২০১৬ সালে তিনি এই আসন থেকে জিতে প্রথম বার বিধায়ক হয়েছিলেন। ১০ বছর পর আবার সেই খড়্গপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রে লড়লেন। এবং জিতলেনও। সোমবার ভোটগণনার শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন ওই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। বেলা যত গড়িয়েছে প্রতি রাউন্ডেই জয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি করতে থাকেন তিনি। শেষপর্যন্ত ওই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকারকে ৩০ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে দিলেন দিলীপ।
সোমবার সকাল থেকেই জয়ের ব্যাপারে প্রত্যয়ী ছিলেন দিলীপ। সকালে তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষ যে ভাবে ভোট দিয়েছেন, পরিবর্তন নিশ্চিত।’’ এ-ও জানান, খড়্গপুরের মানুষের কাছে এক লক্ষ ভোটের ব্যবধানের দাবি রাখছি। তবে এত ভোটের ব্যবধান হয়নি ঠিকই। কিন্তু তাঁর করা ‘পরিবর্তনের’ ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেল দিনের শেষে। পশ্চিমবঙ্গে জিতল বিজেপি। আর খড়্গপুর সদরে দিলীপ।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম কান্ডারি কি দিলীপ ঘোষ? তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। তবে অনেকেই মনে করেন, দিলীপই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম সফল রাজ্য সভাপতি। তিনি নিজেও বার বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁর বাক্যবাণের ধার খুব। দিলীপের মতে, তাঁর মনে যা, মুখেও তা-ই। কখনও তিনি গরুর দুধে সোনা খুঁজে পেয়েছেন, আবার কখনও বিরোধীদের বুকে পা তুলে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন! বুদ্ধিজীবীদের ‘রগড়ে’ দিতে চেয়েছেন, আবার কখনও ‘দাওয়াই’ দেওয়ার কথাও শোনা গিয়েছে দিলীপের মুখে। তাঁকে এবং তাঁর মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। তবে তিনি ‘অদম্য’। এ ধরনের মন্তব্যের কারণে অনুতাপ হলেও দিলীপ মনে করেন, তাঁর বাক্যবাণ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রথ ছুটতে সাহায্য করেছে!
দিলীপের রাজনৈতিক জীবনের বয়স ১২। তাঁর রাজনীতিতে আসাও আকস্মিক। জীবন শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রচারক হিসাবে। সালটা ১৯৮৪। বছর কুড়ির দিলীপ আরএসএসের প্রচারক হিসাবে ছিলেন অনেক বেশি ‘পরিণত’। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতেন। সঙ্ঘের মতাদর্শ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ উপভোগ করতেন। ১৯৯৯ সালে দিলীপকে আন্দামানে পাঠায় আরএসএস। সেই দিলীপ কখনও রাজনীতিতে আসবেন, তা ভাবেননি অনেকেই।
২০১৪ সালে দিলীপকে সঙ্ঘ থেকে তুলে নিয়ে এসে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত করা হয়। সদ্য রাজনীতিতে আসা দিলীপকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। রাজনৈতিক জীবনে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমন ব্যর্থতাও এসেছে। বিজেপির অন্দরেই ‘কোণঠাসা’ হয়েছেন। আবার ফিনিক্স পাখির মতো জ্বলে উঠেছেন। নিজের গড় হারিয়েছেন, আবার সেই গড়ে ফিরেছেনও। তাঁর রাজনীতিতে আসা যেমন আচমকা, তেমনই হঠাৎ ৬০-এর গণ্ডি পেরিয়ে বিয়ে করে সকলকে চমকে দেওয়াও!
রাজনীতিতে আসার এক বছরের মধ্যে দিলীপকে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ। ২০১৬ সাল থেকে ভোটের ময়দানে খেলা শুরু করেন দিলীপ। বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হন খড়্গপুর সদরে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জ্ঞান সিংহ সোহনপালকে ৬,৩০৯ ভোটে হারিয়ে বিধায়ক হন। সে বছরের বিধানসভা ভোটে মাত্র তিনটি আসন জিতেছিল বিজেপি। দিলীপ ছাড়াও জিতেছিলেন মনোজ টিগ্গা এবং স্বাধীন সরকার।
আরও পড়ুন:
২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে দিলীপকে মেদিনীপুর আসন থেকে টিকিট দেয় বিজেপি। তৃণমূলের মানস ভুঁইয়াকে ৯০ হাজারের কাছাকাছি ভোটে হারিয়ে শুরু হয় তাঁর সংসদীয় রাজনীতির যাত্রা। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তাঁর নেতৃত্বে বাংলায় ১৮টি আসন জিতেছিল বিজেপি। ২০২১ সালের ভোটে দিলীপের নেতৃত্বেই বিধানসভা অভিযানে নামে বিজেপি। সে বছরই রাজ্যে ‘পালাবদলের’ হাওয়া ওঠে। তবে শেষপর্যন্ত বিজেপি-কে থামতে হয় ৭৭ আসনে। তার কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্য সভাপতি পদ খোয়ান দিলীপ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে আসন বদলায় দিলীপের। চেনাজানা মাঠ থেকে সরিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্রে। আসন বদলানোয় অসন্তোষ জন্মেছিল মনে। তা নিয়ে রাখঢাক করেননি। তবে দলের নির্দেশ মেনে মেদিনীপুর ছেড়ে ছুটেছিলেন বর্ধমান-দুর্গাপুরে। ভোটের আগে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। শেষপর্যন্ত সেখানে কাজ করেনি দিলীপ-জাদু। তৃণমূলের কীর্তি আজ়াদের কাছে এক লক্ষের বেশি ভোটে হারেন তিনি।
দিলীপকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হয়েছিল। তবে সে ভাবে আর ‘সক্রিয়’ দেখা যেত না তাঁকে। তখন দিলীপ বিজেপিতে থেকেও যেন ছিলেন না। দলীয় কর্মসূচিতে ডাক পড়ত না। নিজের উদ্যোগে ইতিউতি সভা, মিছিল, চা-চক্র করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু রাজ্য বিজেপির বড় কোনও কর্মসূচিতে তাঁর গরহাজিরা দিলীপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষলগ্ন থেকে আবার রাজনৈতিক ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে দিলীপের। তাঁকে ‘সসম্মানে’ ডেকে দলের মূলস্রোতে নিয়ে এসেছিলেন তখন নতুন রাজ্য সভাপতির দায়িত্বে আসা শমীক ভট্টাচার্য। ধীরে ধীরে বিজেপির অন্দরে ‘সক্রিয়তা’ বাড়তে থাকে দিলীপের। নানা কর্মসূচিতে আবার সামনের সারির আসন বরাদ্দ হতে থাকে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে নতুন করে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হয়ে ওঠেন দিলীপ। মাস তিনেকের ঝোড়ো ইনিংস আবার দিলীপকে এনে ফেলেছিল পুরনো মাঠে। সেই খড়্গপুর সদর। যে বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁর নির্বাচনী রাজনীতি শুরু হয়েছিল। আবার সেই কেন্দ্র থেকে জিতে বিধানসভার পথে দিলীপ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত