মণ্ডপে পালা হবে, পুতুল চলল দিল্লি

দশটা হাত নেই। কিন্তু দু’হাতেই মেয়ে গড়ে চলেছে দু’কুড়ি পুতুল। উঠোনে তুলসী মঞ্চ। আশ্বিনের গরমে গা জোড়া ঘামাচি নিয়ে ছোট ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান করলে ওই তুলসী পাতা ছেঁচে রস লাগান বুল্টি মাঝি।

Advertisement

বিতান ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৫ ০৩:২৭
Share:

দশটা হাত নেই। কিন্তু দু’হাতেই মেয়ে গড়ে চলেছে দু’কুড়ি পুতুল।

Advertisement

উঠোনে তুলসী মঞ্চ। আশ্বিনের গরমে গা জোড়া ঘামাচি নিয়ে ছোট ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান করলে ওই তুলসী পাতা ছেঁচে রস লাগান বুল্টি মাঝি।

উঠোনের এক কোণে রান্নাঘর। মাটির উনুনে বসানো ভাতের হাঁড়িতে ফ্যান বগবগ। কিন্তু হুঁশ নেই বুল্টির। নতুন পালার তোড়জোড় চলছে। চোখ কোলের উপর ফেলা রঙ-বেরঙের কাপড়ে। আঙুলের ওঠাপড়ায় সূচ-সুতোর কেরামতি। কাগজের মণ্ডে সেই কাপড় চাপলে পুরোদস্তুর পুতুল।

Advertisement

বাঁকুড়ার ইন্দাস ব্লকের ফাদিলপুর গ্রাম থেকে দিল্লি করোলবাগ কত দূর জানা নেই বুল্টির। কোনও দিন দিল্লি যাননি। সেই কোন ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে এক বার দিঘা, আর বার কয়েক কলকাতা যাওয়া। বৃহস্পতিবার দিল্লির ট্রেনেই চেপে বসলেন। সঙ্গে পুতুলেরা।

পুতুল বানানোর স্বপ্নটা মাথায় বাসা বেঁধেছিল জেঠুর সঙ্গে পুতুল নাচ দেখতে গিয়ে। কিন্তু এ ভাবে যে সেই সুযোগ আসবে বুল্টি নিজেও ভাবেননি। মাস তিনেক আগে ইন্দাস ব্লকের কর্মহীন ছেলেমেয়েদের নিয়ে পুতুল নাটকের কর্মশালা হয়েছিল। বুল্টিদের মতো উৎসাহী বেশ কয়েক জন তাতে যোগ দেন। সমাজকল্যাণ দফতরের টাকায় নারী সুরক্ষা নিয়ে প্রচারে ‘সূচীর ঘর’ নামে একটি পালাও মঞ্চস্থ করেন এই শিক্ষানবিশ শিল্পীরা।

ক্রমে বুল্টিই পুতুল বানানোর কারিগর হয়ে দাঁড়ান। যে আগে কোনও দিন পুতুল বানায়নি, ১২ দিনের কর্মশালার পর তার তৈরি পুতুল নিয়েই পালার চিন্তা শুরু হয়। এ বার বুল্টির সেই সব পুতুল দিল্লি যাচ্ছে। এত দিন রাইপুর, পাত্রসায়র, রানিবাঁধে তাঁরা পালা দেখিয়েছেন। দলের নাম ‘সহজ পুতুল’। সবই সচেতনতামূলক পালা। গ্রামে-গ্রামে শৌচাগার, মেয়েদের অধিকার, নারী সুরক্ষা, সন্তানসম্ভবা মায়েদের যত্ন, এ রকম নানা বিষয়।

বুল্টির খুব ইচ্ছে, গ্রামের মেয়েদের নিয়ে একটা পুতুল নাটকের দল করে। নামও একটা ঠিক করে রেখেছে— ‘দুর্গা বাহিনী’। তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে এই দশভুজা নারীকেই বেশি পছন্দ তার। বুল্টির এক সহমর্মী সঙ্গীও আছে। নাম ছুটকি। সহজ পুতুলের দলে মেয়ে মাত্র ওঁরা দু’জন। ছুটকি এখনও স্কুলের ছাত্রী। কিন্তু পুতুল বানানো আর পালা করার নেশা তার মধ্যেও ঢুকে গিয়েছে। ছুটকি বলে, ‘‘বুল্টিদি নিজেই তো দুর্গা। ঘর-বর সব সামলে ১২ ঘণ্টা ধরে পুতুল বানায়। পালায় যখন ওই পুতুল নাচে অদ্ভূত ভাল লাগে।’’

তা বলে তাঁর গড়া পুতুল দিল্লিতে পালা করবে, বিশ্বাসই হয়নি বুল্টির। নিজেই বলেন, ‘‘রাজধানীর লোকজন দেখবে। তার থেকেও বড় কথা দুর্গা মণ্ডপে পালা হবে। এ কি সহজ কথা? পুতুলগুলো আগের চেয়েও আরও জীবন্ত করতে হবে!’’

পঞ্চমী থেকে নবমী পরপর দু’টো করে পালা। কিছু টাকা আসবে এ বার। বৃষ্টিতে ঘরের চাল বসে গিয়েছে। লম্ফর আলোয় এক টানা সেলাই করতে চোখ ব্যথা করে। বিদ্যুৎ আনতে কি অনেক খরচ? ছেলেটার পুজোর জামা একটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্কুলের সব বই কেনা হয়নি। পুতুলের গায়ে রংচঙে জামা পরাতে পরাতে এই সবই মাথার মধ্যে ঘুরেছে বুল্টির।

এ বারে ট্রেন ছুটেছে। এ বারে তার তাক লাগানোর পালা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement