CO-POWERED BY
Back to
Advertisment

উৎসবের গ্যালারি

Durga Puja 2021: কারও মতে সাত, কারও মতে আট, কোথাও মাতৃকার হাজার হাত, কোথাও শত চোখ!

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৬:১১
নৃতাত্বিকরা বলেন দেবীশক্তি বা মাতৃকাশক্তির উপাসনা যে কোনও সভ্যতারই আদিমতম সংস্কৃতিতে বিরাজ করত। হিন্দু বাঙালির ‘ঘরের মেয়ে’ দুর্গাও এমনই আদিম মাতৃকাশক্তি। হিন্দু শাস্ত্রে এই দেবীদের বিভিন্ন দেবতার ‘শক্তি’ বলে মনে করা হয়। কল্পনা করা হয়, দেবীশক্তির উপাসনার মাধ্যমেই দেবতার কাছে পৌঁছনো সম্ভব। সে হিসেবে দেখলে, দুর্গার উপাসনা আসলে শিবত্ব লাভেরই সাধনা।

ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে মহাভারত পর্যন্ত বর্ণনা করে মাতৃকাদের কাহিনি। কোথাও মাতৃকাদের সংখ্যা সাত, কোথাও বা আট। তবে সাধারণত তন্ত্রশাস্ত্রে ‘অষ্টমাতৃকা’-র কথাই বলা হয়ে থাকে। মহেশ্বরী বা দুর্গা এই আট জনেরই এক জন।
Advertisement
বিভিন্ন পুরাণ এবং মহাভারত অনুসারে মাতৃকাদের আবির্ভাব ঘটেছিল বিভিন্ন অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য। সেই কারণে পঞ্চম শতকের নির্মিত বেশ কিছু মূর্তিতে তাঁদের স্কন্দ বা দেবসেনাপতি কার্তিকের সঙ্গে একত্রে দেখা যায়। কোথাও বা ধনপতি কুবেরের মূর্তিও স্থান পায় তাঁদের সঙ্গে। বোঝা যায় শুধু অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই নয়, মাতৃকারা যুক্ত হয়ে পড়েন সম্পদ বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও।

মহাভারত ছাড়া যে পুরাণগুলিতে মাতৃকাদের কথা বর্ণিত রয়েছে, তার মধ্যে ‘বরাহ পুরাণ’, ‘অগ্নি পুরাণ’, ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’ অন্যতম। এ ছাড়াও বিভিন্ন তন্ত্রগ্রন্থে অষ্টমাতৃকার বর্ণনা ও পূজাবিধি উল্লিখিত রয়েছে।
Advertisement
মাতৃকাদের মধ্যে সর্বপ্রথমেই রয়েছেন ব্রহ্মাণী। তিনি সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার শক্তি। তাঁর গাত্রবর্ণ হলুদ। ব্রহ্মার মতোই তাঁরও চারটি মাথা। কখনও তাঁকে চতুর্ভুজা, আবার কখনও ষড়ভুজা হিসেবে কল্পনা করা হয়। তাঁর হাতগুলিতে থাকে জপমালা, কমণ্ডলু, পদ্ম, ঘণ্টা, ত্রিশূল এবং বেদ। তাঁর বাহন হংস। কোনও কোনও মূর্তিতে তাঁকে পদ্মের উপরেও অধিষ্ঠান করতে দেখা যায়।

পরবর্তী মাতৃকা হলেন দেবী বৈষ্ণবী। তিনি স্থিতির দেবতা বিষ্ণুর শক্তি। বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের উপরেই তিনি অধিষ্ঠান করেন। তাঁরও চারটি বা ছ’টি হাত। তাঁর হাতে ধরা থাকে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, তির-ধনুক। কখনও তাঁর একটি হাত বরাভয় মুদ্রায় অবস্থান করে।

এর পরেই আসেন মহেশ্বরী বা দেবী দুর্গা। তাঁর এই রূপটি পরিচিত দুর্গা রূপের থেকে কিছুটা আলাদা। তিনি শিবের শক্তি। এই কারণে তাঁকে রুদ্রাণী বা শিবানী নামেও ডাকা হয়। তিনিও চতুর্ভুজা বা ষড়ভুজা। তাঁর বাহন নন্দী নামের ষাঁড়। মহেশ্বরীর গাত্রবর্ণ শ্বেত। তিনি ত্রিনেত্র বিশিষ্টা। তাঁর হাতে থাকে ত্রিশূল, ডমরু, অক্ষমালা, পানপাত্র, খর্পর (খুলি) অথবা কুঠার। তাঁর হাতে কখনও কখনও একটি সাপকেও দেখা যায়। তাঁর মাথায় অর্ধচন্দ্র শোভা পায়।

