Advertisement

নবান্ন অভিযান

হুমায়ুন জিতে নিলেন নওদা, রেজিনগর দুই আসনই! বাবরি বিতর্ক, তৃণমূল থেকে বহিষ্কার, নতুন দল, এ বার কোন পথে?

সংখ্যালঘু ভোটাররাই যে হুমায়ুন কবীরের লক্ষ্য, সে কথাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন নিজেই। তিনি ‘ধর্মের রাজনীতি করছেন’ অভিযোগ করলে জবাব দিয়েছেন, ‘‘কেউ যদি হিন্দু-হিন্দু করে আমি তো মুসলমান-মুসলমান করবই।’’

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ১৮:৪৩
Humayun Kabir

নাটকীয় জয় হুমায়ুন কবীরের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দুইয়ে দুই করলেন হুমায়ুন কবীর!

কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি ঘুরে ফেলেছেন। এ বার আর দলবদল নয়, নিজে দল তৈরি করে তৃণমূল এবং বিজেপি, রাজ্যের যুযুধান দুই শিবিরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন মুর্শিদাবাদের হুমায়ুন কবীর। ভোটের মাস দুয়েক আগে গড়া আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)-র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রাম কেন্দ্রেও। দলের চেয়ারম্যান হুমায়ুন নিজে লড়েছিলেন মুর্শিদাবাদের দুই কেন্দ্রে— নওদা এবং রেজিনগর। ভবানীপুর, নন্দীগ্রামে হুমায়ুনের প্রার্থীরা দাঁত ফোটাতে না পারলেও ‘ক্যাপ্টেন’ নিজে জিতলেন দুই কেন্দ্রেই। নওদায় তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক সাহিনা মুমতাজ এবং রেজিনগরে আতাউর রহমানকে যথাক্রমে ২৭৯৪৩ এবং ৫৮৮৭৬ ভোটে পরাজিত করলেন তিনি।

বেলা গড়াতেই হুমায়ুনের অনুগামীরা আবির নিয়ে বার হলেন রাস্তায়। রাজ্য জুড়ে গেরুয়া ঝড়ের মধ্যে অমলিন কবীরের সাফল্য। উচ্ছ্বসিত অনুগামীরা স্লোগান তুললেন, ‘মুর্শিদাবাদের নবাব হুমায়ুন কবীর জিন্দাবাদ’।

হুমায়ুন মানেই চমক। হুমায়ুন মানেই বিতর্ক। বিগত কয়েক মাসে রাজ্য রাজনীতির আলোচিত চরিত্র ২০১১ সালে ছিলেন কংগ্রেসের বিধায়ক। ২০১৬ সালে তিনি নির্দল বিধায়ক। ২০২১ সালে তৃণমূলের এবং ২০২৬ সালে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির একমাত্র জয়ী প্রার্থী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভরতপুরের তৎকালীন বিধায়ক হুমায়ুনকে বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল। দলের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে বাবরি মসজিদ গড়বেন বলে ‘গোঁ’ ধরেছিলেন। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও বেলডাঙা এলাকায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ফেলেন তিনি। সেখান থেকেই জানিয়েছিলেন, এ বার তৃণমূলকে ‘শিক্ষা দিতে’ তাঁর নিজের দল ভোটে লড়বে। এমনকি, রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী স্থির করবেন তিনি-ই।

নিজেকে ‘একগুঁয়ে’ বলে থাকেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘আমি যেমন, আমি তেমন। নইলে সাইকেল দোকানি থেকে লরি ব্যবসায়ী কিংবা অধীর চৌধুরীর অনুগামী থেকে মন্ত্রী হওয়া হত না।’’ দল গড়েই রাজ্যের ২৯৪টি আসনে লড়াইয়ের কথা ঘোষণা করেছিলেন। তবে শেষমেশ দেড়শোর মতো আসনে প্রার্থী দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েক জন প্রার্থী আবার ভোটের আগেই তৃণমূল যোগ দেন। দলত্যাগী কেউ কেউ জানিয়েছেন, আর ভোটেও লড়বেন না। রাজনীতিও করবেন না। বিস্ময়কর ভাবে হুমায়ুন নিজেও ভোটের আগে বলতে পারেননি, ঠিক কত জন প্রার্থী তাঁর ‘বাঁশি’ (‘হুইস্‌ল’) চিহ্ন নিয়ে লড়াই করছেন! কমিশনের দেওয়া ভোটের ফলাফল বলছে ১৪৩টি আসনে লড়াই করেছিল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। তার মধ্যে জয়ী প্রার্থী একজনই— হুমায়ুন।

উল্লেখ্য, বেলডাঙায় মসজিদ গড়ার কাজ শুরু করলেও হুমায়ুন নিজে ভোটে লড়েছিলেন নওদা এবং রেজিনগর থেকে। বিধানসভা ভোটের আগে নওদায় বার বার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়েছিল। রাজনৈতিক ভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর লক্ষ্যে এগিয়েছেন তিনি। আবার সংখ্যালঘু ভোটাররাই যে তাঁর লক্ষ্য, সে কথাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন হুমায়ুন। তিনি ‘ধর্মের রাজনীতি করছেন’ অভিযোগ করলে জবাব দিয়েছেন, ‘‘কেউ যদি হিন্দু-হিন্দু করে আমি তো মুসলমান-মুসলমান করবই।’’

এ হেন হুমায়ুনকে ভোটের কয়েক দিন আগে অস্বস্তিতে ফেলেছিল একটি ‘স্টিং ভিডিয়ো’ (যার সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। তৃণমূলের থেকে আলাদা হওয়ার পরে হুমায়ুনের বাবরি মসজিদ কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তৃণমূলের মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কে হুমায়ুন ভাগ বসাতে পারেন, এমন তত্ত্বও যেমন শোনা গিয়েছে, তেমনই তাঁকে আড়াল থেকে বিজেপি সাহায্য করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে তৃণমূলের তরফে প্রকাশ করা ‘স্টিং ভিডিয়ো’-তে হুমায়ুনকে বলতে শোনা যায়, মুসলিমরা সাদাসিধে প্রকৃতির হন। তাঁদের বোকা বানানো সহজ। তাই বাবরি মসজিদের আবেগকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন তিনি। বিজেপি-র সঙ্গে হাজার কোটি টাকার ‘ডিল’ হয়েছে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারেও বলে আভাস দেন তিনি। এ বার হুমায়ুন কী দাবি তোলেন সেটাই দেখার।

গোড়াতে হুমায়ুন এবং বিজেপি ওই ভিডিয়ো এআই-এর (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কারসাজি বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে হুমায়ুন নিজেই বলেছিলেন, ‘আসল’ ভিডিয়ো আরও বড়— ৫১ মিনিটের। সেখান থেকে ১৯ মিনিটের ভিডিয়ো কেটে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োটি আসল। তাঁর অভিযোগ, ‘‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শিলিগুড়ি থেকে এক জনকে সন্ন্যাসী সাজিয়ে পাঠিয়েছিলেন। আর দিল্লির এক সাংবাদিককে পাঠানো হয়েছিল। দু’জনকেই সামনে এনে পুরো ভিডিয়ো প্রকাশ করব।’’ তবে স্টিং-কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর হুমায়ুনের জোটসঙ্গী আসাদউদ্দিন ওয়েইসির ‘অল ইন্ডিয়া মজলিস ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’ (এআইএমআইএম) বা ‘মিম’ তাঁর দলের সঙ্গে জোট ভাঙতে দেরি করেনি।

দুই বিধানসভায় জয়ের শংসাপত্র হাতে হুমায়ুন কবীর।

দুই বিধানসভায় জয়ের শংসাপত্র হাতে হুমায়ুন কবীর।

বাবরির পর স্টিং-বিতর্ক কাঁধে নিয়ে ‘একলা চলো’ বলে ভোট-যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন হুমায়ুন। প্রথম দফার ভোটে নওদায় তাঁকে মারকাটারি ভূমিকায় দেখা যায়। ভোটের আগের রাতেই নওদায় বোমাবাজি হয়েছিল। ভোটের দিন একটি বুথে হুমায়ুনকে দেখে ‘চোর-চোর’ স্লোগানও দিতে থাকেন তৃণমূলকর্মীরা। পাল্টা তেড়ে যান হুমায়ুন। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁদের সামলাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছিল। তার মধ্যে নওদার তৃণমূল প্রার্থী সাহিনা মুমতাজ অভিযোগ করেন, ‘আজকেও (২৩ এপ্রিল, ভোটের দিন) সিটি (হুমায়ুনের ঠোঁটে সবসময় দেখা গিয়েছে হুইস্‌ল) বাজাচ্ছে। আজ প্রচার করা যায়? কাল তো আমায় লক্ষ্য করেই বোমা মেরেছিল!’’ হুমায়ুন পাল্টা বলেছেন, ‘‘সিটি আমার সিম্বল। বাজাতেই পারি। সিটি বাজানোর অধিকার তো আমায় নির্বাচন কমিশনই দিয়েছে।’’

কেবল নওদাই নয়, হুমায়ুনের ‘সিটি’র আওয়াজ পাওয়া গেল রেজিনগরেও। সন্ধ্যায় জয়ের হাসি হেসে এজেইউপি-র প্রতিষ্ঠাতার মন্তব্য, ‘‘এই হাসি আমার একার নয়, এই হাসি রেজিনগর ও নওদার প্রতিটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের! ​আজ বহরমপুর গণনাকেন্দ্র থেকে রেজিনগর ও নওদা, দুই বিধানসভার বিজয়ী শংসাপত্র হাতে নিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে আসলাম।’’ হুমায়ুনের সংযোজন, ‘‘এই কাগজ কেবল এক টুকরো শংসাপত্র নয়, এটা গত কয়েক বছরের লড়াই, ত্যাগ আর আপনাদের অকৃত্রিম ভালবাসার দলিল। আমি বারবার বলেছি, মানুষের রায়ই শেষ কথা। আজ সেই জয়ের শংসাপত্র হাতে নিয়ে আমি এই ঐতিহাসিক জয় রেজিনগর এবং নওদার প্রতিটি সাধারণ মানুষের চরণে উৎসর্গ করলাম। আপনারা প্রমাণ করেছেন যে, ষড়যন্ত্র করে মানুষের হৃদয় থেকে হুমায়ুন কবীরকে মুছে ফেলা অসম্ভব।’’
​তবে এখন প্রশ্ন হুমায়ুন কোন দিকে যাবেন। কোন আসন ছাড়বেন এবং কাকে দেবেন।

সংক্ষেপে
  • প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
  • ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
Humayun Kabir TMC Murshidabad
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy