সিঙ্গুর থেকে শালবনি যাত্রায় উড়ে এল ফুল

ব্যবধানটা মাত্র কয়েক কিলোমিটারের। তখন বেলা ৩টে। সিঙ্গুরের সাহানাপাড়া ছাড়িয়ে আলুর মোড় হয়ে বামেদের পদযাত্রা এগোচ্ছিল কামারকুণ্ডুর দিকে। রাস্তার দু’ধারে দড়ি হাতে পুলিশের কর্ডন। ভিতরে কয়েক হাজার দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছিলেন বিমান বসু, সুদর্শন রায়চৌধুরী, মনোজ ভট্টাচার্যেরা। আর বাইরে? লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সিঙ্গুরের সাধারণ মানুষ।

Advertisement

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:৪৮
Share:

ব্যবধানটা মাত্র কয়েক কিলোমিটারের।

Advertisement

তখন বেলা ৩টে। সিঙ্গুরের সাহানাপাড়া ছাড়িয়ে আলুর মোড় হয়ে বামেদের পদযাত্রা এগোচ্ছিল কামারকুণ্ডুর দিকে।

রাস্তার দু’ধারে দড়ি হাতে পুলিশের কর্ডন। ভিতরে কয়েক হাজার দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছিলেন বিমান বসু, সুদর্শন রায়চৌধুরী, মনোজ ভট্টাচার্যেরা। আর বাইরে? লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সিঙ্গুরের সাধারণ মানুষ। মাইকে ঘোষণা শুনে আশপাশের বাড়ির ছাদ, উঠোনেও ভিড় জমছিল। গত দশ বছরে বামেদের এত বড় মিছিল যে এ তল্লাটে দেখা যায়নি!

Advertisement

বাজেমিলিয়া থেকে পদযাত্রা কিছুটা এগোতেই আচমকা এক মহিলা-দর্শক ছুড়ে দিলেন গাঁদাফুলের পাপ়ড়ি। সঙ্গে প্রশ্ন, ‘‘বুদ্ধবাবু আছেন তো?’’ বুদ্ধবাবু মিছিলে ছিলেন না। ফুলের পাপড়ি গিয়ে পড়ল বাম কর্মী-সমর্থকদের গায়েই। পদযাত্রা রতনপুর ছাড়াতেই ফের উড়ে এল ফুল! এ দিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমানবাবু। কামারকুণ্ডুর আগে মহিলা-দর্শকদের কয়েক জন তাঁকে গোলাপ উপহার দেন। বিমানবাবু সেই গোলাপ তাঁর জওহর-কোটে লাগিয়ে নেন।

রাজ্যে বাম আমলের শেষ পাঁচ বছরও সিঙ্গুর ছিল তৃণমূলের দখলে। তার পর থেকে এখানে লাল পতাকা প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। সেখানে শনিবার দুপুরে এই ছবি! এক সিপিএম নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘এই ক’বছরে তাঁরা যে কিছুই পেলেন না, সেটা সিঙ্গুরের মানুষ ভালই বুঝেছেন। তাঁদের ভুল ভাঙছে। মিছিল দেখতেই কত লোক এসেছে দেখলেন না!’’

পদযাত্রার শুরুতে সভায় তৃণমূল সরকারকে তুলোধোনা করছিলেন সিটু-র রাজ্য সম্পাদক শ্যামল চক্রবর্তী। জমির ফসল বাঁচাতে চাষিদের কাকতাড়ুয়া লাগানোর উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, ‘‘এ রাজ্যে শিল্পতাড়ুয়া হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ শ্রোতাদের হাততালি আছড়ে পড়ল। সেই শ্রোতাদের ভিড়ে বহিষ্কৃত সিপিএম নেতা অনিল বসু থেকে গোঘাটের এক সময়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অভয় ঘোষ—

কে নেই! হাততালি আরও প্রবল হল যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের গলায় শোনা গেল সেই পুরনো সুর, ‘‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।’’

যে শিল্প স্থাপনের জন্য বুদ্ধবাবু দশ বছর আগে ওই কথা বলেছিলেন, সিঙ্গুরের সেই শিল্পক্ষেত্র এখন পরিত্যক্ত। রয়ে গিয়েছে শুধু টাটাদের নীল-সাদা কারখানার কাঠামোটাই (ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আঁকড়ে ধরলেন সেই নীল-সাদাই! কী আশ্চর্য সমাপতন!)। সেটাই দেখার জন্য উৎসুক হয়ে পড়েছিলেন হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর থেকে আসা এক মাঝবয়সী মহিলা। যে কারখানা হলে সিঙ্গুরের চেহারা কী ভাবে বদলে যেত, তা নিয়ে এ দিনও আলোচনা চলছিল বাম কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে।

এ দিন পদযাত্রায় সামিল হন বর্ধমান এবং দুই ২৪ পরগনারও বহু মানুষ। বুদ্ধবাবুর মিনিট কুড়ির বক্তৃতা শেষ হতেই শুরু হয় পদযাত্রা। কামারকুণ্ডু নতুন বাজারে পদযাত্রার শেষে একটি দোকানে দাঁড়িয়ে চায়ে গলা ভেজাচ্ছিলেন প্রাক্তন এক ব্যাঙ্ককর্মী। তাঁর পাশে দাঁড়ানো এক জন বলে ওঠেন, ‘‘মিছিলে সিঙ্গুরের মানুষ তো তেমন ছিলেন না!’’ শুনেই ওই প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী বলে উঠলেন, ‘‘কে বলেছে সিঙ্গুরের লোক নেই! আমিই তো সিঙ্গুরের লোক। সাড়ে ৬ কিলোমিটার পথ হাঁটলাম টানা।’’ সিপিএমের সিঙ্গুর জোনাল কমিটির সম্পাদক পাঁচকড়ি রায়েরও দাবি, ‘‘বেড়াবেড়ি, বাজেমিলিয়া, খাসেরভেড়ি থেকে প্রচুর মানুষ এসেছেন। কিছু অনিচ্ছুক চাষিও বক্তৃতা শুনতে এসেছিলেন।’’

চোখে পড়ার মতো পুলিশি নিরাপত্তায় পদযাত্রা শেষ হয়। হরিপালে দলীয় সদস্য রাজু হাজরাকে মারধর বা দলীয় কার্যালয়ের সামনে তৃণমূলের পতাকা টাঙানো ছাড়া শাসকদলের বিরুদ্ধে আর তেমন কোনও অভিযোগ তোলেনি সিপিএম। পুলিশের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দলের জেলা সম্পাদক সুদর্শন রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দিনে আমাদের কর্মসূচি সফল। নির্বাচন কমিশন আছে না!’’ তবে, কৃষি প্রতিমন্ত্রী তথা হরিপালের বিধায়ক বেচারাম মান্না বামেদের পদযাত্রাকে সফল মানতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, ‘‘বুদ্ধবাবু, বিমানবাবুরা হাঁটতে হাঁটতে হাঁফিয়ে যাবেন। ৫০ বছরেও তৃণমূলকে হঠানো যাবে না। গত ৫৬ মাসে রাজ্যবাসী যে উন্নয়ন দেখেছেন, তা বিঘ্নিত হোক, কেউ চাইবেন না।’’

কেউ চাইবেন, কি চাইবেন না তা আজ, রবিবার দেখা যাবে কামারকুণ্ডু থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত বামেদের দ্বিতীয় দিনের পদযাত্রায়। ভিড় কি প্রথম দিনকে ছাড়িয়ে যাবে, শুরু হয়ে গিয়েছে জল্পনা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement