বাবাসাহেব অম্বেডকর এবং টমাস জেফারসন এই দুই ব্যক্তিত্বের ব্যবধান দেড়শো বছর। কোথায় মার্কিন মুলুক আর কোথায় ভারত। দু’জনেই এই দুই দেশের সংবিধানের প্রতিষ্ঠা পুরুষ। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার বিশ্বখ্যাত ঘোষণাপত্রে, জেফারসন লেখেন, ‘আমরা এই সত্যকে স্বতঃসিদ্ধ বলে গ্রহণ করছি যে সমস্ত মানুষই সমান। জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের প্রত্যাশার অধিকার মানুষের ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার।’

দীর্ঘ দিনের দাসত্ব প্রথা ঘুচিয়ে জেফারসনের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল আমেরিকার গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। আর ভারতে? জাতপাত ও ধর্মের দাসত্ব আর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলে অম্বেডকরের নেতৃত্বে ভারতের নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল সংবিধানে। সংসদের সেন্ট্রাল হলে গিয়ে সেই পুরনো পাখা, আসবাব আর তৈলচিত্র দেখলে আজও রোমাঞ্চ হয়। এই সেই ঘর যেখানে দীর্ঘ বিতর্কের পর সংবিধান রচনা হয়। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই সংসদ ভবনের সামনেই সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছিলেন। তখন বহু নিন্দুক বলেছিলেন, ‘অতিভক্তিকে চোরের লক্ষণ বলে।’ আমি কিন্তু তাদের মতের বিপক্ষে ছিলাম। আমি বলেছিলাম, যদি কেউ সংসদকে গণতন্ত্রের মন্দির আখ্যা দিয়ে প্রণাম করেন, তবে সবচেয়ে আগে তাঁকে স্বাগত জানানো প্রয়োজন। দেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁকে বিপুল ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। নাগরিক হিসেবে কর্তব্য, তিনি কী ভাবে এ বার রাজধর্ম পালন করেন তা দেখা।

তিন বছর অতিবাহিত। ২০১৭ সালের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ২০১৮-তে পা দিলাম। এখন মনের সত্য অনুভব হল, ২০১৭ ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘ অমাবস্যা। সরকারি প্রকল্পের সাফল্য, দেশের আর্থিক উন্নয়ন এমনকী বিদেশ নীতির ঢক্কানিনাদ আর বাস্তবতার মধ্যে আশমান-জমিন ব্যবধান। কিছু কৃপাপ্রার্থী আমির-ওমরাহ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সমাজ তা বলছেও। আমার আরও সমস্যা হচ্ছে, যখন দেখছি, উন্নয়নের অগ্রাধিকার বদলে গোটা দেশ জুড়ে নবকলেবরে শুরু হয়েছে হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের প্রচার। হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে, শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশে ভারত-দর্শনের বহুত্ববাদকেই আছাড় মেরে ফেলা হচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জেও গোরক্ষক বাহিনীর তাণ্ডব। আবার রাম-মন্দির নির্মাণের ঘোষণা, এ সবই গাঁধী-নেহরুর সাবেকি ভারত-ভাবনাকে পালটে নতুন হিন্দুত্ববাদী আখ্যান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এই ভাবনার ধ্বংস দেখে আমি এখন এক শঙ্কিত ভারতীয়।

বর্ষশেষে বড়দিন মানে ২৫ ডিসেম্বরই জন্মদিন ছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর। এখনও বিজেপি দেশের নানা প্রান্তে পোস্টারে ব্যানারে মোদী-অমিত শাহের পাশাপাশি বাজপেয়ীজির ছবি ব্যবহার করে। বাজপেয়ীজিকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। নেহরু-গাঁধী তো অনেক দূরের বাসিন্দা। নিজের দলের দশম প্রধানমন্ত্রীর কথাই আজ আমি মনে করাতে চাই মোদীজিকে।

’৭৭ সালে বাজপেয়ী যে দিন বিদেশমন্ত্রী হন, সে দিন সাউথ ব্লকে গিয়ে দেখেন, নেহরুর একটা বড় ছবি কেউ সরিয়ে দিয়েছে। কোনও এক অত্যুৎসাহী আমলা ভাবেন, জনসংঘের নেতা বাজপেয়ী খুশিই হবেন। ফল হল উলটা। বাজপেয়ী নির্দেশ দেন, এখনই ছবিটি ওখানে আবার লাগানো হোক। বাজপেয়ীর মন্তব্য ছিল, ইতিহাসকে কখনওই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা যায় না। এই ছিলেন বাজপেয়ী। কী করে ভুলি, কার্গিল যুদ্ধের পর যখন পারভেজ মুশারফ রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে আগরা শীর্ষ বৈঠক করতে চান, তখন লালকৃষ্ণ আডবাণী এবং জর্জ ফার্নান্ডেজের যুক্তি ছিল, ওই বৈঠকে রাজি হওয়া মানে পাকিস্তানে পারভেজের সামরিক শাসনকেই বৈধতা দেওয়া। বাজপেয়ীর যুক্তি ছিল, দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনা ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা থাকতে পারে না।

স্বীকার করছি, অল্প বয়সে অনেক সময় আমার মনে হয়েছে এক জন জবরদস্ত প্রশাসক প্রয়োজন, যিনি এসে সুপারম্যান বা অরণ্যদেবের মতো ডান্ডা মেরে সব ঠান্ডা করে দেবেন। যেমন আজও বহু হতাশ মানুষ ব্রিটিশ শাসন বা জরুরি অবস্থার প্রশংসা করে বলেন, ওই রকম দাওয়াই প্রয়োজন। একেই বলে মবোক্রেসি। ভুলে গেলে চলবে না, হিটলারের জনসভাতেও একদা কাতারে কাতারে মানুষ এসেছে। ১৯৩২ সালে জার্মানিতে নির্বাচন অ্যাডলফ হিটলারকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দেয়। ’৩২ সালে ক্ষমতায় এসে ’৩৮ সালে হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে নেন। সে আনুগত্য পেতে খুব কষ্ট হয়নি হিটলারের, কারণ মানুষ ভেবেছিল, এই জবরদস্ত প্রশাসক জার্মান রক্তের বিশুদ্ধতা আর শক্তিশালী রাষ্ট্র দেবে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক উন্নতি আনতে পারবে।

মোদীকেও আমরা ঠিক এ রকম এক আগাম আনুগত্য-উপহার দিই। ২০১৭ সালের প্রধান ব্যক্তিত্ব এখনও তিনি। এবিপি নিউজ-হিন্দি চ্যানেলে ফি-বছর ‘ব্যক্তি বিশেষ’ নামে একটি অনুষ্ঠান হয়। সমীক্ষা করে সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালেরও প্রধান ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী। কারণ তিনিই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

মোদীর টুইটার ফলোয়ার তিন কোটি ৭৫ লক্ষ। মোদী রাতে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমোন। পাগলের মতো কাজ করতে পারেন। খুবই কাছ থেকে এই বিতর্কিত মানুষটিকে দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি। আজ নয়, প্রায় ত্রিশ বছর ধরে দেখেছি, দিল্লিতে-অমদাবাদে। এ কথাও অস্বীকার করব না, এক জন সাংবাদিক হিসেবে আমি সব সময়ই ওঁর ‘অ্যাকসেস’ পেয়েছি। উলটে আমি বলেছি, আপনি এখন প্রধানমন্ত্রী, কত ব্যস্ত, সে জন্যই আসতে চাই না। উনি বলেছেন, আমার সঙ্গে দেখা করা, এ তোমার অধিকার। খুব সুন্দর কথা বলতে পারেন তিনি, শুধু জনসভায় নয়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেও। বহু প্রবীণ বিজেপি নেতা আজকাল দেখা হলে জিজ্ঞাসা করেন এহেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আজ আপনি এত আক্রমণাত্মক কেন?

২০১৮ সালের গোড়ায়, হে পাঠক, আপনাদের কাছে এই সত্য কথাটা বলে একসঙ্গে পথ চলা শুরু করতে চাই। রাজনীতিক ও সাংবাদিকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যক্তিগত স্তরেই থাকুক। কিন্তু গত তিন বছরের মোদী সরকার যতটা ব্র্যান্ড, লোগো এবং প্রচারে থেকেছে, ততটা বাস্তবে নয়। শুধু ভোটে জেতার চমক, শুধু কথা, শুধু মিডিয়া পরিসর দখলের আগ্রাসী কৌশল! নিজের মনকে এই সত্যকথন থেকে বিরত থাকতে বলি কী করে।

২০১৭ সালের এই মোহভঙ্গের পটভূমিতেই ২০১৮ নতুন বছরের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে চাইছেন রাহুল গাঁধী। এই হতাশার মধ্যে ২০১৮-র ধিকিধিকি আশা একটাই। দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলিত-নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর আজ শোনা যাচ্ছে। রাহুল সফল হবেন কি হবেন না তার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে ২০১৮ সালে তিনি দেশের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারবেন কি না তা দেখার জন্য আমি তাঁকেও রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার পক্ষে।

যেমন পাঁচ বছর আগে সাংবাদিক হিসাবে মোদীকে পরিসর দিতে চেয়েছিলাম।