের সাংসদ কালীপদ সোরেন, বোলপুরের অসিত মাল। একটি সূত্র বলছে, বৈঠকে ছিলেন মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদার। ছবিতে দেখা গিয়েছে রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়কেই। সোমবার সকালেই দিল্লি থেকে সুখেন্দু জানান, তিনি তৃণমূল এবং রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সুখেন্দুশেখরের দাবি, দলের অন্দরে দুর্নীতি এবং দল নিয়ে মানুষের ক্ষোভ মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই পতন ছিল অনিবার্য। সুখেন্দুর এই ইস্তফার পরে বৈঠক নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে।
একটি সূত্র বলছে, বৈঠকে উপস্থিত এক মহিলা সাংসদ সেখানকার ছবি তুলে নেন। দক্ষিণবঙ্গের এক সাংসদ সেই ছবি তোলা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। বৈঠকে উপস্থিত সাংসদদের সূত্রে জানা গিয়েছে, যিনি ছবি তোলেন, তিনি দাবি করেন, সেটি ‘শাহজির’ কাছে পাঠাতে হবে। তাতে দক্ষিণবঙ্গের ওই সাংসদ জানান, ছবি যে তোলা হচ্ছে, তা আগে জানানো উচিত ছিল। এই নিয়ে বৈঠকে বাক্বিতণ্ডা চলে বলে খবর। সূত্রের খবর, সোমবারও কেন্দ্রীয় সরকারের একটি দফতরে কয়েক জন ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূল সাংসদ এক সঙ্গে রয়েছেন। তাঁরা কথাবার্তা বলছেন বলে খবর।
বৈঠক প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তৃণমূলের আর এক সাংসদ সৌগত রায় বলেন, ‘‘বিজেপির পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, বলেছিলাম পরে জানাব। পরে না করে দিয়েছি। বলেছি, আমি তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছি।’’
বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পরে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক-সাংসদ, নেতাদের একটা বড় অংশ আঙুল তুলেছেন মূলত অভিষেকের দিকে। তবে মমতা আস্থা রাখের অভিষেকের উপরেই। ‘বিদ্রোহ’ এবং ‘বিরোধিতা’ সত্ত্বেও অভিষেকই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন। তবে তাঁর সঙ্গে সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয় রাজ্যসভার দুই সাংসদ দোলা সেন এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনকে। সূত্রের খবর, তার পরে দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। একটি সূত্র বলছে, তৃণমূলের এক সাংসদ মুম্বইয়ে ছিলেন। সেখান থেকে শনিবার তাঁর কলকাতায় ফেরার কথা ছিল। সূত্রের দাবি, আচমকাই ফোন বন্ধ করে মুম্বই থেকে দিল্লি চলে যান তিনি। সূত্রের খবর, গোপন আস্তানায় তৃণমূলের ওই বৈঠকে ছিলেন তিনিও।
রাজ্য বিধানসভায় ইতিমধ্যে তৃণমূলের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা না মেনে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেন কয়েক জন বিধায়ক। মোট ৫৯ জনের সমর্থনে বিরোধী দলনেতা হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। জল্পনা, পরিষদীয় দলের পর একই ধাঁচে ভাঙতে চলেছে তৃণমূলের সংসদীয় দলও। তারই প্রথম ধাপ হিসাবে দিল্লিতে শনিবার গোপন স্থানে বৈঠকে বসেছেন তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ, এমনটাই বলছে সূত্র।