অষ্টমাতৃকার আর এক জন হলেন ইন্দ্রাণী। তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের শক্তি। তাঁকে ‘ঐন্দ্রী’-ও বলা হয়। তাঁর বাহন শ্বেত হস্তী। ইন্দ্রের মতোই তাঁরও সহস্র চক্ষু। তাঁর হাতের সংখ্যা কখনও দুই, কখনও চার, কখনও বা ছয়। তাঁর গাত্রবর্ণ কালো বা ধূসর। তাঁর হাতে থাকে, বজ্র, পাশ, পদ্ম।

দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র শক্তি কুমারী নামে পরিচিতা। তাঁর বাহন ময়ূর। কোথাও তাঁকে চার আবার কোথাও ১২ হাত যুক্তা দেখানো হয়। কখনও কখনও কার্তিকের মতো তাঁর ছ’টি মাথাও দেখা যায়।

বিষ্ণুর বরাহ অবতারের শক্তি ছিলেন দেবী বারাহী। এই দেবীর মস্তক বরাহের মতো। তাঁর হাতে শোভা পায় একটি দণ্ড, বজ্র, লাঙল, পানপাত্র অথবা তরবারি। কোথাও আবার তাঁকে ঘণ্টা, চক্র, ধনুক ও চামর ধরে থাকতেও দেখা যায়।

অষ্টমাতৃকার তালিকায় অন্যতমা হলেন চামুণ্ডী। তিনিও শিবের শক্তি। মহাদেবের ‘চামুণ্ড’ রূপের শক্তি হিসেবেই তাঁকে কল্পনা করা হয়। ‘দেবী মাহাত্ম্য’ গ্রন্থে তাঁকে কালীর সঙ্গে অভিন্ন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণা, মুণ্ডমালা বিভূষিতা। তাঁর হাতে থাকে ডমরু, ত্রিশূল, খড়্গ ও পানপাত্র। তাঁর বাহন শৃগাল। তিনি একটি শবের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন— এমনও দেখা যায়। তিনিও ত্রিনয়নী।

মাতৃকাদের মধ্যে সর্বশেষ হলেন নৃসিংহী। তিনি বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের শক্তি। তাঁকে ‘প্রত্যঙ্গিরা’-ও বলা হয়। তাঁর দেহ মানবীর এবং মুণ্ড সিংহীর।

কোনও কোনও মাতৃকা-তালিকায় চামুণ্ডাকে ধরা হয় না। সেই হিসেবে আবার মাতৃকাদের সংখ্যা সাত। কোথাও আবার নৃসিংহীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। নেপালে অষ্টম মাতৃকা হলেন মহালক্ষ্মী। ‘দেবী পুরাণ’-এ বিনায়কী নামের এক মাতৃকার কথা পাওয়া যায়। তিনি বিনায়ক বা গণেশের শক্তি।

‘দেবী মাহাত্ম্য’ অনুসারে শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের সময়ে ব্রহ্মা, শিব, কার্তিক, বিষ্ণু ও ইন্দ্রের দেহ নির্গত তেজ থেকেই এই সব মাতৃকার সৃষ্টি হয়। ‘দেবী ভাগবত’-এ আবার সপ্তমাতৃকার সঙ্গে আরও তিন মাতৃকার উল্লেখ রয়েছে।

মূর্তিতত্ত্ববিদদের অনুমান, বৌদ্ধ তন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে মাতৃকাদের উপাসনার সম্পর্ক রয়েছে। দেহবাদী তন্ত্রশাস্ত্র দেহের বিভিন্ন অংশে মাতৃকাদের অবস্থান কল্পনা করে। বর্ণমালার অক্ষরগুলির সঙ্গেও মাতৃকাদের যোগ রয়েছে বলে জানায় তন্ত্রশাস্ত্র। সেই সঙ্গে জানা যায়, মাতৃকাদের উপাসনাই মুক্তি বা মোক্ষ লাভের উপায়।