সব দিকে ‘নজর’ রাখতে হবে। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ গেল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে। অভিষেক একই সঙ্গে কর্মিসভাকে জানিয়ে দিলেন, ‘নজর’ থাকবে তাঁদের উপরেও। কে কী করছেন, কী করছেন না কোনও কিছুই দলীয় শীর্ষনেতৃত্বের নজরের বাইরে থাকবে না। এক কথায়, ভবানীপুরের রণাঙ্গনে অদৃশ্য সিসিটিভি বসিয়ে দিলেন মমতা-অভিষেক।
চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে রবিবার সন্ধ্যায় ভবানীপুরের নির্বাচনী কর্মিসভা ডেকেছিলেন মমতা। ছিলেন অভিষেকও। দ্বিমুখী দিক থেকে ভবানীপুরের তৃণমূল কর্মীবাহিনীকে সতর্কবার্তা দিলেন মমতা-অভিষেক। বিজেপি-র বিরুদ্ধে (এবং এই ভোটে নির্বাচন কমিশনকেও জুড়ে নিয়ে) যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে মমতা দলকে সতর্ক থাকতে বলেন, তা রবিবারের কর্মিসভাতেও বাদ যায়নি। তার সঙ্গে অভিষেক জুড়লেন দলীয় নেতাকর্মীদের শিথিলতা, নিষ্ক্রিয়তা, আত্মতুষ্টিতে না-ভুগে কাজ করার বার্তা। মমতা ভবানীপুরের কাউন্সিলরদের এ প্রসঙ্গেই সতর্ক করলেন, মৃদু সমালোচনাও করলেন।
অভিষেক জানান, তিনি সাধারণ ভবানীপুরের সাংগঠনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না। ওখানে দলের পুরনো, নেত্রীর আস্থাভাজন যাঁরা রয়েছেন তাঁরা অত্যন্ত দক্ষ এবং পরীক্ষিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। কিন্তু জানিয়ে দেন, সকলের ওপরই দলের নজর থাকবে। বৈঠকে উপস্থিত এক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘‘সেনাপতি বলেছেন, কেউ যেন আত্মতুষ্টিতে না ভুগি যে আমরা জিতে গেছি। বলেছেন, সব ঠিক আছে, জিতে গেলেও আপনাকে বুথে পাঁচটা ভোট বাড়াতে হবে।’’
অবিষেক নির্দেশ দিয়েছেন, কলকাতার মধ্যে ‘ফার্স্টবয়’ করতে হবে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রকে। অন্তত ৬০ হাজার ভোটে জেতাতে হবে তৃণমূলনেত্রীকে। আর সে ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে হবে কর্মীদেরই।
আরও পড়ুন:
অহীন্দ্র মঞ্চে মমতা-অভিষেকের বৈঠকে ছিলেন তৃণমূল কাউন্সিলর থেকে ব্লক স্তরের নেতানেত্রীরাও। বুথ স্তরের কর্মীদের অভিষেক বার্তা দেন, নিজেদের বুথ আগলাতে হবে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ২৮৭টি বুথ রয়েছে। উপনির্বাচনে মমতা যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তখন ২৩১টি বুথে তৃণমূল জয় পেয়েছিল। এ বার সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে যেতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূলের সেনাপতি। তার জন্য বড় দায়িত্ব বুথস্তরের নেতাকর্মীদেরই।
অন্য দিকে, নিজের কেন্দ্রের ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে মমতা মৃদু সমালোচনা করেছেন কাউন্সিলরদের। তাঁর পর্যবেক্ষণ, কাউন্সিলদের অনেকেই সারাবছর চুপ থাকেন। পুরভোটে তাঁরা যতটা গা-ঝাড়া দিয়ে কাজকর্ম করেন, সেই সক্রিয়তা লোকসভা বা বিধানসভা ভোটে দেখা যায় না। কিন্তু এ বার এই ‘কর্মসংস্কৃতি’ বদলাতে হবে। নিজের ওয়ার্ডে ভোট করানোর সময় ঠিক যতটা একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করেন, ঠিক ততটাই বিধানসভা ভোটে করতে হবে। তৃণমূলনেত্রী পরিষ্কার করে দেন, কোনও নির্বাচনকেই ছোট করে দেখা যাবে না। এ বার ভোটে কাউন্সিলদের কর্মকাণ্ডও তাঁর নজরে থাকবে।
ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে মমতার ভবানীপুরকে জয় করার ‘দায়িত্ব’ তিনি নিজে নিয়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন বিরোধী দলনেতা এবং মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারী। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুভেন্দু ভবানীপুরের জন্য পৃথক সমীক্ষাও করিয়েছেন। ধারাবাহিক ভাবে ভবানীপুর কেন্দ্রে দলের কর্মসূচিও করছেন তিনি। সেই প্রেক্ষাপটে তৃণমূলনেত্রীর তৎপরতা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরাজিত হতে হয়েছিল মমতাকে। তার পরে তিনি ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন। সেই উপনির্বাচনে মমতা প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে জেতেন। তার আগে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জিতেছিলেন ৩০ হাজার ভোটে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে ভবানীপুর থেকে মমতা জয়ী হয়েছিলেন ২৫ হাজার ভোটে।
কয়েক দিন আগে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী ভবানীপুরের প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের কার্যালয়ে এক বৈঠকে বসেছিলেন তৃণমূল কাউন্সিলরদের সঙ্গে। বৈঠকে কাউন্সিলরদের ভোটের কৌশল এবং প্রচারের রণনীতি ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি, নতুন একটি স্লোগান ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন রাজ্য সভাপতি। তা হল, ‘বাংলার উন্নয়ন ঘরে ঘরে, ঘরের মেয়ে ভবানীপুরে’। দক্ষিণ কলকাতা তৃণমূল সূত্রে খবর, প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নম্র ভাবে জনসংযোগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয় কাউন্সিলরদের। পাশাপাশি সব ওয়ার্ডে কর্মিসভা করতেও বলা হয়েছে। সেই সব কর্মিসভায় হাজির থাকবেন রাজ্য সভাপতি সুব্রত-সহ কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা রাসবিহারীর বিধায়ক দেবাশিস কুমার। দলীয় প্রচার যাতে কোনও ভাবেই অকারণে আগ্রাসী না-হয়, সেই বিষয়ে কাউন্সিলর এবং নেতাদের বিশেষ নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বক্সী।
কলকাতা পুরসভার ৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৭ ও ৮২ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ভবানীপুর বিধানসভা। বর্তমানে সব ক’টি ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর তৃণমূলের। কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে এই সব ওয়ার্ডগুলির মধ্যে কয়েকটিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি।
এ বার নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারে এসআইআর-ও। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে ভবানীপুরে ৪৭ হাজার ৯৪ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার ১৫৫ জন। তাই বাড়তি সতর্কতা দেখা যাচ্ছে তৃণমূলে।