কালীর সঙ্গে থাকা ডাকিনী -যোগিনী আসলে কে?
মন্দাকিনী সরোবরে স্নান করতে নেমেছেন দেবী পার্বতী। সখীদের সঙ্গে জলকেলি করতে করতে কখন যে সময় পেরিয়ে গিয়েছে, তার হিসাব নেই। এক সময়ে জলকেলি করতে করতে ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় ক্লান্ত ও কাতর হয়ে পড়ল সখীরা।
দেবীর কাছে বারবার খাদ্যের অনুরোধ করতে লাগল তারা। পার্বতীও এ দিকে ক্ষুধায় গৌরী থেকে কৃষ্ণাঙ্গী হয়ে পড়েছেন। কিন্তু কৈলাস না পৌঁছনো অবধি এই বনভূমে খাদ্যের জোগাড় করা বড় মুশকিল। এদিকে এরাও তার সন্তান স্বরূপ। তিনি কী করে তাদের ক্ষুধার্ত রাখতে পারেন!
আর কে না জানে, ক্ষুধা অগ্নির ন্যায় ভীষণ। দাউদাউ করে জ্বলে উঠে জঠর থেকে মস্তিষ্ক অবধি জ্বালিয়ে দেয়। তাই তো ভীষণ ক্ষুধায় কাতর হয়ে জয়া-বিজয়ার মতো সুদর্শনা সখীরাও বিকট ‘ডাকিনী- বর্ণিনী’ রূপ পরিগ্রহণ করলেন।
অতএব নখের আঁচড়ে নিজ মুণ্ডছিন্ন করলেন পার্বতী। নিজের রক্তে তৃষ্ণা মেটালেন দুই সহচরীর। সেই সঙ্গে রক্তের একটি ধারা তৃষ্ণা মেটাল তাঁর কর্তিত মুণ্ডেরও।
শ্যামাপুজোয় প্রায়শই দেবীর দুই পাশে সহচরী বা আবরণ হিসাবে উপস্থিতি দেখা যায় ডাকিনী-যোগিনীর। সেখানে তাঁরা ভয়াল দর্শন। কিন্তু, দক্ষিণাকালিকার মাতৃকল্পে তাঁরা নেই। তাঁদের ভিত্তি সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক, দার্শনিক। কেবলমাত্র বিশেষ কিছু ধ্যানে তাঁদের উল্লেখ রয়েছে। তা হলে, এঁরা কারা?
আরও পড়ুন:
প্রথম ব্যাখ্যা দর্শন তত্ত্বে ডাকিনী-যোগিনী হল মাতৃসহ ত্রিগুণ অর্থাৎ স্বতঃ, রজঃ এবং তমঃ। রজঃ হল সেই গুণ, যা মানুষকে দিয়ে কর্ম করায়, তাকে কাজে প্রবৃত্ত করে। আর তমঃ হল জাগতিক সমস্ত অন্ধকার, অলসতা, ষড়রিপু যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। আর দেবী হলেন স্বতঃগুণ যিনি এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে মানুষকে সুস্থির রাখেন। অর্থাৎ, মানুষ যেমন এই দুই গুণের অধীন, এর থেকে বেরোতে পারে না, ঠিক তেমনই মাতৃনাম জপে নিজেকে একাগ্রতার দ্বারা সুস্থির রাখতে হবে।
সাধকের সাধক ত্রিকোণে ইরা, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না। ডাকিনী ও বর্ণিনী হলেন ইরা ও পিঙ্গলা আর দেবী হলেন খোদ সুষুম্না। এই সুষুম্নাকাণ্ড ধরেই মানুষের বোধ ক্রমশ উত্তরণের পথ আরোহণ করে। ষষ্ঠ চক্র আরোহণ করে মানুষের সাধনায় সিদ্ধি দেয়।
আর একটি প্রামাণ্য সূত্র বলে, ডাকিনী এসেছে ডাক থেকে। ডাকের অর্থ হল জ্ঞান। অর্থাৎ ডাকিনী বা ডাকসিদ্ধ জ্ঞানের অধিকারিণী; প্রাজ্ঞ। ( চর্যাপদ ব্যাখ্যা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী) যোগিনী হল যিনি যোগসিদ্ধা। যিনি মায়ের নিত্য সহচরী, শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের মুহূর্তে মায়ের সঙ্গে রণক্ষেত্রে তাঁরা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যোগ কথাটিই তো ‘চিত্তবৃত্তিনিরোধ’ অর্থাৎ চিত্তের চঞ্চল প্রবণতাগুলিকে সংযত করা। তাই যোগসিদ্ধাj অর্থ যিনি সাধনার দ্বারা আমির ঊর্ধ্বে উঠেছেন। (যোগদর্শন, পতঞ্জলি)
তা হলে দু’টি ব্যাখ্যাই পরস্পরকে সমর্থন করে — জ্ঞান এবং যোগ দ্বারা এক জন মানুষ সাধারণ মানুষ থেকে সিদ্ধ, জ্ঞানতপ্ত মানুষে পরিণত হন।
আরও পড়ুন:
তা হলে এই ভয়াল দর্শন ডাকিনী-বর্ণিনী / ডাকিনী-যোগিনী আদতে নিত্য জীবনের এক চরম দার্শনিক তত্ত্বের সন্ধান দেয়। যে চক্রে মানুষ নিত্য ঘুরে চলেছে। সেই সূক্ষ্ম ভাবটিই স্থূলরূপে মূর্তির পাশে কল্পনা করা হয়েছে। তথ্যসূত্র ~ কালিকাপুরাণ, কালীকথা- শিবশংকর ভারতী নবকল্লোল দীপান্বিতা অমাবস্যা সংখ্যা(১৪২৯)। জ্যোতিষার্ণব অরিজিত মজুমদার, সপ্তর্ষিনারায়ণ বিশ্বাস। ( এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ)।