হাল-বলদের বদল হাত-ট্রাক্টরে

হাল-বলদের মতো কষ্টকর বা সময়সাপেক্ষ নয়। আবার ট্রাক্টরের মতো ব্যয়বহুল নয়। দুইয়ের মাঝে দুই চাকার ছোট ট্রাক্টর—পাওয়ার টিলারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিন দিন। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে হাতে টানা ট্রাক্টরের।

Advertisement

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৫ অগস্ট ২০১৫ ০১:১৪
Share:

হাল-বলদের মতো কষ্টকর বা সময়সাপেক্ষ নয়। আবার ট্রাক্টরের মতো ব্যয়বহুল নয়। দুইয়ের মাঝে দুই চাকার ছোট ট্রাক্টর—পাওয়ার টিলারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিন দিন। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে হাতে টানা ট্রাক্টরের।

Advertisement

জনপ্রিয়তার কারণ ?

চাষিরা জানিয়েছেন, এক জোড়া বলদের বাজারদর ৪৫-৫০ হাজার টাকা। বলদ পুষতে খরচ আছে। পাশাপাশি শক্ত কাঠের লাঙল তৈরি করতে ১০-১২ হাজার টাকা লাগে। এ তো গেল খরচ। লাঙল দিয়ে চাষ করতে সময়ও অনেক বেশি লাগে। কালনার চাষি মহাদেব ঘোষ বলেন, ‘‘এক জন দক্ষ কৃষি শ্রমিক হাল-বলদ নিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিঘে খানেকের বেশি জমি তৈরি করতে পারেন না। অন্য দিকে, বড় ট্রাক্টর অনায়াসে এক দিনে ২০-২৫ বিঘে এবং হাতে টানা ট্রাক্টর সাত-আট বিঘা জমি তৈরি করে দিতে পারে।’’

Advertisement

আর একটা দিক আছে। কয়েক দশক আগেও যৌথ পরিবারই বেশি ছিল গ্রামাঞ্চলে। বড়-বড় গোয়ালঘরে বাঁধা থাকত বড় বলদ। এখন পরিবার ছোট। অধিকাংশ বাড়িতেই গোয়ালঘরের অস্তিত্ব নেই। কোথাও গোয়াল থাকলেও বাঁধা থাকে গাই-গরু। বলদ পুষতে চায় না কেউ।

আর অভাব খেতমজুরের। মেমারির চাষি সফিকুল শেখ বলেন, ‘‘টাকা দিয়েও খেতমজুর পাওয়া যায় না। রকম-সকম দেখে বছর চারেক হল একটা পাওয়ার টিলার কিনেছি। প্রথমে নিজের জমি তৈরি করে নিই। পরে এলাকার অন্য অনেকের জমি তৈরি করে দিয়ে রোজগার হয়। যা টাকা আসে তাতে চাষের খরচ উঠে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাঙ্ক ঋণের কিস্তি মেটানো যায়।’’ পাওয়ার টিলার কিনে অতিরিক্ত রোজগারের পথ খুলে যাওয়াটা জনপ্রিয়তার একটা দিক।

আবার হাল-বলদের বদলে পাওয়ার টিলারে জমি কর্ষণ করলে অনেক কম হাঁটতে হয়। এক একর জমি চষতে হাল-বলদে যেখানে ২০-২৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয়, সেখানে পাওয়ার টিলারে তা তিন থেকে চার কিমি মাত্র।

পাওয়ার টিলারের তিন কথা

দাম: ১ লক্ষ ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার

ভর্তুকি: ৬০ হাজার টাকা

শর্ত: জমির কাগজ ও কিসান ক্রেডিট কার্ডের ফোটোকপি নিয়ে আবেদন করতে হবে ব্লকে। আবেদন পাশ হলে কার্ডের অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি যাবে।

কিন্তু ট্রাক্টরে তো হাঁটতেও হয় না। বসে কাজ হয়ে যায়। তাহলে ট্রাক্টর ততটা জনপ্রিয় হচ্ছে না কেন?

চাষিরা জানালেন, ট্রাক্টরের দাম অনেক বেশি। প্রায় সাত-আট লক্ষ টাকা। সেখানে হাতে টানা ট্রাক্টরের দাম কমবেশি এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা। অত্যধিক ভারী হওয়ায় ভেজা মাটিতে ট্রাক্টর বসে গিয়ে সমস্যা হয়। হালকা পাওয়ার টিলারে যে সমস্যা হয় না। সবচেয়ে বড় কথা ছোট মাপের জমিতে বড় ট্রাক্টর চালানো কঠিন। পর্বতাঞ্চলে বা প্রত্যন্ত গ্রামের সরু রাস্তায় ট্রাক্টর নিয়ে যাতায়াত করা কঠিন হলেও পাওয়ার টিলারে সমস্যা হয় না। ট্রাক্টরের তুলনায় পাওয়ার টিলারের রক্ষণাবেক্ষণ সহজ, চালানোর পদ্ধতিও সরল।

কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৪-১৫ সালে রাজ্য সরকার চাষিদের বড় যন্ত্রাংশ কেনার জন্য জেলাগুলিকে ৪২ কোটি ৬৮ টাকা ভর্তুকি দেয়। এর মধ্যে বড় একটা অংশ ব্যয় হয়েছে পাওয়ার টিলারে। যেমন, বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমা ভর্তুকি হিসেবে এক কোটি পাঁচ লক্ষ টাকা পায়। এর মধ্যে বড় ট্রাক্টর কেনার জন্য ভর্তুকির টাকা দেওয়া হয় চার চাষিকে। অন্য দিকে হ্যান্ড ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার কেনার জন্য ভর্তুকির টাকা দেওয়া হয় ১২০ জন চাষিকে। বর্ধমান জেলার এক সহ-কৃষি অধিকর্তা নিলয় কর বলেন, ‘‘চাষিরা বুঝে গিয়েছেন হাতে টানা ট্রাক্টর থাকলে নিজের ইচ্ছা মতো জমি তৈরি করে চাষ করতে পারবেন। এতে জমি তৈরির খরচ কমছে। যা সময় বাঁচছে তা অন্য চাষে দেওয়া হচ্ছে বলে সামগ্রিক ভাবে কৃষিতে বৈচিত্র্য আসছে।’’

তবে প্রয়োজন থাকলেও অর্থাভাবে পাওয়াল টিলার কিনতে পারছেন না অনেক চাষি। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের একটা বড় অংশের হাতে সরকারি ভর্তুকির টাকা পৌঁছয় না। বহু চাষির হাতে এখনও কিসান ক্রেডিট কার্ড পৌঁছয়নি। আবার অনেকের কার্ড থাকলেও ভর্তুকি পাওয়ার পথটা জানা নেই। মেমারির চাষি যাদব সরকার বলেন, ‘‘বিঘে পাঁচেক জমি আছে। কার্ডও আছে। কিন্তু কী ভাবে ভর্তুকি মিলবে জানি না বলে হ্যান্ড ট্রাক্টর কেনা হয়ে ওঠেনি।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement