Advertisement

নবান্ন অভিযান

ভাঙড়ের গড় ধরে রাখলেন নওশাদ, ‘মাছচোর’ গান খ্যাত শওকতকে পাঠিয়েও জোড়াফুল ফোটাতে পারল না তৃণমূল

ভাঙড়ে ‘কাঁটা’ সরিয়ে ‘ফুল’ ফোটাতে এ বার সেখানে শওকত মোল্লাকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ক্যানিং পূর্ব থেকে সরিয়ে তাঁকে ভাঙড়ে পাঠানো হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। এ বারও ভাঙড় রইল নওশাদের হাতেই।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ২১:৪৭
নওশাদ সিদ্দিকি।

নওশাদ সিদ্দিকি। —ফাইল চিত্র।

ভাঙড়-গড় ধরে রাখলেন নওশাদ সিদ্দিকি। কমিশনের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা না-হলেও জানা গিয়েছে যে, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তথা তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লার চেয়ে প্রায় ৩১ হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি। অনেকটা পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বিজেপি প্রার্থী জয়ন্ত গায়েন। ভাঙড়ে ‘কাঁটা’ সরিয়ে ‘ফুল’ ফোটাতে এ বার সেখানে শওকত মোল্লাকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ক্যানিং পূর্ব থেকে সরিয়ে তাঁকে ভাঙড়ে পাঠানো হয়। শওকতকে নিয়ে আইএসএফ-এর বাঁধা গান ‘মাছচোর’ ইতিমধ্যেই ভাইরাল। তবে ওই গানের মতো ভোটের বাক্সে ঝড় তুলতে পারলেন না শওকত।

গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় নওশাদ ছিলেন ‘তৃতীয় স্বর’। ২০২১ সালে রাজ্যে মেরুকরণের ভোটে বিধানসভার আসনগুলি ভাগ হয়ে গিয়েছিল তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় আসনটি কোনও দলের ঝুলিতেই যায়নি। অনেককে চমকে দিয়ে এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-এর প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকি।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে আইএসএফ দলটির সূচনা করেছিলেন নওশাদের দাদা পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি। তবে ওই ভোটে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেননি। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও খুব বেশি সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি তাঁকে। এই অবস্থায় দলের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নেন নওশাদ। রাজনীতিতে আসার আগে চুটিয়ে ভলিবল খেলতেন ভাঙড়ের দীর্ঘদেহী বিধায়ক। জাতীয় স্তরেও খেলেছেন। কিন্তু দাদার ডাকে খেলার মাঠ ছেড়ে রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়তে হয় নওশাদকে।

নওশাদ রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিতি পাওয়ার আগেই বামেদের সঙ্গে আইএসএফ-এর জোটের বিষয়টি পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেইমতোই ২০২১ সালের ভোটে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্ত মোর্চার ছাতার তলায় লড়াই করে ভাঙড় আসন থেকে জয় পান নওশাদ। গত পাঁচ বছরে আসন বণ্টন-সহ বেশ কিছু বিষয়ে মতান্তর থাকলেও বামেদের সঙ্গে জোটকে শক্তিশালী করার বার্তা দিয়ে গিয়েছেন নওশাদ। দলের নামের সঙ্গে সাজুয্য রেখে নিজের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কথাও বার বার জানিয়েছেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় বরাবরই বোমাবাজি-মারামারির কারণে শিরোনামে থেকেছে। এ হেন ভাঙড়ে ২০২১ সালের ভোটে ২৬ হাজারেরও বেশি ভোটে জিতেছিলেন নওশাদ। হারিয়েছিলেন তৃণমূলের চিকিৎসক প্রার্থী রেজাউল করিমকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৩১টি আসনের মধ্যে সে বার ৩০টিতে জোড়াফুল ফুটলেও ‘কাঁটা’ রয়ে গিয়েছিল কেবল ভাঙড়ে। অনেকে অবশ্য মনে করেন, ভাঙড় বরাবরই একটু বেপরোয়া। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের জয়জয়কারের মধ্যেও এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের ‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলাম। ঘটনাচক্রে, সেই আরাবুল এখন নওশাদেরই দলের নেতা এবং প্রার্থী। আরাবুল অবশ্য জিততে পারেননি।

