মেরেকেটে সাড়ে সাত মাস আগে তাঁর নাম ঘোষিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির ‘নির্বাচন প্রভারী’ হিসাবে। কালক্ষেপ না-করে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন তিনি। মুখ বুজে ঘুরতে শুরু করেছিলেন জেলায় জেলায়। কখনও কখনও এতটাই ‘মুখ বুজে’ যে, বিজেপির রাজ্য নেতারাও জানতে পারছিলেন না, ভূপেন্দ্র যাদব কবে, কখন, কোন জেলায় যাচ্ছেন। কাদের সঙ্গে দেখা করছেন।
ভোটের ফল প্রকাশিত হওয়ার পরে কৃতিত্ব দেওয়া-নেওয়ার পালা। প্রত্যাশিত ভাবেই ভূপেন্দ্রের অবদান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘নীরব’ জেলা সফরগুলির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে তিনি কতটা অভ্রান্ত চিনেছিলেন, তা নিয়েও কথা চলছে। ভূপেন্দ্র নিজে সম্ভবত সে সব শুনে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মুচকি হাসছেন। কারণ, রাজ্য বিজেপি-তে প্রায় কেউই জানেন না, বাঙালির গভীর তথা সুপ্রাচীন এক পরম্পরার সঙ্গে ভূপেন্দ্রের ‘যোগ’ কত দিনের।
রাজনৈতিক সূত্রে নয়। ভারতের বর্তমান পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক ‘যোগ’ সূত্রে। যোগ শিখতে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন তিনি। আরও নির্দিষ্ট ভাবে বললে ‘ক্রিয়াযোগ’ শিখতে। যোগাভ্যাসের ওই বিশেষ ধরনটিতে বাঙালির একটি সুপ্রাচীন পরম্পরা প্রসিদ্ধ। যোগগুরু শ্যামাচরণ লাহিড়ী (লাহিড়ী মশাই) সে পরম্পরার ‘পরমগুরু’ ছিলেন। ‘ক্রিয়াযোগ’ পরম্পরায় সে ঘরানা ভারতসেরা। সেই ‘যোগ’ শিখতে প্রথম বার পশ্চিম ভারত থেকে পুবে ছুটে আসা ভূপেন্দ্রের। দক্ষিণেশ্বরে প্রচারবিমুখ এক আশ্রমে পৌঁছে ‘যোগ’ শেখা। এবং সেই সূত্রে এ রাজ্যের তথা বাঙালির এমন কিছু সুপ্রাচীন পরম্পরার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, যা সম্পর্কে আজকালকার অধিকাংশ বাঙালিই পরিচিত নন।
এ ভাবেই পশ্চিমবঙ্গ চিনতে শুরু করেছিলেন ভূপেন্দ্র। জেলা চিনেছিলেন, রাজ্যের নানা আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য চিনেছিলেন, বাঙালি সমাজের বেশ কিছু অন্তঃসলিলা ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। সে অভিজ্ঞতা এ বারের ভোটে কি কাজে লেগেছে? ভূপেন্দ্রকে কোথাও তেমন কথা বড়াই করে বলতে শোনা যায়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সমাজ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোচনা সামান্য গভীরে গেলে ভূপেন্দ্র এমন নানা তথ্য অনায়াসে তুলে ধরতে শুরু করেন, বাঙালিয়ানার তথাকথিত ‘প্রবক্তা’রাও যা শুনে অবাক হয়ে যান।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটগণনার আগের সন্ধ্যায় নিউটাউনে এক আলাপচারিতার আসরে কথা উঠেছিল রাজ্যের তফসিলি সমাজকে নিয়ে, সে সমাজে চলতি রাজনৈতিক ঝোঁক নিয়ে। একঝাঁক বাঙালির ভিড়কে অবাক করে দিয়ে ভূপেন্দ্র প্রশ্ন করেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি সমাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় কোনটি?’’ কেউই এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তা বুঝে ভূপেন্দ্র নিজেই জানান যে, এ রাজ্যে তফসিলি সমাজে সবচেয়ে বড় অংশীদারিত্ব রাজবংশীদের। এ ছাড়া আর কোন কোন সম্প্রদায় তফসিলি সমাজের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে, পৌণ্ড্র সমাজ কতটা বড়, নস্কররা সংখ্যায় কত, নমঃশূদ্রেরা সংখ্যায় কত, চাঁই মণ্ডলরা সংখ্যায় কত— গড়গড় করে বলতে থাকেন ভারতের পরিবেশমন্ত্রী। ঠিক কোন কোন সামাজিক কারণে তাঁদের ‘তৃণমূল বিরোধিতা’ হওয়া ‘স্বাভাবিক’, ঘোষেরা কেন ‘তৃণমূল বিরোধী’, মাহিষ্য সমাজ কেন তৃণমূলের উপরে ‘ক্ষুব্ধ’, সে সব তথ্যও নিজের মতো করে তুলে ধরতে থাকেন। রাজস্থানের ভূপেন্দ্র মাত্র সাড়ে সাত মাস আগে থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াত শুরু করে এত কিছু কী ভাবে জানলেন! অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করতে শুরু করেন সে আসরে। আসলে গত সাড়ে সাত মাসে নয়, অনেক আগে থেকেই যে ভূপেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রেমে’, তা সেখানে কারও জানাই ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গের এই ভোট ছিল ভূপেন্দ্রের জন্য সপ্তদশ নির্বাচনী ‘প্রভার’। এর আগে ১৬টি রাজ্যের নির্বাচন সামলে এসেছেন তিনি। প্রতিটিতেই যে দলকে জিতিয়ে ফিরেছেন, সে কথা অবশ্য মৃদুভাষী ভূপেন্দ্র সগর্বেই বলেন। পশ্চিমবঙ্গে এসে সে সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনেকের সংশয় ছিল। সোমবার বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গ ভূপেন্দ্রের সুনামে দাগ লাগতে দেয়নি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে ভূপেন্দ্রের দায়িত্ব ঘোষিত হয়েছিল। রাজ্যে এসে প্রতিটি জেলায় ঘুরতে শুরু করেছিলেন তিনি। কোনও জনসভা বা দলীয় কর্মসূচির অঙ্গ হিসাবে কিন্তু নয়। একান্তেই সে সব সফর সারছিলেন ভূপেন্দ্র। একবার নয়, প্রতিটি জেলায় একাধিক বার। তার পরে নানা বৈঠকে, জনসভায়, সম্মেলনে আরও অনেক বার। ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে যে ধারণা ভূপেন্দ্রের আগে থেকেই ছিল, সাম্প্রতিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সে সব তাঁর কাজে এসেছে। ‘বরফের চেয়েও শীতল’ মস্তিষ্ক, স্থিতপ্রজ্ঞা, মৃদুভাষ, নিজেকে যতটা সম্ভব চোখের আড়ালে রাখা, সব রকমের মতামত শোনার ধৈর্য— এই সব বৈশিষ্ট্যই ভূপেন্দ্রকে সাফল্য এনে দিয়েছে বলে রাজ্য বিজেপির অনেকের মত।
‘মাথা ঠান্ডা’ বলে সকলকে বাবা-বাছা করে কাজ করে গিয়েছেন, তেমনও কিন্তু নয়। গত ১৪ মার্চ ব্রিগেড সমাবেশের পরে সন্ধ্যায় বিজেপির জেলা সভাপতিদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেছিলেন ভূপেন্দ্র, সুনীল বনসলরা। ব্রিগেড সমাবেশের ভিড় সন্তোষজক হওয়া সত্ত্বেও ভূপেন্দ্র পুরোপুরি খুশি ছিলেন না। ভিড় দ্বিগুণ হতে পারত বলে তিনি মনে করছিলেন। কেন তা হয়নি, সে কারণও খুঁজে বার করে ফেলেছিলেন। প্রকাশ্যে কোথাও কিছু বলেননি। কিন্তু সমাবেশের পরে হওয়া সেই ভার্চুয়াল বৈঠকে দলের জেলা সভাপতিদের তিনি এমন ‘দাওয়াই’ দেন যে, জেলা সভাপতিরা বুঝে যান ‘জারিজুরি’ ধরা পড়ে গিয়েছে। এমনই খবর বিজেপি সূত্রের।
‘পরিবর্তন যাত্রা’ বা ব্রিগেড সমাবেশের মতো কর্মসূচিগুলির ব্যবস্থাপনার উপরেও তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন ভূপেন্দ্র। কতটা তহবিল পাঠালে কতটা কাজে লাগে, সে সব বুঝে নিচ্ছিলেন। তহবিল কার হাতে পাঠালে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, সে সবও ছকে নিচ্ছিলেন। তাই ভোটের আগে তহবিল ব্যবস্থাপনার নতুন নীতি তৈরি করেছিলেন। একেবারে শক্তিকেন্দ্র বা বুথ স্তর পর্যন্ত যাতে তহবিল পৌঁছোয়, মাঝপথে কোথাও যাতে থেমে না-যায়, সে সব নিশ্চিত করছিলেন। ফলে প্রার্থী তালিকা নিয়ে ইতিউতি ক্ষোভের আঁচ ঘনিয়ে উঠলেও ভোটগ্রহণের অনেকটা আগেই সে সব নিবে যেতে শুরু করেছিল।
আরও পড়ুন:
প্রার্থী তালিকা নির্ধারণে এ বার বড় ভূমিকা ছিল ভূপেন্দ্রের। নতুন এবং পুরনোদের মধ্যে, নবীন এবং প্রবীণদের ভারসাম্য রেখে তালিকা তৈরি করিয়েছিলেন। সে প্রক্রিয়ায় প্রতিটি আসনের সামাজিক বিন্যাসের কথা মাথায় রেখেছিলেন। সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যেও যে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কথা ভাবা যেতে পারে, তা-ও বুঝে নিয়েছিলেন। উত্তরে অনন্ত মহারাজ এবং বংশীবদন বর্মণ একযোগে বিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। জঙ্গলমহলে জনজাতি এবং কুড়মি সমাজ একযোগে ‘তৃণমূল বিরোধী’ হয়ে উঠেছিল। তার ফলাফল উত্তরবঙ্গ, রাঢ়বঙ্গ, জঙ্গলমহলের ফলাফলে স্পষ্ট।
ভোট মিটেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদায় নেবেন ভূপেন্দ্ররা। সম্ভবত অষ্টাদশ ‘প্রভার’-এর দিকে এগোবেন। তবে লাহিড়ী মশাইয়ের পরম্পরার শিক্ষার্থীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের যোগসূত্র অনেক গভীর। তাই পূর্বতন ১৬টি নির্বাচনী দায়িত্বের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বকে একাসনে বসাচ্ছেন না ভূপেন্দ্র। ‘প্রভার’ শেষ। ফলে রাজ্যে তাঁর কাজও আপাতত শেষ। কিন্তু ভূপেন্দ্রের এই পশ্চিমবঙ্গ-অধ্যায় ছোটগল্প হয়েই থেকে যাবে। শেষ হয়েও শেষ হবে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত