এক সময়ের ‘স্যার’, এখন তাঁর কাছে ‘দাদা’!
‘স্যারের’ পরামর্শে তিনি সুন্দরবনের জন্য কত না কাজ করেছেন!
আর ‘দাদা’র টানে দিল্লি থেকে চলে এসেছেন প্রচারে। না-থাক রাজ্যপাট, ‘দাদা’ যে তাঁর কাছে ‘রাজনীতির ঊর্ধ্বে’!
তাই রবিবার মাঝদুপুরে চৈত্রের ঠা ঠা রোদ মাথায় নিয়ে রায়দিঘির সিপিএম প্রার্থী, ‘দাদা’ কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রচার-মিছিলে পা মেলাতে দ্বিধা করেননি ‘ভাই’ তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব অর্ধেন্দু সেন। কান্তিবাবুকে পাশে নিয়ে কয়েক হাজার বাম ও কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যিনি বললেন, ‘‘এ রাজ্যের নৈরাজ্যের পরিস্থিতির সত্যি পরিবর্তনের দরকার রয়েছে।’’
কান্তিবাবু যখন রাজ্যের সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন, তখন প্রায় তিন বছর (২০০৫-২০০৮) অর্ধেন্দুবাবু ছিলেন ওই দফতরের সচিব। পরে ২০১০-এ তাঁকে রাজ্যের মুখ্যসচিব হিসেবে বেছে নেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কিন্তু শুধু কি পুরনো সম্পর্কের টানে তিনি কান্তিবাবুর প্রচারে?
অর্ধেন্দুবাবুর উত্তর, না। তিনি জানান, যখন দিল্লিতে অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল তখনই ভেবেছিলেন, অসহিষ্ণুতার মোকাবিলা একমাত্র রাজনৈতিক ভাবেই করা যেতে পারে। তখন বাংলায় জোটের আবহ সবে তৈরি হচ্ছে। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, যদি জোট হয়, তা হলে বাংলায় গিয়ে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রচার করবেন। প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পরেই তিনি কান্তিবাবুকে ফোন করেন।
ভোট-বাজারে শনিবারও প্রচার করেছেন অর্ধেন্দুবাবু। বেহালা পূর্ব কেন্দ্রের জোটপ্রার্থী অম্বিকেশ মহাপাত্রের সমর্থনে। তবে অম্বিকেশবাবু অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কান্তিবাবু পুরোদস্তুর রাজনীতির লোক। কিন্তু শুধু কান্তিবাবুর হয়ে প্রচারে কেন? অর্ধেন্দুবাবুর কথায়, ‘‘আমার মনে হয়েছিল কান্তিবাবুই একমাত্র নেতা, যিনি রাজনীতির মধ্যে থেকেও রাজনীতির ঊর্ধ্বে। যত দিন কাজ করেছি, কান্তিবাবুকে কোনও দিন মন্ত্রী ভাবিনি। দাদার মতো ভাবতাম। কিন্তু প্রোটোকল অনুযায়ী ‘স্যার’ বলতে হতো। উনি নানা কাজে যে রকম পরামর্শ দিতেন, তেমনই আমার পরামর্শও নিয়েছেন। আমলা-মন্ত্রীর মধ্যে যে জটিলতা হয়, সেটা আমাদের মধ্যে কোনও দিনই হয়নি।’’
কান্তিবাবুও সেই পুরনো দিনের কথা বলতে ভোলেননি। তিনি বলেন, ‘‘সুন্দরবনের উন্নয়নে তখন রাজ্য সরকারের বরাদ্দ খুব সামান্য ছিল। কিন্তু কেন্দ্র সরকারের নানা দফতরে ভাল যোগাযোগ ছিল অর্ধেন্দুবাবুর। ওঁর পরামর্শে আমরা কেন্দ্রের কাছ থেকে অনুদান, তহবিল আদায় করে নিয়ে এসেছিলাম। সুন্দরবনের উন্নয়নে শুধু আমলার ভূমিকায় থেমে থাকা নয়, একেবারে মাঠে নেমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন উনি।’’
এ দিন কৌতলা হাট থেকে খাঁড়ি এলাকা পর্যন্ত ঘাম জবজবে পোশাকে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার মিছিলে হাঁটেন প্রাক্তন আমলা। তার আগে রায়দিঘির উত্তর কুমড়োপাড়ায় কান্তিবাবুর বাড়িতে যান তিনি। কান্তিবাবুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘‘দাদা, কেমন আছেন?’’ পরম স্নেহে পিঠে হাত দিয়ে তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসান কান্তিবাবু। দু’জনে মেতে ওঠেন পুরনো দিনের গল্পে। তার পরে মধ্যাহ্নভোজ। কান্তিবাবু খান পান্তাভাত, আলুভাজা, মাছভাজা। অর্ধেন্দুবাবু ভাত, ডাল, মাছ, সব্জি এবং টক দই। কান্তিবাবু নিজের প্লেট থেকে ছোট একটি ধানি লঙ্কা অর্ধেন্দুবাবুর হাতে দিয়ে বলেন, ‘‘আপনি যখন সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের দায়িত্বে ছিলেন তখন এগুলি এখানে ফলত। এখন আর তেমন মেলে না। আপনি ভালবাসেন বলে কয়েকটি জোগাড় করেছি।’’ অর্ধেন্দুবাবু মাথা নেড়ে বলেন,
‘‘হ্যাঁ, ঠিক।’’
মিছিল শেষে শনিবারের মতোই তৃণমূল সরকারের পরিবর্তনের জন্য বাম-কংগ্রেস জোটকেই বিকল্প বলে তুলে ধরার চেষ্টা করেন অর্ধেন্দুবাবু। জানান, তাঁর অনেক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীও জোটপ্রার্থীর প্রচারে
আসতে চাইছেন।