বাসচালক দাদা ও ভাইয়েরা, দৌলতাবাদে সেতু থেকে বাসটি পড়ে যাওয়ার পর থেকে যা ঘটল, যা ঘটছে তাতে বড় বিপন্ন বোধ করছি। পরিচিতেরা ফোন করেছেন, ‘কী রে, কোথায় আছিস? ঠিক আছিস তো?’ আসলে ওঁরা অন্য ভাবে জেনে নিতে চেয়েছেন, আমরা ওই বাসে ছিলাম কি না! আমি একা নই, আমার মতো অনেকেই এমন ফোন পেয়েছেন। কাজের জন্য রোজই তো সবাইকে পথে বেরতে হয়। কে কোন বাসে ওঠে, তার খোঁজ কে আর রাখে! কিন্তু চেনা এলাকায় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে কেঁপে ওঠে বুক।

দৌলতাবাদের ওই ঘটনার আগে পরে বালির ঘাট সেতু দিয়ে অনেকেই যাতায়াত করেছেন। করছেনও। ভালই ভালই। কিন্তু যদি....। আপনারা বলতেই পারেন, ‘এ আবার কেমন কথা? দুর্ঘটনা তো হররোজই কোথাও না কোথাও হচ্ছে। কত লোক মারাও যাচ্ছে। তা হলে কি স্রেফ এই ‘যদি’, ‘কিন্তু’তে আটকে বাইরে বেরবো না? বাসে উঠব না?’ নিশ্চয় উঠব। না উঠে তো উপায় নেই! চলাই তো জীবন। থেমে গেলে মৃত্যু। জীবন শেখাচ্ছে, শুধু চললেই হবে না, গতি চাই। আরও গতি।

সেই গতিতে টিকে থাকতে হয় বাসের মালিক, কর্মচারী এবং আপনাদেরও। অন্য বাসের কাছে যাতে মার খেতে না হয়, ট্রিপ যাতে কম না হয় সে জন্য এক্সিলেটরকে দাবিয়ে রাখতেই হয়। হোক রিসোল করা টায়ার, হোক বেহাল পথ, হোক লজঝড়ে বাস, হোক নড়বড়ে সেতু, হোক কুয়াশা-ঢাকা রাস্তা, গতি কমলেই লোকসান। এ সব জেনে আমরাও তো বেছে নিই ছাড়লেই ছুটতে থাকা বাস। সেই বাসও ঝড়ের গতিতে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে।

কিন্তু যদি না দেয? তার আগেই যদি কিছু একটা ঘটে যায়? দৌলতাবাদ কিংবা আরও অনেক দুর্ঘটনার মতো? শুরু হয় হইহই— ‘বাসের চালক মোবাইলে কথা বলেছিলেন নাকি ওভারটেক? বাসের হাল ঠিক ছিল তো?’ প্রশাসনের তরফে এখন রাস্তা, সেতু, ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে গুরুগম্ভীর বৈঠক চলবে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে, ‘সেফ লাইফ, সেভ ড্রাইভ’। পরে ফের সব থিতিয়ে যাবে, যেমন যায়। কিন্তু দুর্ঘটনার হাঁ-মুখগুলো তখনও ওত পেতেই থাকবে! সেই মারণ-হাঁ বন্ধ করবে কে, কারা? এই প্রশ্নটা তুলুন আপনি, আপনারাও।

সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপও ‘সতর্ক’ করছে— বাসে উঠে নজর রাখতে হবে আপনাদের উপরে। দেখতে হবে আপনারা মোবাইল ব্যবহার করছেন কি না। বুঝে নিতে হবে আপনার মুখ থেকে ছাইপাঁশের গন্ধ বেরোচ্ছে কি না। তেমন হলে পুলিশে খবর দিতে হবে। এমন বার্তা হয়তো আপনাদের মোবাইলেও গিয়েছে। কিন্তু সত্যি করে বলুন তো, এমনটা কি সত্যিই সম্ভব? বাসে উঠে যাত্রীরা আপনার পরীক্ষা নেবে?

বিশ্বাস বড় বিষম বস্তু, জানেন! করলেও বিপদ, না করলেও। তার পরেও তো বিশ্বাসই করতে হয়! সামনে যখন একটা বাস এসে থামে, বিশ্বাস করি চালকের লাইসেন্স আছে। বিশ্বাস করি, চালক মদ খেয়ে নেই। বিশ্বাস করি, চালক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। এই বিশ্বাসটা আপনাদের উপরে রাখতে দিন। এই বিশ্বাসটা আপনাদের উপরে রাখতে চাই।

বাস চালানোর সময় হাতে থাক স্টিয়ারিং। ফোন থাকুক কন্ডাক্টরের কাছে। খুব জরুরি প্রয়োজনে বাস থামিয়ে কথা বলুন। গতিও থাকুক স্বাস্থ্যকর। করিমপুরের রেখা সাহার নাম হয়তো আপনারা অনেকেই শুনেছেন। বাসের ধাক্কায় মারা গিয়েছিলেন রেখাদেবীর ছেলে। তার পরে সেই রেখাদেবীই চালু করেন অভিনব এক পুরস্কার। পুরস্কারের শর্তও তিনিই দেন। এক বছরে দুর্ঘটনা তো দূরের কথা, কোনও রকম আইন না ভেঙে বাস চালাবেন যিনি, সেই চালক পুরস্কার পাবেন। ফি বছর তেমন পুরস্কারও পান অনেক বাস চালক। পথের রেষারেষি ভুলে এমন পুরস্কারের জন্য আপনারা যত খুশি রেষারেষি করুন না!

এত কিছুর পরেও যাত্রীদের কেউ বাসে উঠে বলবেন, ‘এ কি গরুর গাড়ি নাকি হে! টানো, টানো’। আপনি কিন্তু চালক, ক্যাপ্টেন। আপনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকুন। মাথায় রাখুন, বাসবোঝাই এত লোকের জীবন-মৃত্যু আপনার হাতে। ভুলে যাবেন না, আপনারও একটা পরিবার আছে।

ঘর বড় প্রিয় জায়গা। দিনভর যুদ্ধ শেষে আমি, আপনি সবাই তো সেখানেই ফিরতে চাই। নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে। এ বার সত্যি সত্যিই শুভ হোক যাত্রা।