২০১১ সালে রাজ্যে ‘পরিবর্তনের ঝড়েও’ ভাঙড়ে জিতেছিলেন সিপিএমের বাদল জমাদার। ২০১৬ সালের ভোটে অবশ্য সেই আসন পুনরুদ্ধার করেছিল তৃণমূল। জয়ী হয়েছিলেন প্রাক্তন বাম মন্ত্রী, অধুনাপ্রয়াত রেজ্জাক মোল্লা। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে ভাঙড় বিধানসভায় তৃণমূল প্রায় ৪২ হাজার ভোটে এগিয়ে। সেই অঙ্ক মাথায় রাখলে এই নির্বাচন ছিল নওশাদের ‘গড়’ রক্ষার লড়াই।

রাজনীতির ময়দানে নেমেই বিধানসভায় জয় পাওয়া, একটি দলের সাংগঠনিক খুঁটিনাটির দিকে নজর রাখা— অনেকেই মনে করেছিলেন, বয়সে নবীন নওশাদ সেই গুরুদায়িত্ব দীর্ঘ সময় বইতে পারবেন না। কেউ কেউ এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ‘রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে’ রাজ্যের শাসক তৃণমূলে ভিড়ে যাবেন নওশাদ। বাস্তবে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একলা সেনানী হয়েই গত পাঁচ বছরে লড়ে গিয়েছেন তিনি। দু’বার গ্রেফতার হতে হয়েছে তাঁকে। গত বছর অগস্টে ওয়াকফ সংশোধনী আইন, ওবিসি সংরক্ষণ-সহ বেশ কিছু দাবিতে ধর্মতলায় বিক্ষোভ দেখিয়েছিল আইএসএফ। পুলিশের তরফে জানানো হয়, ওই কর্মসূচির জন্য আগাম অনুমতি নেওয়া ছিল না। ওই কর্মসূচি থেকেই নওশাদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তবে মামলাটি ব্যাঙ্কশাল আদালতে উঠলে গ্রেফতারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামিন পেয়েছিলেন নওশাদ।

তারও আগে ২০২৩ সালে ধর্মতলাতেই আইএসএফ-এর একটি কর্মসূচি ঘিরে ধুন্ধুমার বেধেছিল। সেই সময়ে নওশাদকে ৫৬ দিন জেল খাটতে হয়েছিল। একটার পর একটা মামলাও হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। জেল থেকে বেরিয়েও রাজনৈতিক লড়াই জারি রাখার কথা জানিয়েছিলেন নওশাদ। অনেকের মতে, লড়াই সত্যিই জারি রেখেছিলেন নওশাদ। পরিষদীয় এবং সাংগঠনিক শক্তির নিরিখে দক্ষিণ ২৪ পরগনা তৃণমূলের ‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসাবেই পরিচিত। সেই জেলার ভাঙড়ে প্রায়ই তৃণমূল বনাম আইএসএফ সংঘর্ষের খবর শোনা গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ‘নিশ্ছিদ্র’ ভোট-ব্যবস্থাপনাও সেই সংঘর্ষে পুরোপুরি লাগাম পরাতে পারেনি।

নওশাদ ফুরফুরা শরিফের পির জুলফিকার আলির সন্তান। রাজ্যের সংখ্যালঘুদের একাংশের কাছে হুগলির জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে অবস্থিত এই ধর্মস্থানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই পরিচয়ের জোরে এমনিতেই নওশাদ খানিক ‘ওজনদার’। তবে যুযুধান দুই শিবিরের কোনও একটিতে না-গিয়েও প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা নওশাদের নিজস্ব অর্জন বলেই মত ওই অংশের। মাঝে অবশ্য রটে গিয়েছিল নওশাদ তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। গত বছর মার্চ মাসে নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন নওশাদ। তার পরেই সেই জল্পনা জল-হাওয়া পায়। নওশাদ অবশ্য তখন জানিয়েছিলেন, ভাঙড়ের বিষয় নিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন তিনি।

ভোটের আগে হালকা ভাবে নেয়নি তৃণমূল। তাই শওকতকে সেখানে প্রার্থী করা হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে। নওশাদকে হালকা ভাবে নিতে পারেনি জোটসঙ্গী বামেরাও। বহু আলাপ-আলোচনার পর আসন সমঝোতা নিয়ে আইএসএফ-এর কার্যত সব দাবিই মেনে নেয় বামফ্রন্ট। রাজ্যের মোট ৩১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নওশাদের দল। গত বারের মতো এ বারেও ভাঙড় বাদে অন্য কোনও আসনে জয়ী হয়নি আইএসএফ। তবে ফের নিজের গড়রক্ষায় সফল নওশাদ।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
সর্বশেষ
১৮ মিনিট আগে
Naushad Siddiqui Bhangar Saokat Molla
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy