E-Paper

রামের ‘মোহ’ কেটে ফিরুক বামের জমি, ডাক বিমানের

সে বাম জমানা অতীত। সরাসরি কোনও কেন্দ্র জিতে ফেলার কথা হলফ করে বলার জায়গায় বামেরা আপাতদৃষ্টিতে নেই। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করে এসে সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা তথা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু চান, রাজ্য জুড়ে বামেদের জমি পুনরুদ্ধার হোক।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩১
‘বিকল্পের ইস্তাহারে’ চোখ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দফতরে।

‘বিকল্পের ইস্তাহারে’ চোখ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দফতরে। — নিজস্ব চিত্র।

শাসক দলের অন্তর্দ্বন্দ্বের জেরেই মূলত সে বার দমদম লোকসভা কেন্দ্র হাতছাড়া হয়েছিল সিপিএমের। জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির (তখন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট) তপন শিকদার। পরের বছর আবার ভোট, প্রার্থী বদলেও ফল বদলাল না। তার পরের বার ভোটের সময়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, জীবদ্দশায় তিনি দেখে যেতে চান দমদম বামেদের হাতে ফিরে এসেছে। পূর্ণ উদ্যমে সে বার ময়দানে ঝাঁপিয়ে জ্যোতিবাবুর কথা রেখেছিলেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা!

সে বাম জমানা অতীত। সরাসরি কোনও কেন্দ্র জিতে ফেলার কথা হলফ করে বলার জায়গায় বামেরা আপাতদৃষ্টিতে নেই। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করে এসে সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা তথা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু চান, রাজ্য জুড়ে বামেদের জমি পুনরুদ্ধার হোক। তৃণমূলকে শিক্ষা দিতে পারে বিজেপি, এই ‘মোহ’ কাটিয়ে বাম ভোট আবার ঊর্ধ্বগামী হোক। ‘বাংলা বাঁচানো’র লড়াইয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন বাম কর্মী-সমর্থকেরা।

পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েকটি নির্বাচনে আসনের হিসেব যা-ই হোক, ভোটপ্রাপ্তি মোটামুটি একই জায়গায় রাখতে পেরেছে বিজেপি। ভোট-বাক্সে বামেদের যত রক্তক্ষরণ হয়েছে, তত লাভ হয়েছে বিজেপির। এই চিত্র যেমন পাটিগণিতে পরিষ্কার, তেমনই আবার বহু ক্ষেত্রে বামেরা কিছু ভোট ধরে রাখতে পেরেছে বলেই বেশ কিছু আসন শেষ পর্যন্ত জিতে গিয়েছে তৃণমূল। ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। এ বারের বিধানসভা ভোটে সেই কারণেই পদ্ম শিবির বাম-কাঁটা সরাতে মরিয়া! তারা প্রচার চালাচ্ছে, ভোট কেটে তৃণমূলের সুবিধা করে দেয় বামেরা। বাম-তৃণমূল তাই টেবিলের নীচের আঁতাঁতের শরিক! যা তৃণমূলের বাম-রাম দোস্তির প্রচারের ঠিক বিপরীত।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকের ‘নৈরাজ্য ও বিভাজনে’র রাজনীতির বিকল্প খুলে রাখতে বাম সমর্থন পুনরুদ্ধাদের ডাক দিচ্ছেন বিমান ও তাঁর সহযোগী বাম নেতৃত্ব। ফ্রন্ট চেয়ারম্যানের মতে, ‘‘আগে রাম পরে বাম, এই রকম একটা কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রচার মূলত আরএসএস করেছিল। তাতে কিছু সাফল্যও তারা পেয়েছিল। কিন্তু সেই জিনিস আর হবে না। বিজেপি-আরএসএস কী বস্তু, বাংলার মানুষ বুঝে ফেলেছেন। বাংলা বাঁচানোর জন্য এ বার লড়াই।’’ রাজ্যে সরকার-বিরোধী ভোট বিজেপিতে যাওয়ার প্রবণতা কি ঠেকানো যাবে? বিমান বলছেন, ‘‘সবটা এই ভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে বিজেপি এলেই সমাধান হয়ে যাবে, এই কথায় মানুষ আর চোখ বুজে বিশ্বাস করছেন না। মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। বিশেষত, নিম্ন আয়ের, খেটে-খাওয়া মানুষের মধ্যে। রুটি-রুজির প্রশ্ন তাঁদের কাছে বড়। বিজেপির শুধু হিন্দু-মুসলিম, অনুপ্রবেশকারী, আমিষ-নিরামিষ তত্ত্ব নিয়ে তাঁরা কী করবেন? তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন। মানুষের উপরেই আমাদের ভরসা করতে হবে।’’

বামফ্রন্টের ইস্তাহার প্রকাশ। মুজফ্ফর আহমেদ ভবনে।

বামফ্রন্টের ইস্তাহার প্রকাশ। মুজফ্ফর আহমেদ ভবনে। — নিজস্ব চিত্র।

একই দিনে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সিপিএম রাজ্য দফতরে দুই সহকর্মী বনানী বিশ্বাস ও মৃণাল চক্রবর্তীর মরদেহে শ্রদ্ধা জানানোর নজিরবিহীন অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়েছে প্রবীণ বাম নেতাকে। বিষণ্ণতার মধ্যেই বামফ্রন্টের বৈঠক করেছেন। আসন সমঝোতার প্রশ্নে নানা মতান্তরের মধ্যেও শরিকদের বেঁধে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন কয়েক মাস ধরে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বিমানের মনে হচ্ছে, ‘‘বেশ কিছু আসনে এ বার ত্রিমুখী লড়াই হবে। আর তিন-কোনা লড়াই হলে কোথায় কে বেরিয়ে যাবে, বলা যায় না। সেই এলাকায় প্রচার কোন বিষয়ের উপরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করবে।’’ তৃণমূলের শাসনের নৈরাজ্য, দুর্নীতির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে গরিব, প্রান্তিক মানুষকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে হয়রান করা ও তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার ঘটনায় বিজেপির চেহারা যে ফের ধরা পড়ে যাচ্ছে, তা-ও রাজ্যের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাইছেন তিনি।

একই ভাবে উত্তরবঙ্গের বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য মনে করছেন, রাজ্যের সব মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে যাননি। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়রের মতে, ‘‘বিজেপির প্রতি আকর্ষণ মূলত মধ্যবিত্ত ও স্বচ্ছল হিন্দুদের একাংশের মধ্যে। কিন্তু এ বারের ভোটের প্রচারে গিয়েও দেখছি, প্রান্তিক, স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে বহু হিন্দু আছেন, যাঁদের মধ্যে বিজেপির প্রভাব নেই। তাঁদের উপরে রাজ্য সরকারের নানা প্রকল্প, অনুদানের প্রভাব আছে, আবার সমস্যাও আছে। এই প্রান্তিক, গরিব মানুষের কাছে আমাদের, বামপন্থীদের আরও বেশি করে পৌঁছনোর চেষ্টা করা উচিত।’’ অশোকের দাবি, ভোট শুধুই মেরুকরণে হচ্ছে না। বামেদের জন্য ভবিষ্যতের পথও বন্ধ হচ্ছে না।

পদ্মের পথে কাঁটা হওয়ার লড়াইয়েই এ বার বামেদের নজর!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Left Front Election Manifesto

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy