এক পক্ষের লড়াই বামের বাক্স থেকে ভোট টেনে এনে নিজেদের রেখচিত্র বাড়ানোর। অন্য পক্ষের লড়াই রামে চলে যাওয়া ভোটের যথাসম্ভব পুনরুদ্ধার। আর জি কর-কাণ্ডে নিহত তরুণী চিকিৎসকের পরিবারের সাম্প্রতিক ভূমিকা সেই লড়াইয়ে অন্য মাত্রা এনে দিচ্ছে।
সেই ২০২৪ সালের অগস্ট মাস থেকে চলে আসা প্রতিবাদ, আন্দোলনের নানা পথ পেরিয়ে এ বার বিধানসভা ভোটে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন আর জি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা। শুধু তা-ই নয়, ওই পরিবারের তরফে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়েও বেশি আক্রমণ শোনা গিয়েছে বামেদের বিরুদ্ধে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি হওয়া ইস্তক শমীক ভট্টাচার্য বাম সমর্থকদের প্রতি টানা আবেদন জানিয়ে চলেছেন, যে যার মতাদর্শগত অবস্থান বজায় রেখেও তৃণমূলের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে এ বার বিজেপিকে সমর্থন করুন সকলে। দলের প্রচার-ভিডিয়োয় বামেদের প্রতি আক্রমণ কমানোর জন্যও বিজেপিতে বার্তা দিয়েছেন রাজ্য সভাপতি শমীক। আক্রমণ ছেড়ে আবেদনের সেই কৌশল নির্যাতিতার বাবা-মায়ের বক্তব্যে ধাক্কা খেয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক শিবিরের বড় অংশ। এবং তাতে আখেরে নিজেদের সুবিধাই দেখছেন সিপিএম নেতৃত্ব।
আর জি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদী মুখ মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে উত্তরপাড়া ও কলতান দাশগুপ্তকে পানিহাটি থেকে প্রার্থী করেছে সিপিএম। তাঁদের মেয়ের নৃশংস মৃত্যুর ঘটনাকে সিপিএম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বলে সরব হয়েছেন নির্যাতিতার বাবা-মা। নিহত চিকিৎসকের শববাহী গাড়ি আটকে এবং তার পরে ‘রাতদখলে’র সময়ে আর জি কর হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনার পরে পুলিশের জেরার মুখে পড়েছিলেন মীনাক্ষী। আর জি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদে লালবাজারে বামেদের অবস্থান কর্মসূচির সময়ে কলতানকে গ্রেফতার হয়ে জেলে যেতে হয়েছিল ফোনে হিংসার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে। এ সবের পরে এ বার পানিহাটিতে সিপিএম প্রার্থী হয়ে নির্যাতিতার বাবা-মায়ের কাছে গিয়েছিলেন কলতান। সূত্রের খবর, আর জি কর-কাণ্ডের পরে ‘আর কবে’ গানের জন্য শাসক দলের রোষের মুখে পড়া গায়ক অরিজিৎ সিংহকে নির্দল প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছিল। অরিজিতের রাজি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, সে ক্ষেত্রে নির্যাতিতার মা-ই নির্দল প্রার্থী হতে পারেন বলেও আভাস ছিল। তাতে উদ্বেগ বেড়েছিল বাম শিবিরে। কারণ, ওই নির্যাতিতার পরিবারের কেউ নির্দল প্রার্থী হলে কোনও বিরোধী দলের পক্ষেই তাঁর বিরোধিতা করা কার্যত অসম্ভব ছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সিপিএমের রাজ্য কমিটির এক সদস্যের কথায়, ‘‘বাবা-মায়ের কেউ যদি শেষ পর্যন্ত প্রার্থী না-ও হন, বিজেপি কী চায়, সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। আমাদের মধ্যে যাদের কিছু দোলাচল ছিল, আশা করা যায় সেটা কেটে যাবে। বাবা-মা’কে সঙ্গে নিয়ে গত বছর ‘ছাত্র সমাজে’র ডাকে তথাকথিত অরাজনৈতিক নবান্ন অভিযানে বামেরা কেন শরিক হয়নি, সেই প্রশ্নেও আর কোনও ধোঁয়াশা নেই।’’ পক্ষান্তরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক বলছেন, ‘‘এই বিষয়ে এই মুহূর্তে আর কোনও মন্তব্য করতে চাইছি না।’’
নির্যাতিতার বাবা-মা যা-ই বলুন, তাঁদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দলের কেউ যাতে পাল্টা কড়া মন্তব্যে না যান, সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে সিপিএমে। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের মতে, ‘‘রাজ্যবাসী দেখেছেন, ওই অপরাধের বিরুদ্ধে কারা লড়েছিল। আর কলকাতা পুলিশ যে মিথ্যা তদন্ত করেছিল, তাকেই মান্যতা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআই।’’ কালীগঞ্জে বোমার আঘাতে নিহত বালিকা তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন সিপিএমের প্রার্থী হয়েছেন, তা হলে নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হতে চাইলে সমস্যা কোথায়— পাল্টা প্রশ্ন তুলছে পদ্ম শিবির। এই প্রশ্নেও অবস্থান স্পষ্ট করে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘কে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁদের ব্যাপার। তবে তামান্না সিপিএম পরিবারের সন্তান। তার বেদনাদায়ক মৃত্যু রাজনৈতিক খুন। আর জি করে ঘটেছিল প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। দল-মত নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষ তার প্রতিবাদ করেছেন। দু’টো এক নয়।’’
নির্যাতিতার পরিবারকে কটূক্তি না-করে এবং ন্যায়ের জন্য আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ডাক দিয়ে এ বার ভোটে বামফ্রন্টের সঙ্গী সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘দেশ জুড়ে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতার প্রশ্নে সবার আগে বিজেপিই কাঠগড়ায়। স্বাস্থ্য আন্দোলন বা দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনের নিরিখেও তা-ই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)