মাস কয়েক আগের একটি ঘটনা। উত্তরবঙ্গের একটি গ্রামে এক তরুণীর বাড়িতে প্রসবের তোড়জোড় চলছিল। খবর পেয়ে দফতরের কর্মীরা সেখানে হাজির হয়ে বাড়ির লোকের কাউন্সেলিং শুরু করেন। কিন্তু তাঁদের এক গোঁ। কিছুতেই হাসপাতালে যাবেন না। কেন? তরুণীর মায়ের বক্তব্যের সারমর্ম হল, হাসপাতালে তোমরা ওর কোনও আব্রুই রাখবে না। সঙ্গে নোংরা পরিবেশে সংক্রমণের ভয়ও থাকবে। তার চেয়ে বাড়িই ভাল।

বিরোধী দলের কোনও নেতা-নেত্রীর অভিযোগ নয়। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষকর্তার বয়ান এটি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমানোর অভিযানে নেমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া পেয়ে হতচকিত স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশ। যে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমানোকে রাজ্যে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়, সেখানে লেবার রুমগুলিই এমন সংক্রমণের আঁতুড় কেন, ইতিমধ্যেই সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য দফতরের দাবি, রাজ্যে পৃথক লেবার রুম প্রোটোকল রয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক-চিকিৎসকদের নিয়ে তৈরি হয়েছে মেন্টর গ্রুপ। তার সদস্যরা প্রতি মাসে বিভিন্ন হাসপাতালের লেবার রুম পরিদর্শন করছেন। কেনা হয়েছে এক হাজারেরও বেশি আধুনিক লেবার টেবল। কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি অনেক জায়গাতেই। এমনকী, জন্মের পরেই শিশুকে উষ্ণ রাখার যে প্রক্রিয়া, অর্থাৎ হাইপোথার্মিয়া ম্যানেজমেন্ট, লেবার রুমে যা থাকা বাধ্যতামূলক, বহু জায়গাতেই তার দেখা নেই। স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষকর্তারা স্বীকার করেছেন, স্বাস্থ্য দফতরের খোলনলচে বদলানোর হাজারো চেষ্টার মধ্যে ব্যর্থতার ছাপ সবচেয়ে বেশি এই লেবার রুমগুলিতেই।

কেমন সেই অবস্থা? কলকাতা শহরের দু’টি হাসপাতালের লেবার রুম ঘুরে যে চিত্র দেখা গেল তা চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর। চারদিকে ছড়ানো রক্তমাখা তুলো, গজ, কাপড়ের টুকরো। টেবল থেকে এক প্রসূতি সরার পরে টেবিল পরিষ্কারের বালাই নেই। রক্তের ছোপ লাগা টেবিলেই শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে পরের জনকে। এক টেবিলের সঙ্গে অন্য টেবিলের মাঝখানে কোনও পর্দা নেই। নেই ন্যূনতম আব্রুটুকুও। কলকাতার হাসপাতালের লেবার রুমের যদি এটাই চিত্র হয় তবে রাজ্যের অন্য হাসপাতালের লেবার রুমের ছবিটা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি মেন্টর গ্রুপের কয়েক জন সদস্য দফতরের শীর্ষকর্তাদের কাছে লেবার রুমগুলির বেহাল দশা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। তার পরেই ভোটের আগে ছবিটা বদলাতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবা হয়েছে।

রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ আধিকারিক শিখা অধিকারীর বক্তব্য, ‘‘নিয়মিত পরিদর্শনের পরে আগের চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। কিন্তু আরও পরিবর্তন দরকার। আমরা সবরকম সহায়তা করছি। কিন্তু সমস্ত স্তরে সদিচ্ছাটা জরুরি।’’ একই কথা বলেছেন মা ও শিশুমৃত্যু রোধে গঠিত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর কথায়, ‘‘কিছুটা এগিয়েছি। আরও বহু দূর যাওয়া বাকি। সকলের মধ্যে মোটিভেশন তৈরি করা যাচ্ছে না, এটাই সবচেয়ে বড় আফশোস।’’ এক স্বাস্থ্যকর্তার আফশোস, ইউনিসেফ এবং স্বাস্থ্য দফতরের যৌথ চেষ্টায় আধুনিক টেবল দেওয়া হয়েছে। নিউ বর্ন কেয়ার কর্নার রাখা হয়েছে। লেবার ট্রে-তে গুছিয়ে রাখা হয়েছে ছুরি, কাঁচি, সেলাইয়ের সুতো। কিন্তু তার পরেও গোড়াতেই গলদ থেকে গিয়েছে। আর সেই গলদের নাম ‘সদিচ্ছা’।

কেমন সদিচ্ছা? পরিবারকল্যাণ দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘বেআব্রু পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ প্রায় সকলেরই। সেটা কমাতে আমরা দুটি শয্যার মাঝখানে পর্দা লাগানোর ব্যবস্থা করেছি। পর্দা কেনাও হয়েছে। কিন্তু নার্সরা তা ব্যবহার করেন না। অনেকেই কাজের চাপের অজুহাত দেন। কিন্তু দেখা গিয়েছে, যেখানে দিনে ৩০টি প্রসব হয়, সেখানেও একটি প্রসবের পরে শয্যা পরিষ্কার করা হয় না, আবার যেখানে দিনে একটি প্রসব হয়, সেখানেও হয় না। সুতরাং কাজের চাপের যুক্তিটা আদতেই ধোপে টেকে না। তা ছাড়া প্রসবকালীন সময়ে মায়েরা যন্ত্রণায় চিৎকার করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের নার্স, ডাক্তারদের ধমক, কখনও কখনও গালিগালাজ বা চড়থাপ্পড়ও খেতে হয়। বার বার বলা সত্ত্বেও এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।’’