কলকাতা পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি লালবাজারে বসে বলেছিলেন, ‘‘শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন করানো আমাদের প্রধান কাজ। সেই কাজে নিজেকে অকৃতকার্য হিসাবে দেখতে চাই না।’’ মনোনয়ন পেশ, তার পরে নির্বাচন-পর্বে অজয়কুমার নন্দের নেতৃত্বাধীন কলকাতা পুলিশের ভূমিকা প্রশংসিতই হয়েছে। সেগুলি যদি ‘প্রি-টেস্ট’ হয়, তবে চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু আজ, সোমবার ফল ঘোষণার দিন থেকে। ভোট পরবর্তী হিংসা রোখার সেই পরীক্ষায় পুলিশ সসম্মানে উতরোবে কিনা, আপাতত সেই প্রশ্নই জোরদার নানা মহলে। লালবাজারের শীর্ষ স্তর থেকে যদিও রবিবারও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে,সব প্রস্তুতি সারা। যে কোনও গন্ডগোলের ক্ষেত্রে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ সূত্রের খবর, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে শহরের সমস্ত থানা এবং বাহিনীর বিভিন্ন পদাধিকারী মিলিয়ে তিনশোরও বেশি বদল করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাঁরা সামলাচ্ছিলেন, তাঁদের বদলে কার্যত পুলিশের ‘বি টিম’ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর অন্দরের একাংশেরই বক্তব্য, যোগ্য অথচ এত দিন যাঁরা সে ভাবে আলো পেতেন না, তাঁদের সামনের সারিতে আনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ২৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে অন্য রকম নির্বাচন করিয়েছে কলকাতা পুলিশ। যেখানে নির্বাচনের দিন বড় ধরনের অশান্তি সামনে আসেনি। ভবানীপুরের মতোসংবেদনশীল কেন্দ্রে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে লাঠি চালাতেও পিছপা হয়নি লালবাজার। নির্বাচনের পরে বেহালা পশ্চিম এবং যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের পঞ্চসায়রের মতো কিছু এলাকায় হিংসার ঘটনা ঘটলে সেখানেও কড়া পদক্ষেপ করেছে পুলিশ।
প্রাক্তন পুলিশকর্তা সলিল ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘পুলিশে এখন যাঁরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা দীর্ঘদিন অপাংক্তেয় হয়ে ছিলেন। ফলে, এই পরিস্থিতিতে তাঁদেরও নিজেদের প্রমাণ করার দায় রয়েছে। যে সরকারই আসুক, আইনের শাসন বলবৎ করতে হবে, শাসকের আইন চলবে না।’’ যদিও ফল ঘোষণার পরে পুলিশ কী ভূমিকা নেয়, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে প্রাক্তন পুলিশকর্তাদেরও। তাঁরা মনে করছেন, ফল প্রকাশের পরে ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশে আবার রদবদল দেখা যেতে পারে। তার সঙ্গেই দেখা যেতে পারে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করার প্রবণতা। যদিও লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তার মন্তব্য, ‘‘কী হলে কী হতে পারে, সেই আলোচনা এখন গৌণ। আমরা এই মুহূর্তে এলাকা নিয়ন্ত্রণের উপরেই মূল গুরুত্ব দিচ্ছি।’’
লালবাজারের দাবি, এই কারণেই শনি এবং রবিবার রাতে শহরের একাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ দল সাদা পোশাকে নজরদারি চালিয়েছে। গন্ডগোলের ঝুঁকি বেশি রয়েছে, এমন এলাকা ধরে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় অশান্তি পাকাতে পারে যারা, তাদের তালিকা বানিয়ে বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এলাকার ‘বাহুবলীদের’ সাফ বলে দেওয়া হয়েছে, গোলমাল করলে রেহাই নেই। ধরা পড়লেই হাজতবাস। উত্তর কলকাতার একটি থানার অফিসার বলেন, ‘‘বন্দর থেকে বেহালা, বেলেঘাটা থেকে বেলগাছিয়া— গন্ডগোলের ক্ষেত্রে জ়িরো টলারেন্স নীতি নিতে বলা হয়েছে উপরমহল থেকে। গন্ডগোল দেখেও পদক্ষেপ না করলে সার্ভিস বুকে দাগ পড়ে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে।’’
এই পরিস্থিতে এলাকার দাদাদের তরফেও সামনে আসছে সাবধানি পদক্ষেপ। নির্বাচনের আগেই জেলে যাওয়া, বর্তমানে জামিনে মুক্ত বেলেঘাটার রাজু নস্করের খোঁজ করতে জানা গেল, তাঁকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। রাজু কোথায়, বলতে পারেননি তাঁর ঘনিষ্ঠেরাও। একই অবস্থা উত্তর কলকাতার আর এক পরিচিত নাম রতন দাস ওরফে হাবার। তাঁর এক সহযোগী বলেন, ‘‘দাদা কেন, কেউই এ বার ঝামেলায় জড়াতে চাইছেন না।’’ কাঁকুলিয়া রোডে গন্ডগোলে নাম জড়ানো কসবার বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুরও খোঁজ নেই এই ভোট-বাজারে। অথচ, দক্ষিণ কলকাতার কিছু অংশে তিনিই আদতে ভোট করান বলে বার বার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক বার ফোন বা মেসেজ করা হলেও তিনি উত্তর দেননি।
কসবা থানার এক অফিসার বললেন, ‘‘এখন কেউই ঝামেলায় জড়াতে চাইছে না। নেতারা ফোন করলেও সকলেই নিজের মতো থাকছেন। সকলেই আদতে জল মাপছেন।’’ জল কোন দিকে গড়াল বুঝে স্রোতে সওয়ার হয়ে এরাই আবার শান্তির ভোটের পরিবেশ নষ্ট করবে না তো? উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)