US Iran Peace Deal

যুদ্ধবিরতির আঁচ মিলতেই নীচে নামছে অশোধিত তেলের দাম! তবে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, হাল ফিরতে লাগবে বেশ কয়েক মাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজ়েম গরিবাবাদি যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যের বার্তা দেওয়ার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ১৯:৩০
Share:

ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ় প্রণালীতে আবার জাহাজ চলাচল শুরুর সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। সোমবার অশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অশোধিত তেলের পাশাপাশি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে, তবে সরবরাহ-শৃঙ্খলে আঘাত, পরিকাঠামোর বড় ক্ষতি এবং সীমিত মজুতের কারণে জ্বালানির বাজার আগামী কয়েক মাস ধরে অস্থির থাকতে পারে।

Advertisement

কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়ামে বড় ধরনের পতন ঘটিয়েছে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে এবং এলএনজি বেঞ্চমার্কের দামও কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের (অর্থাৎ, যে সব তেল এখন বিক্রি হবে কিন্তু সরবরাহ করা হবে ভবিষ্যতে কোনও এক সময়ে) দাম ৩.৫৮ ডলার বা ৪.১০ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩.৭৫ ডলারে নেমেছে সোমবার। একই সময়ে আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪.০১ ডলার বা ৪.৭২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮০.৮৭ ডলারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজ়েম গরিবাবাদি যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যের বার্তা দেওয়ার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে — এ কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা ক্রিসিল ইন্টেলিজেন্স-এর ডিরেক্টর সেহুল ভাট বলেন, “পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমার ইঙ্গিতের মধ্যে হরমুজ় প্রণালী পুনরায় খুলে যাওয়ার সম্ভাবনায় জ্বালানির বাজারে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর দিশা মিলেছে। অশোধিত তেলের দাম কমা, দেশীয় জ্বালানির দামের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি এবং আবগারি শুল্ক কমানোর ফলে অটোমোবাইল জ্বালানির ‘আন্ডার-রিকভারি’তে (আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজ়েল ও গ্যাস বিক্রি করলে তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলির যে আর্থিক ক্ষতি হয়) অনেকটাই ভারসাম্যে এসেছে।’’

Advertisement

সেহুল বলেন, “মার্চ–মে ২০২৬ সময়ে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসে মোট আন্ডার-রিকভারি আনুমানিক ১ লক্ষ কোটি টাকা। যদি ভারতীয় ক্রুড বাস্কেট প্রতি ব্যারেল ৯০ মার্কিন ডলারের নীচে থাকে, তবে আন্ডার-রিকভারি বর্তমান স্তর থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে না।’’ তিনি জানান, কম তেলের দাম মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে এবং ভারতের জ্বালানি আমদানির খরচ হ্রাস করতে সাহায্য করবে। তবে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাজার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যদিও তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নের দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি কমেছে, তবুও অশোধিত তেল এবং এলএনজি বাজার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লাগতে পারে।’’ এ ক্ষেত্রে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘স্বল্পমেয়াদি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখতে পারে।”

আর্থিক সক্ষমতা (ক্রেডিট রেটিং) যাচাইকারী এবং বিনিয়োগ তথ্য প্রদানকারী সংস্থা আইসিআরএ লিমিটেড-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কো-গ্রুপ হেড (কর্পোরেট রেটিংস) প্রশান্ত বশিষ্ঠ বলেন, ‘‘আমেরিকা–ইরান শান্তিচুক্তি তেল ও গ্যাসের দাম কমাবে, তবে যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে ফিরতে আরও অনেক সময় লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে অশোধিত তেলের দাম কমতে ছ’মাস থেকে এক বছর সময় নিতে পারে। কারণ পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় প্রতিদিন ১–১.১ কোটি ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় তেল পরিকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। সেগুলি মেরামতে সময় লাগবে।” তিনি জানান, ইরানি অশোধিত তেলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ভারতের জন্য উপকারী হবে, কারণ ভৌগোলিক নৈকট্য এবং ঐতিহাসিক ভাবে অনুকূল ক্রেডিট শর্ত নয়াদিল্লিকে দিয়ে থাকে তেহরান।

একুইরাস সিকিউরিটিজ়-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান মৌলিক পটেল বলেন, ‘‘চুক্তির ঘোষণার পরেপরেই ব্রেন্ট ৮২–৮৪ ডলারে নেমে আসে, কারণ বাজার ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। তবে এটি মূলত মনোভাব-নির্ভর পরিবর্তন, মৌলিক পুনর্মূল্যায়ন নয়।” সেই সঙ্গেই তাঁর দাবি, মজুত কমে যাওয়া এবং সরবরাহে বিঘ্নের কারণে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে (প্রায় ৬৫ ডলার প্রতি ব্যারেল) ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। পটেলের মতে, ‘‘স্বল্পমেয়াদে ক্রুড ৭৫–৮০ ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল হতে পারে এবং হরমুজ় প্রণালী পুরোপুরি খুললেও ৬০–৭০ ডলারের পরিসরে ফিরে আসা অনিশ্চিত।’’ তিনি জানান, চিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিক তেলের দামে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঙ্কটের সময় চিনের কৌশলগত মজুত ব্যবহার ও আমদানি কমানো তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে বাধা দিয়েছে, তবে ভবিষ্যতে চিনের ক্রয় আবার বাড়লে বাজার আবার অস্থির হতে পারে। এলএনজি দামও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমলেও তুলনামূলক ভাবে বেশিই থাকতে পারে। পটেলের মতে, এলএনজির দাম বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ১৭–১৮ ডলারের কাছাকাছি, যা ধীরে ধীরে কমলেও ২০২৬ সালে সংকট-পূর্ব ১০–১১ ডলারে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement