অমিতের সামনেই উঠল শিল্পক্ষেত্রে অশান্তির কথা

সিঙ্গুর দিবসের চব্বিশ ঘণ্টা কাটার আগেই এ রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে অশান্তির কথা উঠে এল টাটা গোষ্ঠীর অন্যতম সংস্থা টাটা হিতাচি কর্তৃপক্ষের মুখে। শনিবার বণিকসভা সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্র।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৩:৪১
Share:

ইস্টার্ন রিজিওনাল কাউন্সিলের বৈঠকে অমিত মিত্র। —নিজস্ব চিত্র।

সিঙ্গুর দিবসের চব্বিশ ঘণ্টা কাটার আগেই এ রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে অশান্তির কথা উঠে এল টাটা গোষ্ঠীর অন্যতম সংস্থা টাটা হিতাচি কর্তৃপক্ষের মুখে।

Advertisement

শনিবার বণিকসভা সিআইআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্র। সেখানে টাটা হিতাচির মানবসম্পদ, শিল্প সম্পর্ক ও সামাজিক প্রকল্পের প্রধান ইন্দু সিংহ সরাসরি জানান, পশ্চিমবঙ্গে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পিস’ বা শিল্পক্ষেত্রে শান্তির খুবই অভাব। অমিতবাবুর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘শিল্পক্ষেত্রে শান্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কাজ করতে হবে। উৎপাদন বজায় রাখতে হবে।’’ এর পরেই তিনি যোগ করেন, ‘‘প্রায়ই ম্যানেজারেরা এখানে বড় সমস্যার কথা বলেন। আমি রোজ নিজে অস্থায়ী কর্মীদের সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাই।’’

মন্ত্রী হিসেবে শিল্পমহলের মুখোমুখি হয়ে এ ধরনের তোপের মুখে আগে কখনও পড়েননি অমিতবাবু। দৃশ্যতই অস্বস্তিতে পড়ে যান তিনি। ইন্দু তখন অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ফারাকের কথা বলছেন। বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড এবং কর্নাটকে সংস্থার কাজকর্ম দেখেন তিনি। ‘‘অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকালেই ফারাকটা ধরতে পারবেন আপনারা,’’ বলেন তিনি।

Advertisement

তবে রাজ্য সরকার, বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা যে ব্যক্তিগত ভাবে সমস্যা সমাধানে তাঁদের সাহায্য করেছেন, তারও উল্লেখ করেন ইন্দু সিংহ। তিনি বলেন, ‘‘আপনারা বড় দল, আপনাদের নিজস্ব ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব রয়েছে। তাতেই তো সমস্যার সমাধান হয়েছে!’’

ইন্দুর এই বক্তব্যকে অবশ্য ভারসাম্য এবং তার সঙ্গে সূক্ষ্ম খোঁচার মিশেল বলেই ব্যাখ্যা করছেন রাজ্যের শিল্প বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন বাম আমলেও ছিল। সেই আন্দোলনে শিল্পের গতি শ্লথ হয়েছে। ব্রিটানিয়া, হিন্দুস্থান লিভারের মতো সংস্থা সদর দফতর এই রাজ্য থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনের পরেও কি অবস্থা বদলেছে, প্রশ্ন তাঁদের। খোদ মুখ্যমন্ত্রী একাধিক বার শ্রমদিবস নষ্টের জন্য খেদ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আমলে যে সেই ধারা বদলের চেষ্টা করছে সরকার, উল্লেখ করেছেন সে কথাও। অমিত মিত্রও সে
কথা বলেছেন এ দিন মঞ্চ থেকে।

তবু, কোথায় যেন একটা কাঁটা রয়েই গিয়েছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীও কি পেরেছেন সব সমস্যা মেটাতে? তা হলে ২০১২ সালে হলদিয়া বন্দরে মাল খালাসের দায়িত্বে থাকা এবিজি সংস্থার কর্মীরা মার খেলেন কেন? বা অন্ডালের খনিতে তোলা আদায় নিয়ে বচসার জেরে আইএনটিটিইউসি নেতার ঘুষিতে ঠিকাদারের মৃত্যুর ঘটনা কেন ঘটল? শুধু ২০১৫ সালের অন্তত চারটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছে শিল্পমহল। এক, দুর্গাপুরে রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ টাকার ভাগ না পেয়ে ঠিকাদারকে মার ও খুনের হুমকির অভিযোগ তৃণমূল কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। দুই, দুবরাজপুরে জাতীয় সড়ক সংযোগকারী দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার কাজ আটকে যায় তৃণমূলের মদতে চলা সিন্ডিকেটের জুলুমে। তিন, চাঁচলে হাসপাতালের কাজের সময় তোলা চেয়ে লার্সেন অ্যান্ড
টুব্রো কর্মীদের উপরে হামলার অভিযোগ তৃণমূল অঞ্চল সভাপতির বিরুদ্ধে। চার, এ মাসেই গঙ্গারামপুরে রাস্তার কাজে তোলা চেয়ে ম্যাকিনটস বার্নের দুই কর্মীকে মারধরের অভিযোগ।

শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দিন টাটা হিতাচির আধিকারিকের কথায় সেই ক্ষোভের দিকটাই ফুটে উঠেছে, যা বলে দিচ্ছে— পরিবর্তন কিছু হয়নি।

প্রকারান্তরে সে কথা মেনে নিয়ে অমিত মিত্র জানিয়েছেন, এটা সমাজতাত্ত্বিক বদলের বিষয়। ৩৪ বছরে যা হয়ে এসেছে, চার বছরে তা আমূল বদলে যাবে, এমন মনে করা ঠিক হবে না। অনুষ্ঠানের পরে তিনি অবশ্য বলেন, টাটা হিতাচির আধিকারিক আসলে প্রশংসাই করেছেন।

কিন্তু মন্ত্রীর কথায় সভায় হাজির বাকি শিল্পপতিরা আদৌ আশ্বস্ত হয়েছেন কি না, সে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে। কারণ অন্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা তাঁরাও করেছেন। ইনসেনটিভ বা আর্থিক সুবিধার প্রসঙ্গে পশুখাদ্য সংস্থা আনমোল ফিডস কর্তা অমিত সারাওগি জানিয়েছেন, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং ওড়িশার লাভজনক ইনসেনটিভ প্রকল্পের তুলনায় এ রাজ্যে সুযোগ-সুবিধা কম। অন্য দিকে, বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থা সিসকো-র কর্তা অমিত মালিক খোলাখুলি জানান, এ রাজ্যে স্টার্ট-আপ সংস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা নেই। যেমন রয়েছে কর্নাটকে।

খড়গপুরে টাটা হিতাচির কারখানায় কয়েক দিন ধরেই অস্থায়ী কর্মীদের নিয়ে গন্ডগোল চলছে।

বেতন ও অন্যান্য সুবিধার দাবিতে কর্মীরা কর্মবিরতিও করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর। চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত এই অস্থায়ী কর্মীদের অধিকাংশ শাসক দলের শ্রমিক সংগঠনের সদস্য। ফলে টাটা গোষ্ঠীর সংস্থার এই সমস্যায় নতুন কিছু দেখছেন না শিল্পকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিল্পকর্তা জানান, বড় সংস্থা বলে টাটা হিতাচির সমস্যা মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছেছে। ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলি নিত্যদিন এ ধরনের হেনস্থা সহ্য করে ব্যবসা চালায়।

টাটা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। চুক্তির ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ করতে গিয়ে খোদ রাজারহাটে সমস্যায় পড়েছে দেশের বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা টিসিএস। রাজারহাটে ১৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে সাফাই কর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান-সহ বিভিন্ন পরিষেবার জন্য কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের চাপের মুখে পড়েছিল তারা। সংস্থার নিয়ম মেনে কর্মী নিয়োগের সময় খতিয়ে দেখা হয় তার অতীত রেকর্ড। অর্থাত্‌ পুলিশের খাতায় নাম রয়েছে কি না। সেখানেও জট পাকিয়েছিল সিন্ডিকেট।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement