ছেলেকে কোলে নিয়ে এ বার ঘুমোব, স্বস্তির নিঃশ্বাস মায়ের

থমথমে ইলিয়ট রোডের শিশুকল্যাণ সমিতির দফতর। বড় হলঘরের মধ্যে ছেলে দুর্জয়কে নিয়ে বসে রয়েছেন মা নমিতা ভক্ত। বাংলাদেশ থেকে চলে আসা ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তখনও আইনি টালবাহানা চলছে।

Advertisement

দীক্ষা ভুঁইয়া

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০১৫ ০৩:৩০
Share:

মা ও মামার হাত ধরে বাড়ির পথে দুর্জয়। শুক্রবার কলকাতায় স্বাতী চক্রবর্তীর তোলা ছবি।

থমথমে ইলিয়ট রোডের শিশুকল্যাণ সমিতির দফতর। বড় হলঘরের মধ্যে ছেলে দুর্জয়কে নিয়ে বসে রয়েছেন মা নমিতা ভক্ত। বাংলাদেশ থেকে চলে আসা ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তখনও আইনি টালবাহানা চলছে। এমন সময় ঘরে ঢুকলেন শিশুকল্যাণ সমিতির এক সদস্য। বললেন, ‘‘ব্যস, সব শেষ।’’ একটু থেমেই ফের বললেন, ‘‘আপনি ছেলেকে নিয়ে এ বার বাংলাদেশে ফিরে যেতেই পারেন।’’

Advertisement

কলকাতার শিশুকল্যাণ সমিতির সদস্যের মুখে এমন কথা শুনে কার্যত বাক্‌রুদ্ধ নমিতাদেবী। পাশে চেয়ারে এলিয়ে পড়েছে বছর পনেরোর দুর্জয়। তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত স্বস্তির রেশ।

চার বছরের অপেক্ষা শেষ। সন্ধ্যায় ইলিয়ট রোডের দফতর থেকে ছেলের হাত ধরে বেরোলেন নমিতাদেবী। গিয়ে উঠলেন পার্ক স্ট্রিট এলাকার এক হোটেলে। বলছিলেন, ‘‘চার বছর আগে ছেলে হারানোর পরে ঠিক মতো ঘুমোতে পারতাম না। আজ রাতটা ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে ঘুমোব।’’ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আইনি জট কাটানোয় বারবার ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন বিদেশ মন্ত্রক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও বাংলাদেশ হাইকমিশনকে।

Advertisement

২০১১ সালে ইদের আগের দিন উৎসব দেখতে দুর্জয় সীমান্তের কাছে এসেছিল। তার পরেই এক হুড়োহুড়িতে পড়ে সে চলে আসে এ-পার বাংলায়। দুর্জয় জানিয়েছে, এ দেশে এসে প্রথমে এক মাদক পাচারকারী এবং তার পর মালিপুকুর হোমের অত্যাচার সইতে হয়েছিল তাকে। পরে শিশুকল্যাণ সমিতির মাধ্যমে ঠাঁই পায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার কামালগাজির ‘ইচ্ছে’ অনাথ আশ্রমে। সেখানে নিজের নাম বলেছিল, ইন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী।

মালিপুকুর হোমে থাকতেই দুর্জয়ের খবর বিদেশ মন্ত্রক মারফত গিয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু সেই খবর পেয়ে যত দিনে নমিতাদেবীরা আসেন, তত দিনে মালিপুকুর হোম ওই নামে কোনও আবাসিকের কথা স্বীকার করেনি। দুর্জয়ের এই নিখোঁজ রহস্য গত বুধবারের আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ইচ্ছে’ আশ্রমে বসে সে দিন সকালে নিজের ছোটবেলার ছবি ও খবর দেখে দুর্জয়। তার পর বুধবার বিকেলে নিজেই শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীদের নিজের কথা খুলে বলে। সেখান থেকে খবর আসে আনন্দবাজারে। দুর্জয়ের মামা সুব্রত মণ্ডলের ফোন নম্বর আনন্দবাজারের কাছে ছিল। আনন্দবাজারের প্রতিনিধির মাধ্যমেই দুর্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বাংলাদেশে থাকা মামার। বৃহস্পতিবার সুব্রতবাবুর সঙ্গে দুর্জয়ের মা নমিতা ভক্ত এ দেশে এসে দুর্জয়ের সঙ্গে দেখা করেন।

Advertisement

বৃহস্পতিবার বিকেলেই ছেলের সঙ্গে মায়ের দেখা হয়েছিল। আইনি পথে ছেলেকে ফিরে পেতে এ দিন সকাল সাড়ে সাতটারতেই মধ্য কলকাতার হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সুব্রত ও নমিতাদেবী। সঙ্গে ছিলেন সুজন রায় নামে তাঁদের এক আত্মীয়ও। প্রথমেই দুর্জয়ের সীমান্ত পেরনোর অনুমতি জোগাড় করতে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে যান তাঁরা। সমাজকল্যাণ দফতরের এক আধিকারিকের সূত্রে বিষয়টি আগেই জানতে পেরেছিল ডেপুটি হাইকমিশন। ফলে দুর্জয় নাম বলতেই অনুমতিপত্র তৈরি করা শুরু হয়ে যায়। এমন সময় হঠাৎই দেখা যায়, একটি ফর্ম পূরণ করা বাকি রয়েছে। তাতে দুর্জয়ের সইও দরকার। সুজন সেই ফর্ম কামালগাজির ‘ইচ্ছে’ আশ্রমে গিয়ে দুর্জয়ের সই করিয়ে আনেন। সেই ফর্ম আসার পরে অনুমতিপত্র তৈরি হয়।

এর পরেই ফের নমিতাদেবীরা যান শিশুকল্যাণ সমিতির দফতরে। তিনি পৌঁছনোর কিছু ক্ষণ পরে দুর্জয়কে নিয়ে সেখানে পৌঁছন ‘ইচ্ছে’ আশ্রমের সম্পাদক পার্থসারথি মিত্র-সহ এক দল কর্তা।

শিশুকল্যাণ সমিতির সদস্যদের সামনে দুর্জয় ও তার মাকে হাজির করানোর পরেই সমিতির সদস্যরা জানান, বিদেশি শিশুকে ফিরিয়ে দিতে গেলে সমাজকল্যাণ দফতর ও স্বরাষ্ট্র দফতরের নির্দেশ দরকার। দুর্জয়ের ক্ষেত্রে তা মেলেনি। বিষয়টি আনন্দবাজারের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিকদের কানে পৌঁছয়। সমাজকল্যাণ দফতর সূত্রের খবর, এর পরেই ‘জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট’-এর বিশেষ ধারা মেনে সমিতির কাছে দুর্জয়কে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়। তার পরেই সমিতি দুর্জয়কে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেয়। এ দিন সন্ধ্যায় দুর্জয় যখন মায়ের হাত ধরে বেরোচ্ছে, তখন চোখ ছলছল করছে ‘ইচ্ছে’ আশ্রমের কর্তাদেরও।

তা দেখে ছেলেকে নমিতাদেবী বলেন, ‘‘ওঁদের প্রণাম কর। ওঁরা ছিলেন বলেই তো তোকে ফিরে পেলাম।’’

আজ, স্বাধীনতা দিবসের সকালেই ছেলের হাত ধরে এ-পার বাংলার সীমান্ত পেরিয়ে ও-পারে ফিরবেন নমিতাদেবী। যশোরের বাড়িতে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন বাবা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement