বছর সাতেক আগে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে প্রথম বার চোখে পড়ার মতো করে ‘পদ্ম’ ফুটেছিল। ২০১৯ সালের সে লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলের পাঁচটি লোকসভা আসনের প্রত্যেকটিতে বিজেপি জয়ী হয়েছিল। কিন্তু সে সাফল্য দু’বছরও ধরে রাখতে পারেনি পদ্ম শিবির। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলে বিজেপি মুখ থুবড়ে পড়ে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনটি লোকসভা আসনও হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু পর পর দুই নির্বাচনে সাফল্য পাওয়া তৃণমূলও বুঝতে পারেনি জঙ্গলের হাওয়া কখন কোন দিকে বয়। তাই বিজেপি-কে ধরাশায়ী করার দু’বছরের মধ্যেই জঙ্গলমহল থেকে প্রায় সাফ হয়ে গেল ঘাসফুল। নেপথ্যে বিজেপির অভূতপূর্ব ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।
জঙ্গলমহলের আসনগুলি নিয়ে দু’পক্ষই নিজেদের মতো করে হিসাব কষেছিল। দু’পক্ষের কাছেই সে হিসাব পাঁচ বছর আগের চেয়ে কিছুটা আলাদা ছিল। কারণ, জঙ্গলমহলে ২০২১ সাল আর ২০২৬ সালের পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক সব পক্ষই টের পাচ্ছিল। আদিবাসী এবং কুড়মি, দুই সমাজকেই কাছে টানতে তৎপর ছিল বিজেপি। আর কুড়মি সংগঠনগুলিকে বিজেপি নিজেদের দিকে টেনেছে বুঝতে পেরে গোটা আদিবাসী সমাজকে নিজেদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে তৎপর ছিল তৃণমূল। কার হিসাব মিলবে, কার কোন তৎপরতা কতটা ফল দেবে, সে বিষয়ে আগে থেকে কোনও পক্ষই নিশ্চিত হতে পারেনি। ফলে লড়াই ছিল টানটান।
চারটি জেলার যে ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রকে ‘খাস’ জঙ্গলমহল হিসাবে ধরা হয়, সেগুলির মধ্যে ১০টিতেই ২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল। বিজেপি জিতেছিল মাত্র দু’টি আসনে। পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর এবং জয়পুর। তা বাদে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি, পশ্চিম মেদিনীপুরের বান্দোয়ান, শালবনি, বাঁকুড়ার রাইপুর, রানিবাঁধ, তালড্যাংরা আর ঝাড়গ্রাম জেলার ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর, বিনপুর, নয়াগ্রাম গিয়েছিল তৃণমূলের দখলে। এ বারের ভোটে বিজেপি আশাবাদী ছিল যে, নিজেদের হাতে থাকা দুই আসনের পাশাপাশি বাঘমুন্ডি, শালবনি, তালড্যাংরা, ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর, বিনপুর আসন তারা পাবে। অর্থাৎ, ‘খাস’ জঙ্গলমহলের ১২টি আসনের মধ্যে আটটিতেই বিজেপি জিতবে। তৃণমূল অবশ্য মনে করেছিল, ওই আসনগুলির অধিকাংশেই লড়াই তাদের জন্য ‘সহজ’। শালবনি, ঝাড়গ্রাম এবং গোপীবল্লভপুরে কিছুটা সমস্যা হতে পারে বলে তৃণমূলের নিজস্ব ধারণা ছিল।
আরও পড়ুন:
জঙ্গলমহলের জেলাগুলির রাজনীতিকরা অবশ্য জঙ্গলকে এই ১২টি আসনে ‘সীমাবদ্ধ’ করেন না। তাঁরা মনে করেন মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বিষ্ণুপুর লোকসভার অধীনে যে ৩৫টি বিধানসভা কেন্দ্র, সেগুলি সবক’টিই বৃহত্তর অর্থে জঙ্গলমহলের আসন। তার মধ্যে ১৫টি আসনে বিজেপি ২০২১ সালে জিতেছিল। ২০টি আসন গিয়েছিল তৃণমূলের দখলে। এ বারের নির্বাচনে প্রথম দফাতেই ওই অঞ্চলে ভোটগ্রহণ হয়ে যায়। তার পর থেকেই পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ তথা রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো দাবি করতে শুরু করেন, ৩৫টির মধ্যে ৩৩টি বিধানসভা আসনে এ বার বিজেপি জিতবে। অন্য বিজেপি নেতারা অতটা দাবি না-করলেও জঙ্গলমহল ছুঁয়ে থাকা পাঁচ লোকসভা কেন্দ্র থেকে অন্তত ৩০টি বিধানসভা আসন তুলে আনার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী ছিলেন। তৃণমূল তেমন কোনও দাবি করেনি। তাদের হিসাব ছিল, পুরুলিয়ায় আসন বাড়বে, ঝাড়গ্রামে কমবে। পশ্চিম মেদিনীপুরে আসন কমবে, বাঁকুড়ায় বাড়বে। সব মিলিয়ে জঙ্গলমহলের ছবিটা আগের বারের মতোই থাকবে।
