Advertisement

জলের বালতি হাতে তৈরি ভাইয়েরা

পড়াশুনোর জন্য ‘ভাই’য়েদের কখনও চাপ দেননি। এমনকী দুষ্টুমি করলেও আস্কারা দিয়ে বলেছেন, মাথায় অক্সিজেন কম যায়! কিন্তু পরীক্ষার সময় দিদি ভারী কড়া। সোমবার পরীক্ষার সেকেন্ড সেমেস্টার। তার আগে দিদি বলে দিয়েছেন একশোয় একশো চাই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০১৬ ০৪:৫৯
আজ তাঁর অগ্নিপরীক্ষা। রবিবার মঙ্গলকোটে শুভেন্দু অধিকারী। - নিজস্ব চিত্র

আজ তাঁর অগ্নিপরীক্ষা। রবিবার মঙ্গলকোটে শুভেন্দু অধিকারী। - নিজস্ব চিত্র

পড়াশুনোর জন্য ‘ভাই’য়েদের কখনও চাপ দেননি। এমনকী দুষ্টুমি করলেও আস্কারা দিয়ে বলেছেন, মাথায় অক্সিজেন কম যায়! কিন্তু পরীক্ষার সময় দিদি ভারী কড়া। সোমবার পরীক্ষার সেকেন্ড সেমেস্টার। তার আগে দিদি বলে দিয়েছেন একশোয় একশো চাই। ভাইয়েরা হাতজোড় করে বলেছেন, অতটা পারবেন না। তবে ৩১-এ অন্তত ২৫ তোলার চেষ্টা করবেন। কথা দিয়েছেন, ‘‘সব অ্যারেঞ্জমেন্ট রেডি আছে।’’

সোমবার বাঁকুড়ার ৯টি, বর্ধমানের ৯টি ও পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৩টি আসন মিলিয়ে ভোট হবে মোট ৩১টি আসনে। দলীয় সূত্রে খবর, এর মধ্যে ২৫টা আসন নিজেদের দখলে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তৃণমূল। শাসক দলের অন্দরে সকলেই জানেন, পশ্চিম মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-বর্ধমানে ভোট করানোর দায়িত্বটা এখন দাপুটে নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাঁধে। মুকুল রায়ের জায়গায় তিনিই এখন দিদির নতুন আস্থাভাজন। সুতরাং ৩১-এ ২৫ পাইয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জটা মূলত শুভেন্দুরই। তিনি কি উতরে দিতে পারবেন? দলীয় সূত্রটির একই উত্তর, ‘‘সব অ্যারেঞ্জমেন্ট রেডি আছে!’’ বালতি বালতি জল আর ভূতের দল!

লোকসভা ভোটের হিসেব দেখলে দেখা যাবে, এই ৩১টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে ছিল ২২টি। বাম-কংগ্রেসের ৫টি। বিজেপি-র ৪টি। সেই হিসেব টেবিলে ফেলে মেদিনীপুরের এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা জানালেন, আসন ভিত্তিতে ৫০ থেকে ৬০টি করে বুথ চিহ্নিত করে রাখা আছে। বুথের আশপাশে ভূতেরা রবিবার রাত থেকেই বালতি নিয়ে প্রস্তুত। শাসক দলের ওই নেতা এ-ও দাবি করেন— কতটা জল মেশানো গেল, বালতি গুনে সোমবার রাতেই তিনি বলে দিতে পারবেন, ৩১-এ ২৫ হল কি না!

অর্থাৎ? আনন্দবাজারের পূর্বাভাসে ভুল হয়নি। ভূতই ভবিষ্যৎ! যদিও
যে ১৮টি আসনে ৪ এপ্রিল ভোট হয়েছে, সেখানে আগের তুলনায় জল সামান্য কমেছে। আসনভিত্তিতে দেড় থেকে দু’শতাংশের মতো। কিন্তু বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু বুথকে আতসকাচের তলায় এনে দেখা গিয়েছে, সেখানে নব্বই শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। অর্থাৎ মৃত, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া বা ভোট দিতে না যাওয়া মানুষের ভোটটাও সেখানে দিয়ে এসেছে ভূতেরা।

