সংস্কারের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বর্জনের গণস্রোতের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই চেষ্টা ভেসে গেল। রাজ্যে ৭৪টি আসনে বিদায়ী বিধায়কদের টিকিট না-দিয়ে প্রার্থী বদল করেছিল তৃণমূল। তার মধ্যে ৫১টিতেই হেরে গিয়েছে প্রাক্তন শাসকদল। যে ১৫ জন বিধায়কের আসন বদল করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে তিন জন ছাড়া সকলেই হেরেছেন।
প্রার্থিতালিকায় এ বার সংস্কার করেছিল তৃণমূল। বেশ কয়েক জন বিধায়ক এবং কয়েক জন মন্ত্রী যে টিকিট পাবেন না, তা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। কিন্তু এক ধাক্কায় সেই সংখ্যা যে ৭৪ হয়ে যাবে, তা তৃণমূলেরও অনেকের ধারণার মধ্যে ছিল না। শুধু ৭৪ জন বিধায়ককে টিকিট না-দেওয়াই নয়, ১৫ জন বিধায়কের আসনও বদল করে দিয়েছিলেন মমতা-অভিষেক। এই পরিমাণ বদল তৃণমূল তৈরির পর কখনও দেখা যায়নি। সে দিক থেকে এই বিধানসভা ভোট ছিল তৃণমূলের সেই আগ্রাসী সংস্কারনীতির ‘অগ্নিপরীক্ষা’। যা শুধু হোঁচটই খায়নি। মুখ থুবড়ে পড়েছে।
২০২১ সালে জেতা বিধায়কদের মধ্যে বাদ পড়া উল্লেখযোগ্য নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী (বলাগড়), সাবিত্রী মিত্র (মানিকচক), সৌমেন মহাপাত্র (তমলুক), কাঞ্চন মল্লিক (উত্তরপাড়া), মঞ্জু বসু (নোয়াপাড়া), সূর্য অট্ট (নারায়ণগড়), অসিত মজুমদার (চুঁচুড়া), সুদীপ্ত রায় (শ্রীরামপুর), রত্না দে নাগ (পান্ডুয়া) চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী (বারাসত), নির্মল ঘোষ (পানিহাটি), বিবেক গুপ্ত (জোড়াসাঁকো), নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার মানিক ভট্টাচার্য (পলাশিপাড়া) এবং নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এখনও জেলবন্দি জীবনকৃষ্ণ সাহা (বড়ঞা)। ফলাফল বলছে, এই সবক’টি আসনেই জিতেছে বিজেপি।
আরও পড়ুন:
চার মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি (হাওড়ার শিবপুর), বিপ্লব রায়চৌধুরী (পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া-পূর্ব) জোৎস্না মান্ডি (রানিবাঁধ), তাজমুল হোসেনও (হরিশ্চন্দ্রপুর) টিকিট পাননি। একমাত্র হরিশচন্দ্রপুরে তৃণমূল জিতেছে। বাকি সব আসনে পরাজিত হয়েছে জোড়াফুল শিবির।
মোট ১৫ জন বিধায়কের আসন বদলে দেওয়া হয়েছিল। যাঁদের অধিকংশই নতুন পিচে উইকেট দিয়ে এসেছেন। শওকত মোল্লা (ক্যানিং পূর্ব থেকে ভাঙড়), রানা চট্টোপাধ্যায় (বালি থেকে শিবপুর), রত্না চট্টোপাধ্যায় (বেহালা পূর্ব থেকে বেহালা পশ্চিম), প্রাক্তন পুলিশকর্তা হুমায়ুন কবীর (ডেবরা থেকে ডোমকল), বিদেশ বসু (উলুবেড়িয়া পূর্ব থেকে সপ্তগ্রাম), সোহম চক্রবর্তী (চণ্ডীপুর থেকে করিমপুর) সোমবার বিকালের পরে প্রত্যেকের নামের আগে ‘প্রাক্তন বিধায়ক’ জুড়ে গিয়েছে।
দেড় দশক সরকার চালানোর পরে মমতার দলের কাঁধে যেমন স্থিতাবস্থা-বিরোধিতার ‘স্বাভাবিক’ বোঝা ছিল, তেমনই বেশ কিছু জায়গায় বিধায়কদের ঘিরে স্থানীয় স্তরেও বিরোধিতা এবং ক্ষোভ ছিল। সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় স্তরের সেই স্থিতাবস্থা-বিরোধিতাতেই প্রলেপ দেওয়ার কৌশল নিয়েছিলেন মমতা-অভিষেক। যার নেপথ্যে ছিল পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের ভূমিকাও। প্রার্থিতালিকায় অভিষেকের ‘হয় কাজ করো, না হয় পদ ছাড়ো’ নীতিরই বাস্তবায়ন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ভোটের নির্মম বাস্তব তৃণমূলকে মসনদ থেকে ছিটকে দিল। কোনও সংস্কারই কাজ করল না।
আরও পড়ুন:
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের অব্যবহিত পরে সংগঠনের দায়িত্ব অভিষেকের হাতে যাওয়ার পরে তৃণমূলের দল পরিচালনার ধাঁচে বেশ কিছু বদল এসেছিল। পুরনো তৃণমূলের খোলা হাওয়ার বদলে অভিষেকের সংগঠন পরিচালনায় অনেক বেশি করে জায়গা পেয়েছিল ‘কর্পোরেট’ সংস্কৃতি। ঘটনাচক্রে, অভিষেকও গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে নতুন তৃণমূলের কথাই বলে আসছিলেন। প্রার্থিতালিকায় ‘টিম অভিষেক’-এর অনেক মুখ এ বার বিধানসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মগরাহাট পশ্চিমে শামিম আহমেদ, ফলতায় জাহাঙ্গির খান, চুঁচুড়ায় দেবাংশু ভট্টাচার্য, পান্ডুয়ায় সমীর চক্রবর্তী, বালিতে কৈলাস মিশ্র, পূর্বস্থলী দক্ষিণে বসুন্ধরা গোস্বামী, মানিকতলায় শ্রেয়া পান্ডেরা লড়েছিলেন ভোটে। ফলতায় ভোট হয়নি। টিম অভিষেকের প্রার্থী হিসাবে মগরাহাট পশ্চিম থেকে জিতেছেন শামিম। বাকি সকলেই হেরেছেন।
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিবারই দেখা যেত, বেশ কিছু ‘তারকা’ মুখকে তারা প্রার্থী করছে। বিশেষত, যে সমস্ত এলাকায় স্থানীয় স্তরে প্রার্থী হওয়ার একাধিক দাবিদার থাকত এবং তজ্জনিত কারণে কোন্দলের অবকাশ থাকত, সেখানেই বাইরে থেকে ‘তারকা’ মুখ পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেন মমতা। কিন্তু এ বারই সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল। বরং রাজনৈতিক মুখের উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল তৃণমূল। তা সে রাজ্যসভায় ফের না-পাঠিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে উলুবেড়িয়া পূর্বে লড়তে পাঠানো হোক বা প্রয়াত আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর কন্যা কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর বসুন্ধরাকে পূর্বস্থলী দক্ষিণে লড়তে পাঠানো। যে ভাবে নির্মল মাজির আসন বদলে তাঁকে গ্রামীণ হাওড়া থেকে হুগলির গ্রামাঞ্চল গোঘাটে বা মালদহের মোথাবাড়ি থেকে সুজাপুর আসনে সাবিনা ইয়াসমিনকে লড়তে পাঠানো হয়েছিল, তার নেপথ্যেও ‘বার্তা’ ছিল। কিন্তু দেখা গেল প্যারাসুটে করে যে প্রার্থীদের অভিষেক বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে লড়তে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঋতব্রতই একমাত্র জিততে পেরেছেন। দেবাংশু থেকে তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য, পান্ডুয়ার সমীর থেকে পূর্বস্থলীতে বসুন্ধরা, সকলেই হেরেছেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরেই তৃণমূলের সাংগঠনিক স্তরে রদবদলের কথা ছিল। অভিষেক ঘোষণা করেছিলেন, শুধু সাংগঠনিক স্তরে নয়, পুরসভাগুলির প্রশাসনেও রদবদল করা হবে। সেই সাংগঠনিক রদবদলের অনেকটাই হয় ২০২৫ সালের শেষের দিকে। পুরসভার রদবদলও যে ভাবে হওয়ার কথা ছিল, সে ভাবে হয়নি। সেই কারণেই তৃণমূলের অন্দরে অনেকের প্রশ্ন ছিল, প্রার্থিতালিকায় তেমন কোনও ‘সাহসিকতা’ কালীঘাট এবং ক্যামাক স্ট্রিট দেখাতে পারবে কি না। কিন্তু প্রার্থিতালিকায় সংস্কার গুরুত্ব পেয়েছিল। যা দল তৈরির পর থেকে গত ২৬ বছরে কখনও দেখা যায়নি।
কিন্তু দেড় দশকের স্থিতাবস্থা-বিরোধিতা, দুর্নীতি, পুলিশের ভরসায় ধমকচমকের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল পরিমাণমতো মেরুকরণের উপাদানও। ফলে তৃণমূলের সমস্ত সংস্কারই জলে চলে গেল।