বিজেপি যে শুধুমাত্র ২০২১ সালে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল, তা নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ওই পাঁচটি লোকসভা আসনে বিজেপির হাল আগের চেয়েও খারাপ হয়েছিল। ৩৫টির মধ্যে ২৪টি বিধানসভা আসনে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। বিজেপি এগিয়ে থাকতে পেরেছিল ১১টিতে। সেই ফলাফলের ঠিক দু’বছর পরের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এত ‘আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে উঠেছিল কিসের ভরসায়? বিজেপি নেতৃত্ব সে ‘ফর্মুলা’ ভেঙে বলছিলেন না। তবে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর উপরে ভর করেই যে বিজেপি ৩৫টির মধ্যে ৩০টির বেশি আসন পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, তা বিজেপি সূত্রেই জানা যাচ্ছে।
জঙ্গলমহলে কুড়মি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই দুই জনগোষ্ঠীর বৃহদংশের ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও কুড়মি এবং আদিবাসী সমাজে প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং ‘আদিবাসী কুড়মি সমাজ’ সংগঠনের নেতা অজিতপ্রসাদ মাহাতোর নির্দেশে একাধিক বার ঘেরাও হয়েছিল দিলীপ ঘোষের খড়্গপুর সদরের বাংলো। অজিত নিজে পুরুলিয়া আসনে নির্দল প্রার্থী হিসাবে ময়দানে নেমে পড়েন। লাখের কাছাকাছি ভোট টেনে বিজেপির জ্যোতির্ময়ের জয়ের ব্যবধান দু’লক্ষ থেকে নামিয়ে আনেন ১৭ হাজারে। আদিবাসী প্রধান ঝাড়গ্রাম লোকসভা আসনে বিজেপির হাল আরও খারাপ হয়। যে লোকসভা আসন ২০১৯ সালে বিজেপির দখলে গিয়েছিল, ২০২৪ সালে সেখানে সাতটি বিধানসভাতেই তৃণমূলের চেয়ে বিজেপি পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তী দু’বছরে জঙ্গলমহলের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলেছে বলে প্রচারপর্বে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল। সভা-মিছিলে জমায়েতের বহর হোক বা কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, সব ক্ষেত্রেই জঙ্গলমহলে বিজেপি-কে বেশি চনমনে দেখাচ্ছিল।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতি তৃণমূল ‘অপমানজনক’ আচরণ করেছে বলে অভিযোগ তুলে আদিবাসী সমাজে তৃণমূলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিল বিজেপি। লাগোয়া ঝাড়খন্ডের আদিবাসী নেতাদের ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়ায় নিয়ে এসে আদিবাসী এলাকায় নিবিড় প্রচারে জোর দেওয়া হয়েছিল। উল্টো দিকে তৃণমূলও ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে নিয়ে এসে ওই সব এলাকায় বিজেপি বিরোধী প্রচার তুঙ্গে তোলার চেষ্টা করেছিল।
কুড়মি সমাজকে কাছে টানার প্রশ্নে অবশ্য তৃণমূল কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। কুড়মিদের দু’টি প্রভাবশালী সংগঠনকে নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছিল বিজেপি। ‘পশ্চিমবঙ্গ কুড়মি সমাজ’-এর নেতা রাজেশ মাহাতোকে বিজেপি টিকিট দেয় গোপীবল্লভপুরে। ‘আদিবাসী কুড়মি সমাজ’-এর অজিতপ্রসাদের ছেলেকে টিকিট দেয় জয়পুরে। ফলে পুরো জঙ্গলমহল জুড়ে কুড়মি ভোটের বড় অংশ বিজেপির ঝুলিতে জমা পড়া সুনিশ্চিত বলেই বিজেপি মনে করেছিল।
ভোটের ফল বলছে, তৃণমূলের যাবতীয় চেষ্টা জঙ্গলে মুখ থুবড়ে পড়েছে এ বার। আর বিজেপি যে ঈষৎ নতুন রাজনীতি রাজ্যে আমদানি করেছে, সেই ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ জঙ্গলমহলের আসনগুলিতে দ্রুত খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময়ের দেওয়া পূর্বাভাস হুবহু মিলে গিয়েছে। পাঁচ লোকসভার ৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টিই বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে।