গত পাঁচ বছরে বাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ভোটের ফল প্রকাশের আগের দিনই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে পরিচিতি থেকে ‘মুখ্যমন্ত্রী, কেরল’ শব্দগুচ্ছ মুছে দিয়েছেন। তাঁর পরিচিতি এখন শুধুই ‘পলিটব্যুরো সদস্য, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি’।
উল্টো দিকে, কংগ্রেস শিবিরে ভোটের ফল প্রকাশের আগেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে, ক্ষমতায় এলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন? দৌড়ে তিনটি নাম। জাতীয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল। গত পাঁচ বছরে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ভি ডি সতীশন। প্রবীণ নেতা রমেশ চেন্নিথালা। এঁদের মধ্যে বেণুগোপাল ভোটেই লড়ছেন না। তবুও মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে। কারণ তিনি ‘হাইকমান্ডের লোক’ বা রাহুল গান্ধীর ‘আস্থাভাজন’ বলে পরিচিত।
সোমবার পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হবে। তাতে একমাত্র কেরলেই কংগ্রেস জয়ের বিষয়ে আশাবাদী। অন্য দিকে, বামেদের ‘শেষ দুর্গ’ কেরলে ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে চিন্তিত সিপিএম। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় বামেরা শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি, অস্তিত্বসঙ্কটেও পড়েছে। এর পরে কেরলে হেরে গেলে জাতীয় রাজনীতিতে বামেদের প্রাসঙ্গিকতাও শূন্যে ঠেকবে বলে আশঙ্কা। সাধারণত কেরলে পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। সেই নিয়ম বদলে ২০২১-এ প্রত্যাবর্তনের রেকর্ড করেছিলেন পিনারাই বিজয়ন। অর্থাৎ, পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে কেরলের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীহিসেবে আবার গদিতে ফেরা। এ বার যাবতীয় বুথ ফেরত সমীক্ষা বাম-বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। সে সব ভুল প্রমাণিত করে বামজোট ফের ক্ষমতায় ফিরলে ৮২ বছর বয়সে পিনারাই টানা তৃতীয় বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড করবেন। পিনারাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কেরলে দল ও সরকারকে নিজের ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’-তে পরিণত করে ফেলেছেন। সিপিএম নেতাদের একাংশ মনে করছেন, ফের সিপিএমের ক্ষমতায় না ফেরাই ভাল। তা হলে পশ্চিমবঙ্গে তিন দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে সিপিএমের যে হাল হয়েছিল, কেরলেও সেই দুর্দশা হবে। পালাবদলের আঁচ করেই পিনারাই নিজেই নিজের পরিচিতি থেকে মুখ্যমন্ত্রী পরিচয় মুছে ফেলেছেন!
উল্টো দিকে, কংগ্রেস শিবিরে আবার ক্ষমতায় আসার আগেই মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য নিয়ম মাফিক লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পদের তিন দাবিদার, বেণুগোপাল, সতীশন, চেন্নিথালা-ই কেরলের প্রভাবশালী নায়ার সম্প্রদায়ের মানুষ। তিন জনেই কান্নুর জেলার ভূমিপুত্র। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোটে আইইউএমএল বা ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন অব মুসলিম লিগ দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক। তাদের মতামত বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। আইইউএমএল প্রথমে বলে দিয়েছিল, সতীশনেরই মুখ্যমন্ত্রী হওয়া উচিত। কারণ, তিনিই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে গত পাঁচ বছর বাম সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রবিবার অবশ্য আইইউএমএল বলেছে, কংগ্রেস হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকেই তারা সমর্থন করবেন।
হাইকমান্ড চাইলে কি বেণুগোপাল মুখ্যমন্ত্রী হবেন? কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা তারিক আনোয়ারের মতে, কংগ্রেসের প্রথা হল, দল জিতলে দিল্লি থেকে এক জন পর্যবেক্ষক পাঠানো হয়। তিনি বিধায়কদের মতামত শুনে হাইকমান্ডকে রিপোর্ট দেন। তার ভিত্তিতে হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেয়স কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন। বেণুগোপাল জাতীয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও তাঁকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। কংগ্রেসের একাংশ নেতা মনে করছেন, বেণুগোপাল ভোটে না লড়লেও অধিকাংশ বিধায়ক তাঁর পক্ষে সায় দিতে পারেন।
কংগ্রেসের অনেক নেতা অবশ্য এর মধ্যে অন্য ফায়দা দেখছেন। তাঁদের মতে, বেণুগোপাল কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হলে কংগ্রেসের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নতুন মুখ আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সংগঠনের হাল কিছুটা হলেও ফিরতে পারে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)