West Asia Conflict

যুদ্ধের এক মাস: প্রথম দিনেই খামেনেইকে খুন, তবু ইরানকে বাগে আনতে ট্রাম্প ব্যর্থ! এর মধ্যেই রণাঙ্গনে সক্রিয় হল হুতি

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা করার সময়ে ট্রাম্প কি ভেবেছিলেন এত দিন যুদ্ধ চলবে? অনেকের মতে, ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের হত্যা করে সরকার ফেলে দিতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব ছবি অনেকটাই ভিন্ন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ২৩:০৩
Share:

আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যৌথ হামলা ইরানে। — ফাইল চিত্র।

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইরানে হামলা চালিয়েছিল ইজ়রায়েল। পরে আমেরিকাও যোগ দেয় সেই সংঘাতে। তবে যৌথ হামলায় দমে যায়নি ইরান। পাল্টা হামলা শুরু করে তারা। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। এক মাস কেটে গিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা যেমন চলছে, তেমনই অব্যাহত বাগ্‌যুদ্ধও। হুঁশিয়ারি, পাল্টা হুঁশিয়ারি— সব মিলিয়ে তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। এক মাস পরে প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পরিকল্পনা’ কি সফল? না কি ইরানের ‘চাপে’ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন তিনি?

Advertisement

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা করার সময়ে ট্রাম্প কি ভেবেছিলেন এত দিন যুদ্ধ চলবে? অনেকের মতে, ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের হত্যা করে সরকার ফেলে দিতে পারবেন! সেই লক্ষ্যে আমেরিকা, ইজ়রায়েল লাগাতার যৌথ হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনই ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত। প্রথমে অস্বীকার করলেও দু’দিন পর ইরান খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।

শুধু খামেনেই নন, আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজ়িজ় নাসিরজ়াদেহ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সইদ আব্দুর রহিম মুসাভি-সহ বেশ কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে এই কয়েক দিনে। ট্রাম্প বার বার দাবি করছেন, ইরানের নেতাদের ‘হত্যার’ পর ভেঙে পড়েছে সে দেশের শাসনব্যবস্থা। তাদের অস্ত্রভান্ডার প্রায় ‘শেষ’। তাদের সেনাবাহিনী বিধ্বস্ত। তারা আর প্রত্যাঘাত করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা আলাদা।

Advertisement

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি, আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে ধাক্কা এবং তাদের সব সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু আমেরিকা বা ইজ়রায়েল— কেউই এখনও পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেনি। এই পর্যায়ে অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের আস্ফালনই সার। ইরানকে বাগে আনতে ব্যর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল যৌথ অভিযান শুরুর পর থেকেই হরমুজ় প্রণালী কার্যত ‘অবরুদ্ধ’ করে রেখেছে ইরান। তার ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে জ্বালানি সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল এবং গ্যাসের বড় অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। ইরানের ‘অবরোধের’ কারণে অনেক দেশের জাহাজই আটকে রয়েছে ওই প্রণালীতে। ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, যে ভাবেই হোক হরমুজ় ইরানের বাধামুক্ত হবে! এমনকি মার্কিন নৌবাহিনী পাঠিয়ে জাহাজ পাহারা দিয়ে পারাপারের কথাও বলেন ট্রাম্প। কিন্তু ভারত-সহ কয়েকটি দেশ ছাড়া আর কারও জাহাজ হরমুজ় পার করতে দিচ্ছে না ইরান। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, আমেরিকা বা ইজ়রায়েলের জন্য কোনও ‘ছাড়’ দিতে নারাজ তারা। শুধু এই দুই দেশ নয়, তাদের ‘বন্ধু’ দেশগুলির জন্যও যে একই পন্থা নেবে ইরান।

হরমুজ় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার জন্য ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি এ-ও জানান, যদি ইরান হরমুজ় খুলে না-দেয় তবে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলা চালানো হবে। যদিও সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানোর পরিকল্পনা সাময়িক স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করেন। প্রথমে পাঁচ দিন, পরে সেটা বাড়িয়ে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ-ও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

গত কয়েক দিনে ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আলোচনা চেয়েছিল। আর সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে রাজি হয়েছে আমেরিকা। তবে ইরান ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। তার মধ্যেই প্রকাশ্যে আসে ট্রাম্পের ১৫ দফা প্রস্তাবের কথা। জানা যায়, তিনি নাকি যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে ইরানও। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসেনি। কথা চালাচালি শুরু হয় পাকিস্তানের মাধ্যমে।

প্রস্তাব, পাল্টা প্রস্তাব নিয়ে দর কষাকষির মধ্যেও বন্ধ নেই আক্রমণ। আমেরিকা, ইজ়রায়েল যেমন ইরানে হামলা চালাচ্ছে, তেমন ইরানও পাল্টা আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াচ্ছে। শনিবার সকাল (ভারতীয় সময়) থেকেই পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বিমান হামলা চালাচ্ছে ইরান। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে পর পর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। কুয়েত বিমানবন্দরে নতুন করে ড্রোন হামলাও চালিয়েছে তেহরান। তার মধ্যেই রণাঙ্গণে ইরান সমর্থিত আরেক শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়েমেনের হুথি। অতীতে লেবাননের হিজ়বুল্লা, ইরাকের ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ) এবং আশাব আল-কাহ্‌ফের মতো গোষ্ঠীগুলি ইরানের সমর্থনে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শনিবার হুথি বাহিনীর মুখপাত্র, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিয়ো ফুটেজ প্রকাশ করেন। বিদ্রোহী বাহিনী নিজস্ব স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আল-মাসিরাহ তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’’

অন্য দিকে, আমেরিকার দাবি, ইরানের সঙ্গে সংঘাত মোটামুটি শেষের পথে। আর সপ্তাহখানেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে সংঘাত। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো দাবি করেছেন, আমেরিকার যা লক্ষ্য ছিল, তার অনেকটাই ইতিমধ্যে পূরণ হয়েছে। আমেরিকা যুদ্ধ শেষের কথা বললেও আদৌ কবে সংঘাতের অবসান ঘটবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে নানা মহলে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement