‘পিছনে হঠো, তিস্তার জল বাড়তে পারে’

নতুন বছরের প্রথম রবিবার। ছুটির দিন। পাহাড়ের সেবক রেলসেতু থেকে কালীঝোরা সেতুর নীচে পর্যন্ত নদীর ধার ধরে কাতারে কাতারে মানুষ। বাস, ছোটো গাড়ি, পিকআপ ভ্যান কী নেই? কোথাও ছাতার নীচে পিকনিকের আমোদ প্রমোদ চলছে। কোথাও আবার সাউন্ড বক্সে বাজছে ‘দিলওয়ালে’ ছবির নাচের গান।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:২৮
Share:

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সামনে তিস্তার চরে পিকনিক।— নিজস্ব চিত্র।

নতুন বছরের প্রথম রবিবার। ছুটির দিন। পাহাড়ের সেবক রেলসেতু থেকে কালীঝোরা সেতুর নীচে পর্যন্ত নদীর ধার ধরে কাতারে কাতারে মানুষ। বাস, ছোটো গাড়ি, পিকআপ ভ্যান কী নেই? কোথাও ছাতার নীচে পিকনিকের আমোদ প্রমোদ চলছে। কোথাও আবার সাউন্ড বক্সে বাজছে ‘দিলওয়ালে’ ছবির নাচের গান। দুপুর তখন দেড়টা, হঠাৎ কালীঝোরা বাংলোর পিছনের দিকে থেকে নদীর দিকে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন বিজন বাহাদুর। কালীঝোরার তিস্তা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঢোকার মূল গেটের কর্মীদের একজন। নদীর চরে থাকা, লোকজনকে বলতে থাকলেন, হট যাও পিছে জলদি, ‘ড্যাম সে পানি নিকল সাকতা হ্যায়।’

Advertisement

হঠাৎ দুপুরে জল কেন?

কোচবিহারের মেখলিগঞ্জের উমেশ বর্মন দলবল নিয়ে বাসে পিকনিক করতে এসেছিলেন। এগিয়ে জানতে চাইতেই জবাব মিলল, ‘‘রম্ভি থেকে জল ছাড়া হতে পারে। সাইরেন বাজানো হবে।’’ প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বিকাল অবধি অবশ্য তিস্তার জল তেমন বাড়েনি। সন্ধ্যার মধ্যে প্রায় ৫০০ পিকনিক পার্টি নির্বিঘ্নেই বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু কালীঝোরা, বিরিক থেকে সেবক বাজার, সর্বত্র হোর্ডিং, বোর্ড, সাইরেন, মাইকিং-এর জেরে তটস্থ অবস্থা স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পিকনিক দলগুলির। যা বাড়তি মাত্রা দিয়েছে ওই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্ব থাকা এনএইচপিসি কতৃর্পক্ষের নোটিসও।

Advertisement

গত মাসের শেষে এনএইচপিসি জানিয়ে দিয়েছে, গত ২০ ডিসেম্বর থেকে প্রকল্পের দু’টি ইউনিটের অংশে কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দু’টিও শেষের মুখে। তিস্তার রম্ভি প্রকল্প থেকে কালীঝোরার জলাধারগুলি ভরা এবং খালি করার প্রক্রিয়া চলছে। এতে হঠাৎ তিস্তায় জল বেড়ে যাওয়া বা নামার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সাইরেন বাজতেই নদীর ধারে পিকনিক, মাছ ধরা, বোটিং, সুইমিং বা বাসন মাজা বন্ধ করে এলাকা ফাঁকা রাখতে হবে। ভেসে যাওয়ার ভয়ে গবাদি পশুদের নদীর দিকে পাঠানো যাবে না। বিরিক থেকে সেবক বাজার প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকায় এমন ভাবেই সাইরেনের দিকে কান পেতে রাখতে বলা হয়েছে। তবে কখন কখন জল ছাড়া হবে, তার কোনও সময়সীমা ঘোষণা না হওয়ায় বাসিন্দারা তো বটেই, পিকনিক পার্টিগুলির মধ্যে বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

ধূপগুড়ি থেকে এদিন পিকনিকে এসেছিলেন সুশীল রায় এবং তার বন্ধুরা। নোটিস বোর্ড দেখে বললেন, ‘‘সেবক কালীঝোরা প্রথমবার এলাম। সবাই নদীর চরে আনন্দ করছেন। কিন্তু এর মধ্যে জল বাড়ার আশঙ্কার কথা শুনলাম। ভয়ই লাগল। রান্না চলতে থাকলে জল বাড়লে তখন কী হবে?’’ তাঁর কথায়, ‘‘আগে জানলে তো আসতামই না। পিকনিকের মরসুমের পর হলেই তো হত।’’ এর মাঝে বিকাল ৩টা নাগাদ মিনিট খানেকের জন্য সাইরেন শুনে চমকে ওঠেন সেবক রেলসেতুর ধারে পিকনিক করতে বাগরাকোটের শেফালি তামাঙ্গ, রনি রাইরা। স্থানীয়রা বললেন, জল আসতে পারে। জল অবশ্য আসেনি। পরে খোঁজ নিয়ে রনিরা জানলেন, পরীক্ষামূলক ভাবে বাজানো হয়েছিল সাইরেন।

Advertisement

এনএইচপিসি সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে সেবক ফাঁড়ি, কালীঝোরা এলাকায় কয়েকটি সাইরেন বসানো হয়েছে। পুলিশকে আগাম সতর্ক বার্তা দিয়ে সাইরেন বাজানো হচ্ছে। ভোর ৪টা বা রাত আড়াইটে নানা সময়ে বেজে উঠছে সাইরেন। আগামী এক মাসের মধ্যে আরও অন্তত ১০টি এলাকায় সাইরেন বসানো হবে। পোস্টারিং, লিফলেট বিলিও করা হবে। সেবক ফাঁড়ির ডিউটি অফিসারের ঘরের মধ্যে বসানো হয়েছে একটি সাইরেনের স্যুইচ। কালীঝোরা-সেবকের দোকানি মনিমায়া লেপচা, ভবেন্দ্র গুরুঙ্গ বলেন, ‘‘আমরা গত এক দশকে জল বাড়া কমায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কয়েক বাজার আগে তো একবার সব ভেসে গিয়েছিল। এনএইচপিসির যন্ত্রপাতিও ভাসে। পিকনিকে প্রচুর লোক আসে। আমরাও সবাইকে সতর্ক করি।’’

আতঙ্কের এখন কোনও কারণ নেই বলে জানাচ্ছেন এনএইচপিসি-র মুখপাত্র পান্ডু গাগরাই। তিনি বলেন, ‘‘কালীঝোরার প্রকল্প শেষের মুখে। রম্ভি থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে জলাধারে জল ছাড়া-ভরার কাজ হচ্ছে। তবে পুরাদমে তা চালু হয়নি। এলাকার বাসিন্দারা থেকে পিকনিক পার্টি সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সাইরেন, পোস্টারিং, নোটিস, মাইকিং করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি নাগাদ দু’টি ইউনিট চালু হতে পারে। এতে আগে থেকেই সবাইকে বিষয়টিতে অভ্যস্ত করা হচ্ছে।’’ ওই মুখপাত্র জানান, আতঙ্কের কারণ নেই। সাইরেন বাজার পর নদীর চরে না থাকলেই হল। ভরা পিকনিকের বিষয়টি তাঁদের মাথায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

কালীঝোরার তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নীম্ন প্রবাহে অবস্থিত। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রায় ১৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি আগামী জুলাই মাসে উদ্বোধন হওয়ার কথা। চারটি পাওয়ার স্টেশনের মধ্যে দু’টি পরীক্ষামূলক ভাবে কাজ শুরুও করেছে। বাকি দু’টি স্টেশনের কাজ শেষের মুখে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement