ফিকি-র বৈঠকে অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। রয়েছেন হর্ষ নেওটিয়া (বাঁ দিক থেকে তৃতীয়) ও বণিকসভাটির প্রেসিডেন্ট জ্যোৎস্না সুরি। বুধবার। — নিজস্ব চিত্র
শিল্পের সমস্যা নিয়ে শিল্পমহল কোনও পরামর্শ দিলে তা নিয়ে রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব বণিকসভাকে সঁপে দিয়েই দায় এড়াতে চায় রাজ্য সরকার। এমনকী শিল্পপতিরা কোনও প্রশ্ন করলেও তার উত্তর খোঁজার ‘হোমওয়ার্ক’ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রশ্নকর্তাকেই। কলকাতায় অনুষ্ঠিত পর পর দু’টি জাতীয় স্তরের বণিকসভা সিআইআই ও ফিকি-র বৈঠকে অংশগ্রহণকারী শিল্পপতিদের দাবি, পরামর্শ দেওয়ার অর্থ রোডম্যাপ তৈরি করে দেওয়া নয়। সেই পরামর্শ কোন পথে কার্যকর করা যাবে, তা রাজ্য সরকারকেই ঠিক করতে হবে।
বুধবার কলকাতায় একটি পাঁচতারা হোটেলে ফিকির জাতীয় কাউন্সিলের বৈঠক বসে। গত বছর এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকলেও এ বছর মুখ্য বক্তা ছিলেন অর্থ তথা শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্র। শিল্পের জন্য জমি কেনা-বেচার পোর্টাল থেকে শুরু করে বন্ধ কারখানার জমি বণ্টন— অধিকাংশ বিষয়ে শিল্পমহলের পরামর্শ শিল্পমহলকেই ‘হোমওয়ার্ক’ হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছেন অমিতবাবু। তিনি ফিকির সদস্যদেরই বলেন রিপোর্ট তৈরি করে সরকারের কাছে দিতে।
এক মাস আগে শিল্পমহলকে ঠিক একই দাওয়াই দিয়ে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত মাসে বণিকসভা সিআইআই-এর জাতীয় পর্ষদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে শিল্পমহলের তরফ থেকে বিদ্যুৎ মাসুল, পরিকাঠামো উন্নয়ন, সহজে ব্যবসা করার সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সভায় উপস্থিত আইটিসি কর্তা যোগী দেবেশ্বর, গোদরেজ কর্ণধার আদি গোদরেজ, পেপসিকো ইন্ডিয়ার প্রধান ডি শিবকুমার, বজাজ গোষ্ঠীর প্রধান রাহুল বজাজ বা কির্লোস্কারের সঞ্জয় কির্লোস্কার, টিআইএল প্রধান ও সিআইআই প্রেসিডেন্ট সুমিত মজুমদারের মতো শিল্পমহলের প্রভাবশালী প্রতিনিধিদের উল্লেখ করা সমস্যাগুলির সরাসরি কোনও সমাধান সূত্র দিতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রায় সব বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করার ‘হোমওয়ার্ক’ দিয়ে দেন সঞ্জীব গোয়েন্কাকে।
এ দিন নেত্রীর পথেই হেঁটেছেন অমিতবাবু। কেভেন্টার্স-এর কর্তা মহেন্দ্র জালান একটি জমি কেনা-বেচার পোর্টাল তৈরির পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘‘বহু ক্ষেত্রেই জমি বিক্রি করতে চাইলেও কৃষকরা তা করতে পারেন না। আবার শিল্পের জন্য সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনতে গিয়ে আটকে যায় শিল্প সংস্থারা। পোর্টালের মাধ্যমে এই কাজটা সহজেই হতে পারে।’’ এই পরামর্শকে স্বাগত জানিয়ে ফিকি-কেই অমিতবাবু বলেন রিপোর্ট তৈরি করতে। বিস্মিত বণিকমহলের দাবি, এই পরামর্শ বাস্তবায়িত করতে হলে সরকারকেই সক্রিয় হতে হবে। কারণ এর সঙ্গে আইনি দিকও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে রোডম্যাপও সরকারকেই তৈরি করতে হবে। এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফিকির প্রেসিডেন্ট জ্যোৎস্না সুরি, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হর্ষ নেওটিয়া, সিদ্ধার্থ বিড়লা-সহ বিভিন্ন শিল্পপতি।
এই রিপোর্ট তৈরি করার বিষয়টিকেও তেমন আমল দিতে চাইছেন না শিল্পমহলের অধিকাংশ প্রতিনিধি। এক শিল্পকর্তার দাবি, প্রথম বার কোনও বণিকসভায় যোগ দেওয়ার দিনই শিল্প সংক্রান্ত কোর কমিটি ও ‘রিলেশনশিপ ম্যানেজার’ নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর পরে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শিল্পের জন্য আলাদা আলাদা কমিটি। তৈরি হয়েছে বহু রিপোর্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই রিপোর্টের কোনও পরামর্শ সরকার বাস্তবায়ন করেনি।
গত চার বছর ধরে শিল্পমহলের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে কতটা কাজ হয়েছে, তা নিয়ে বিশেষ কিছু জানাননি অমিতবাবুও। বরং ফিকির বৈঠকে রাজ্যকে তুলে ধরতে তাঁর হাতিয়ার ছিল ই-গভর্নেন্স। এ কাজে রাজ্য কতটা এগিয়ে গিয়েছে, তারই তালিকা দেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ই-গভর্নেন্সে পুরস্কারও জিতে নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ।