বছরের পর বছর তাঁরা বাবা-ছেলেকে পেঁয়াজ বিক্রি করে গিয়েছেন স্রেফ বিশ্বাসে ভর করে। তার পরে টাকা না পেয়ে মাথায় হাত পোস্তা বাজারের ব্যবসায়ীদের!
বাবা খোকন দাস আগেই শ্রীঘরে গিয়েছেন। এ বার গ্রেফতার হলেন ছেলে প্রসেনজিৎ। দু’জনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ। এ রাজ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার পোস্তায় পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের থেকে কয়েক কোটি টাকার পেঁয়াজ কিনে তা বেমালুম আত্মসাৎ করা। ধৃতদের বাড়ি হাবরা থানার বাণীপুরে। বুধবার রাতে হাবরা থানার পুলিশ প্রসেনজিৎকে বাড়ি থেকেই ধরে। বয়স সাতাশ বছর। ধৃতকে বৃহস্পতিবার বারাসত জেলা আদালতে হাজির করানো হলে তাঁর চার দিনের পুলিশি হেফাজত হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বিচারকের কাছে ওই যুবককে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরুণ হালদার বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশে প্রসেনজিৎকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।’’
পোস্তা থেকে কোটি কোটি টাকার পেঁয়াজ কিনে বাংলাদেশে রফতানির বড় কারবার আছে বছর পঁয়ষট্টির ধৃত খোকনবাবুর। ২৫-৩০ বছরের মস্ত কারবার। সেই ব্যবসা প্রসেনজিৎও দেখাশোনা করেন। তদন্তে পুলিশ জেনেছে, দৈনিক পেঁয়াজ কেনা বাবদ পোস্তার ব্যবসায়ীদের বাবা-ছেলে কোনও কোনও দিন ১০ কোটিরও বেশি টাকা পেমেন্ট করেছেন! এ হেন খোকন-প্রসেনজিৎ পোস্তার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কেনার নামে ৩৬ কোটি প্রতারণা করেছেন বলে পুলিশের দাবি।
কী ভাবে ধরা পড়লেন দু’জন?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অজয় বন্দ্যোপাধ্যায় নামে পোস্তার প্রতারিত এক ব্যবসায়ী সিবিআই-এর কাছে কিছু দিন আগে অভিযোগ করেন খোকনবাবুর নামে। তাঁর সম্পত্তি ক্রোক করার নির্দেশ দেয় আদালত। সিবিআই তা করতে গিয়ে বেজায় ফাঁপরে পড়ে। কারণ, ওই ব্যবসায়ী নিজের নামে সম্পত্তি খুব বেশি না রেখে আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের নামে রেখেছিলেন। এমনকী, বাণীপুরে বিরাট দোতলা বাড়িটিও খোকনবাবু বৌমার নামে করে দিয়েছেন। সিবিআই এই বাড়িটি নিলাম করতে এসেছিল। কিন্তু অন্যের নামে থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জেনেছে, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও সম্পত্তি কিনেছেন খোকনবাবু। সিবিআই শিলিগুড়ির কিছু জমি ক্রোক করতে পেরেছে।
আরও দুই প্রতারিত ব্যবসায়ী অজয় সাহা ও তাঁর ভাই প্রদীপ যথাক্রমে পোস্তা থানা ও বারাসত আদালতে বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। অজয়বাবুর অভিযোগের ভিত্তিতে কিছুদিন আগে পোস্তা থানা খোকনবাবুকে গ্রেফতার করে। তিনি আপাতত জেল হাজতে রয়েছেন। পুলিশের দাবি, জেরার মুখে খোকনবাবু জানিয়েছেন, টাকাপয়সা সংক্রান্ত লেনদেন করেন তাঁর ছেলে। টাকা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি নাকি কিছুই জানেন না! অজয় সাহা এ দিন দাবি করেন, ২০১০ সালে তাঁর কাছ থেকে ৬ কোটি ১১ লক্ষ টাকার পেঁয়াজ কিনে আর টাকা ফেরত দেননি খোকন-প্রসেনজিৎ। বারবার তাগাদা দিলেও ‘আজ দেব, কাল দেব’ করে কাটিয়ে গিয়েছেন। এমনকী, বাবা-ছেলেকে দিয়ে স্ট্যাম্প পেপারে সই করিয়ে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি নিয়েও লাভ হয়নি। অজয়বাবুর কথায়, ‘‘ওই টাকা ফেরত না পেয়ে আমার হালও খারাপ। যাঁদের কাছ থেকে পেঁয়াজ আনাই, তাঁদের টাকা ফেরত দিতে পারিনি। পোস্তায় দোকান পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’’ একই ভাবে প্রসেনজিতের কাছে তিনি ১৮ লক্ষ টাকা পান বলে দাবি প্রদীপবাবুর।
গত ৫ ডিসেম্বর বারাসত আদালত প্রসেনজিৎকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয় হাবরা থানাকে। পুলিশের দাবি, ধৃত প্রসেনজিৎ জেরায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁরা অন্তত ৩০ কোটি টাকা পান। তা পাওয়া না গেলে তাঁরা এখানে টাকা শোধ করতে পারছেন না। যদিও তাঁরা যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা পান, সে বিষয়ে কোনও নথিপত্র দেখাতে পারেননি। রফতানির সঙ্গে যুক্ত সীমান্তের অনেক ব্যবসায়ীই খোকন-প্রসেনজিতের কাণ্ড সম্পর্কে জানেন না। তাঁরা এই প্রতারণা সমর্থনও করছেন না। কিন্তু, জানাচ্ছেন, এ ধরনের কারবার যে হেতু পুরোটাই নগদে হয়, তাই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদেরও হাত-পা বাঁধা থাকে।
পুলিশ জেনেছে, প্রতারিত ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন বাবা-ছেলেকে পেঁয়াজ দিয়েছেন। তাঁরা প্রথম দিকে টাকা শোধ দিয়ে ব্যবসায়ীদের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছেন। পুলিশের আরও দাবি, পোস্তা ছাড়াও বর্ধমানের চাল বাজার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও বাবা-ছেলে আরও কয়েক কোটি টাকার প্রতারণা করেছেন। ওই ব্যবসায়ীরা সিবিআই ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অনেক প্রতারিত ব্যবসায়ী আবার টাকা ফেরতের আশায় এখনও অভিযোগ করেননি। সব মিলিয়ে পুলিশের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০০ কোটির প্রতারণা হয়েছে। পোস্তা থানার পুলিশ জানিয়েছে, হাবরা থানার তদন্ত শেষ হলে প্রসেনজিৎকে নিজেদের হেফাজতে নিতে আদালতে আর্জি জানানো হতে পারে।