দ্বিতীয় দফার আগের রাতে ভূতেদের সেই প্রস্তুতির গ্রাউন্ড রিপোর্ট ফের এসেছে আনন্দবাজারের কাছে। ভূতেরা মোটামুটি ভাবে তিন ভাবে খেলতে চাইছে। এক, যে বিলি না হওয়া ভোটার স্লিপগুলি হাতিয়ে নেওয়া। দুই, ভোটার লিস্টে ভুতুড়ে ভোট চিহ্নিত করে ভোট দিয়ে আসা। এবং তিন, আগের রাতেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া ও ভোটের দিন চিহ্নিত বিরোধী ভোটারদের ঘরে সিল করে দেওয়া। যেমন বিষ্ণুপুর বিধানসভা কেন্দ্রের রাজপুর মুসলিম পাড়ায় শনিবার রাতেই ধমক দিয়ে এসেছে শাসক দল। আবার সোনামুখী বিধানসভা কেন্দ্রের পাত্রসায়র থানার ধারিমপুর গ্রামে সিপিএমের নির্বাচনী এজেন্ট সাধন বাগদিকে রবিবার রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে তৃণমূলীরা। এমনকী বিরোধীদের বাড়ির হাঁস-মুরগি গায়েব করে, উঠোনের আম-পেঁপেগাছ কেটে দিয়েও উৎপাত শুরু হয়েছে। রবিবার মঙ্গলকোটের এক সভায় শুভেন্দু অধিকারীর পাশে দাঁড়িয়ে বোলপুরের সাংসদ অনুপম হাজরা স্পষ্ট হুমকির সুরে বলেছেন, ‘‘ভোট দিলে আমাদের দিন, নইলে অসুবিধায় পড়বেন।’’

সোমবার অতএব পরীক্ষা দিল্লির ওঝাদেরও। প্রথম দফার ভোটে ভূতের উৎপাত ওঝারা দেখেছেন। তা ছাড়া কতটা ভোট পড়েছে তার শতাংশের হিসাব নিয়ে ভুলভ্রা ন্তির বিষয়টিও সব স্তর থেকে ওঝাদের টেবিলে এনে ফেলা হয়েছে। কমিশন রবিবার জানায়, সোমবারের ভোটে আর কোনও বেচাল বরদাস্ত করবেন না তারা। তবু না আঁচানো পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চাইছেন না বিরোধীরা। বরং সূর্যকান্ত মিশ্র-অধীর চৌধুরীদের মনোভাব হল, ‘তুমি আছ না নেই’ তার প্রমাণ সোমবার দিতে হবে।

ঘটনা হল, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের যে সব কেন্দ্রে সোমবার ভোট হবে, ২০১১ সালে সেখানে ভাল ভোট পড়েছিল। সে বারের ভোট গ্রহণকে মোটামুটি ভাবে ত্রুটিমুক্ত ধরা হয়। কারণ, সে বার জ্যান্ত মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোট শতাংশ আসন ভিত্তিতে অনেকটাই কমে যায়। এমনকী যে পশ্চিম মেদিনীপুরেও দাঁতন, কেশিয়াড়ি, নারায়ণগড়, চন্দ্রকোণার মতো আসনে তিন থেকে চার শতাংশ ভোট কমেছিল। তিন শতাংশের মতো ভোট কম পড়েছিল বাঁকুড়ার শালতোড়া, বড়জোড়া, ইন্দাসে। সোনামুখীতে ভোট শতাংশ কমেছিল ৫ শতাংশ। দিদি-র এক প্রভাবশালী ভাই রবিবার স্বীকার করে নেন, ২০১১-র তুলনায় গত লোকসভা ভোটে এই আসনগুলিতে ভূতের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। যেমন কেশপুর বিধানসভার পাঁচ নম্বর বুথে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৭৯০টি, বামেরা পেয়েছিল ৬টি ভোট, বিজেপি ৩, কংগ্রেস শূন্য। আবার বাঁকুড়ার কোতুলপুর বিধানসভার ২০৩ নম্বর বুথে তৃণমূল পেয়েছিল ৭৮৯টি ভোট, বাম ২টি, কংগ্রেস শূন্য।

দিদির ভাইয়েরা সোমবার এই খেলাটাই ফের খেলতে চাইছেন। প্রশ্ন হল, তারা কি পারবেন আগের মতো খেলতে? বিরোধীদের মতে, কমিশন যে রকম আশ্বাস দিয়েছে, তাতে যদি মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং ভূতের উৎপাত আরও কিছুটা কমে তা হলে খেলা ঘুরতে বেশিক্ষণ নয়। ৩১টি আসনের মধ্যে ৯টি আসনে দিদির দিকে ভোটের অঙ্ক পাটিগণিতের হিসেবে দুর্বল। কিছু আসনে জোটের থেকে প্রান্তিক ভাবে এগিয়ে ছিল শাসক দল। তাই প্রথম দিনের থেকে জল আরও কমলে চিন্তা রয়েছে। ৩১-এ ২৫ তোলাটা তখন খুব সহজ হবে না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy