পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আবার সামরিক সংঘাতে ইসলামাবাদ এবং কাবুল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানের নঙ্গরহর এবং পকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমানহানার পর থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দু’দেশের বাহিনী। আর বৃহস্পতিবার রাত থেকে ২৬৭০ কিলোমিটার বিস্তৃত ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন এলাকায় কামান, মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার, সাঁজোয়া গাড়ির বহর নিয়ে কার্যত সম্মুখসমরে পাকিস্তান সেনা এবং আফগানিস্তানের শাসক তালিবানের বাহিনী।
বস্তুত, শুক্রবার সকালে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মহম্মদ আসিফ জানিয়েছেন আফগান সীমান্তে শুরু হওয়া সেনা অভিযান (যার পোশাকি নাম, ‘অপারেশন ঘজ়ব লিল হক’) আদতে তালিবানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ধৈর্য ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন সরাসরি যুদ্ধের সময়।’’ এই পরিস্থিতিতে উঠে আসছে যুযুধান দু’পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ। ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’ বলছে, প্রথাগত সামরিক শক্তিতে বিশ্বের ১৪তম রাষ্ট্র পাকিস্তান। অন্য দিকে, ১৪৫টি রাষ্ট্রের ওই তালিকায় তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের অবস্থান ১২১! কিন্তু যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সব সময় ‘নির্ণায়ক’ হতে পারে না। ইতিহাস বলছে, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা আমেরিকার মতো মহাশক্তিও আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে বারে বারে নাস্তানাবুদ হয়েছে।
সামরিক পর্যবেক্ষক এবং আমেরিকার বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান অরগুয়েন টফ্ট তাঁর ২০০৫ সালে লেখা বই ‘হাউ দ্য উইক উইন ওয়ারস: আ থিয়োরি অফ অ্যাসিমেট্রিক কনফ্লিক্ট’-এ ব্যাখ্যা করেছেন, কী ভাবে সামরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘অসম যুদ্ধে’ অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারে। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলাফল শুধু শক্তির উপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে দুই পক্ষের যুদ্ধকৌশল এবং অবস্থানগত সুবিধা-অসুবিধার উপর। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগান তালিবান এবং তাদের সহযোগী ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ বা টিটিপি (ইসলামাবাদ যাদের ‘ফিতনা আল- খোয়ারিজ়’ নামে চিহ্নিত করে)-র সাম্প্রতিক সংঘাত এই ‘অসম যুদ্ধে’র (অ্যাসিমেট্রিক কনফ্লিক্ট) এক আদর্শ উদাহরণ। যেখানে বার বার প্রবলতর প্রতিপক্ষের আকাশ এবং স্থলপথে হামলা ঠেকিয়ে দিচ্ছে দুর্বল পক্ষ।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই পাক ফৌজের কাঠামো গড়ে উঠেছে ভারতকে নিশানা করে। সেখানে যুদ্ধবিমানের মদতে সমতল ও মরুভূমিতে গোলন্দাজ (আর্টিলারি) ও ট্যাঙ্ক বাহিনীর ‘যান্ত্রিক যুদ্ধের’ (মেকানাইজ়ড ওয়ারফেয়ার) গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী দক্ষিণ হিন্দুকুশ এবং সুলেমান পর্বতের ১০ ফুটের দুর্গম গিরিশিরাগুলিতে পাক সেনার এই যুদ্ধকৌশল নিতান্তই অচল। এই পরিস্থিতিতে, পাক বাহিনীকে নির্ভর করতে হচ্ছে মার্কিন ‘এফ-১৬ ব্লক ৫১ প্লাস’ এবং চিনা ‘জেএফ-১৭ খান্ডার’ যুদ্ধবিমানের উপর। কিন্তু মার্কিন সামরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা (থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) র্যান্ড কর্পোরেশনের বিশেষজ্ঞ বেঞ্জামিন ল্যাম্বেথ তাঁর বই ‘এয়ার পাওয়ার এগেনস্ট টেরর’-এ আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ব্যর্থতার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্পষ্ট কথায় বলেছেন, ‘‘এমন প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থায় এ ধরনের আকাশ হামলা সফল হওয়া কঠিন।’’
পাক সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলির পাহাড়ে ‘ন্যাচারাল কেভ কমপ্লেক্স’ (প্রাকৃতিক গুহার সারি) বিমান হামলার বিরুদ্ধে কার্যত প্রাকৃতিক বাঙ্কারের কাজ করে। অতীতে সোভিয়েত আগ্রাসন এবং মার্কিন হামলার সময়ও ওই অবস্থানগত সুবিধার সদ্ব্যবহার করে সফল হয়েছে তালিবান। কখনওই আকাশ থেকে হামলা ‘গাইডেড বোমা’, ‘প্রিসিশন ক্ষেপণাস্ত্র’ ছুড়ে ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি দুই মহাশক্তি। তা ছাড়া ২০২১ সালের অগস্টে মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছাড়ার পরে বিপুল পরিমাণে আধুনিক অস্ত্র এসেছে তালিবানের হাতে। তার মধ্যে রয়েছে এম-১৭৭ কামান এম-২৪ স্নাইপার রাইফেল। হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতে ভৌগোলিক ভাবে উঁচু অবস্থানগুলি এখন তালিবান এবং টিটিপি বাহিনীর দখলে। সেখান থেকে হামলা চালিয়ে তারা পাক সেনার রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় আঘাত হানতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তাদের উৎখাত করতে হলে ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ শুরু করতে হবে পাক সেনাকে। যেখানে তাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সামরিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন।