মার্ক জ়ুকেরবার্গ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আমেরিকায় আবার ছাঁটাইয়ের খাঁড়া নেমে এল বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মীদের উপর। এপ্রিলের গোড়ায় একটি ইমেলে একলপ্তে কাজ হারিয়েছিলেন ওরাকলের ৩০ হাজার কর্মী। বুধবার মার্ক জ়ুকারবার্গের মেটা একসঙ্গে ছাঁটাই করল ৮,০০০ কর্মীকে। যাঁদের বড় অংশই এইচ১বি ভিসাপ্রাপ্ত বিদেশি। বৃহস্পতিবার জ়ুকারবার্গ তাঁর পদক্ষেপের সাফাই দিয়ে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘আমরা জানি এটি খুব কঠিন সিদ্ধান্ত।’’
আমেরিকার বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় গণছাঁটাইয়ের শিকারদের বড় অংশই এইচ১বি ভিসাধারী ভারতীয় নাগরিক। আশঙ্কা, কৃত্রিম মেধার (আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা এআই) ব্যবহারের কারণে আগামী দিনে আরও বড় সঙ্কট আসতে চলেছে। প্রকাশিত কয়েকটি খবরে দাবি, কৃত্রিম মেধা পরিকাঠামো এবং ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের কারণে খরচ কমাতে বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার বেশ কিছু পদ লুপ্ত হতে চলেছে। ওরাকলের বহু কর্মীর অভিযোগ, এ বিষয়ে আগে থেকে মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে কোনও আলোচনা বা ম্যানেজারের থেকে কোনও আভাস পাওয়া যায়নি। কিন্তু বহু কর্মীকে যে ছাঁটাই করা হবে তা আগেই জানিয়েছিলেন মেটা কর্তৃপক্ষ। ফেসবুকের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির বার্তা ছিল, কর্মদক্ষতা বাড়াতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জন্য বিপুল ব্যয়ের প্রভাব কমাতে ১০ শতাংশ কর্মী, অর্থাৎ প্রায় ৮,০০০ জনকে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে মেটা জানিয়েছিল, কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া ২০ মে থেকে কার্যকর হবে। হয়েছেও তাই। পাশাপাশি জানা গিয়েছে, সংস্থায় যে ৬,০০০ শূন্য পদে নিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল মেটা, তা-ও বর্তমানে স্থগিত রাখছে তারা। ছাঁটাইপর্বের পরে নির্দেশিকায় সংস্থার ‘চিফ পিপল অফিসার’ জ্যানেল গেল জানিয়েছেন, ৭,০০০ কর্মীকে নতুন এআই-ভিত্তিক দলে স্থানান্তরিত করা হবে। প্রায় ৬,০০০ শূন্যপদ বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প জুড়ে সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের ঢেউ শুধু চাকরির সুযোগই সঙ্কুচিত করছে না, এটি আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয় পেশাদারদের পুরোনো এক ভয়কেও আবার সামনে এনে দিয়েছে — চাকরি হারানো মানেই হয়তো দেশে থাকার অধিকারও হারানো।
আমেরিকায় অধিকাংশ ভারতীয় তথ্যাপ্রযুক্তি পেশাজীবী এইচ-১বি ভিসায় কাজ করেন, যা সরাসরি তাদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত। চাকরি চলে গেলে সময় গোনা শুরু হয়ে যায়। মার্কিন অভিবাসন নিয়ম অনুযায়ী, নতুন কোনও নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য সাধারণত তারা মাত্র ৬০ দিন সময় পান, যিনি তাদের ভিসার স্পনসর হবেন। ব্যর্থ হলে, তাদের দেশ ছাড়তে হয়। আর এখানেই রয়েছে বড় সমস্যার আশঙ্কা। আমেরিকায় কাজ করা বহু ভারতীয় বছরের পর বছর ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন। কারও সন্তান আমেরিকায় জন্মেছে। কেউ দীর্ঘমেয়াদে থাকার আশায় বাড়ি কিনেছেন। চাকরি হারানোর পরে আইনের গেরোয় সব কিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদন দাবি, ছাঁটাই হওয়া বহু ভারতীয় কর্মী এখন আমেরিকায় আরও কিছু দিন থাকার জন্য অস্থায়ী বিকল্প খুঁজছেন। তার মধ্যে একটি হল বি-২ ভিজ়িটর ভিসায় পরিবর্তন করা, যা নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার সময় কয়েক মাস অতিরিক্ত থাকার সুযোগ দিতে পারে।
মার্কিন সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) নিয়ম অনুযায়ী, ছাঁটাই হওয়া এইচ-১বি কর্মীরা সাধারণত ৬০ দিনের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ অথবা তাঁদের আই-৯৪ স্টেটাস শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় পান পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার জন্য। এই সময়ে তাঁরা নতুন স্পনসর খুঁজতে পারেন, অন্য ভিসা ক্যাটেগরির জন্য আবেদন করতে পারেন, অথবা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন। এই ৬০ দিনের সময়সীমা সাধারণত কর্মীর শেষ কর্মদিবস থেকে শুরু হয়, শেষ বেতন ব্যাঙ্কে জমা পড়ার দিন থেকে নয়। চলতি বছরেই সিলিকন ভ্যালির তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে এক লক্ষেও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। যাঁদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা বিপুল। সামগ্রিক ভাবে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পেই নিয়োগ কমে যাওয়ায় তাঁদের পক্ষে বিকল্প কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করা কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা বলছে, আমেরিকায় চাকরি হারানো প্রায় অর্ধেক ভারতীয় পেশাজীবী ভারতে ফিরে আসার কথা ভাবছেন। অন্যরা কানাডা ও ইউরোপকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন। যে ভারতীয়েরা আমেরিকায় এইচ-১বি ভিসার উপর নির্ভরশীল নন, তাঁদের পরিস্থিতি আলাদা। যাঁদের গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা রয়েছে, তাঁরা চাকরি হারালেও দেশে থাকতে পারবেন।