সা...রে...গা...মা...পা...

গান গাইতে পারে প্রোটিনও! রং-বেরঙের তালে, ছন্দে, সুরে। রামধনুর নানা রঙের নানা রাগে। অনুরাগে।

‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ তার অন্তরে-অন্দরে লুকিয়ে রয়েছে, গানে গানেই তার ছবি এঁকে দিতে পারে প্রোটিন। দোলা দিতে পারে আমাদের। নাচের তালে তালে, মুদ্রার বৈচিত্রে, শরীরী বিভঙ্গের তারতম্যে যেমন কুচিপুড়ি কোথাও কোথাও আলাদা হয়ে যায় ভরতনাট্যম থেকে। রাগের ‘বসন্ত’ অন্য পথ ধরে ‘খাম্বাজ’-এর সঙ্গে তার বনিবনা হয় না বলে, প্রোটিনও তেমনই রামধনুর নানা রঙের নানা তালে নানা ছন্দে, সুরে, রাগে বুঝিয়ে দিতে পারে তার চেহারাটা কেমন, ভারী না হাল্কা, নিজেকে সে কী ভাবে সাজিয়েছে, তার অঙ্গসজ্জার ধরনধারণ।

প্রোটিনের গান গাওয়ার সেই চমকে দেওয়া গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘হেলিয়ন’-এ। যার শিরোনাম- ‘মেলোডি ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড প্রোটিন ফোল্ড ক্লাসিফিকেশন’। মূল গবেষক ব্রিটেনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের বায়োইনফর্মেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট বাইওয়াটার ও আমেরিকার ইস্টার্ন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, মিউজিক কম্পোজার জোনাথন মিডলটন।

নানা প্রোটিনের নানা রঙের সুর, তাল, ছন্দ, রাগের পরতে পরতে জড়ানো গানের সেতু ধরে অনেক জটিল অসুখের নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কারের কাজটাও, এর ফলে, কিছুটা সহজ হয়ে গেল বলে প্রোটিন গবেষকদের অনেকেই মনে করছেন। তাই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে গবেষণাপত্রটি।

প্রোটিন ‘অ্যালব্যুমিন’ আর (নীচে) তার গাওয়া ‘গান’-এর ‘নোটস’

আমাদের শরীরে প্রোটিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ যে, তাদের গান শোনার দরকার হল গবেষকদের?

আমাদের শরীরের যেমন কার্বোহাইড্রেট লাগে, ফ্যাট লাগে, তেমনই লাগে প্রোটিন। যা আদতে একটি জৈব যৌগ (অরগ্যানিক কম্পাউন্ড)। কিন্তু যেটা অনেকেরই জানা নেই, তা হল- আমাদের শরীরের বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে প্রোটিনই।

প্রোটিন অনেক সময়েই আমাদের বন্ধু হয়। ঠিকঠাক ভাবে শারীরিক কার্যকলাপকে চালিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। তা সে স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেমকে চালানোই হোক বা শরীরে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার হানাদারি রোখা, সব কাজই আদতে করে প্রোটিন। আর আলাদা আলাদা ভাবে সেই প্রোটিনগুলিকে ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ চালায় আমাদের শরীরের আলাদা আলাদা জিন। কোনও ওযুধকে শরীরে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় প্রোটিন। আবার কখনও কখনও করে উল্টো কাজটাও। কোনও ওষুধকে শরীরে তার ‘টার্গেটে’ পৌঁছতে দেয় না।

আরও পড়ুন- নিজের সন্তান নিজেই গিলে খাচ্ছে বিশাল একটা তারা, উবে যাচ্ছে গ্রহ!

এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে প্রোটিনই হয়ে ওঠে ‘ঘরশত্রু বিভীষণ’! প্রোটিনই পারে কোনও ওষুধকে অকেজো করে দিতে। পারে তাকে ‘নির্বিষ’ করে দিতে। কখনও কখনও প্রোটিনই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াদের সামনে দরজাটা হাট করে খুলে দেয় হানাদারি চালানোর জন্য!

নানা রকম প্রোটিনের চেহারা, ভাঁজ, কাজ কেমন? দেখুন ভিডিও 

কী ভাবে তৈরি হয় প্রোটিন, তার কতটা গুরুত্ব, বোঝাচ্ছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিজয় পাণ্ডে। দেখুন ভিডিও

তাই হাজারো প্রোটিনের মতিগতি, চালচলন, আচার-আচরণ বোঝাটা খুব দরকার হয়ে পড়ে বিজ্ঞানীদের। প্রয়োজন হয়ে পড়ে নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কারের জন্যও। আর সে সবের জন্য এত দিন শুধুই চোখের ওপর ভরসা করেছেন গবেষকরা। খুব ছোট, ছোট, বড় আর খুব বড় চেহারার প্রোটিনগুলিকে দেখে তাদের মতিগতি, চালচলন, আচরণ বুঝতে চেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সে কাজটাও খুব সহজ ছিল না। ছোট ছোট প্রোটিনগুলিকে অণুবীক্ষণের তলায় রেখে দেখা যেত না বলে। তার জন্য হালে অবশ্য এনএমআর বা ক্রায়ো-ইএমের মতো শক্তিশালী ‘হাতিয়ার’ এসেছে বিজ্ঞানী, গবেষকদের হাতে।

আরও পড়ুন- আসছে ডেঙ্গি, জিকা, ক্যানসারের নতুন ওষুধ, সৌজন্যে ক্রায়ো-ইএম

আর্থার মিলারের সেই নাটকটার কথা মনে আছে? যেখানে সুদূর জার্মানি থেকে হঠাৎ আসা এক মহিলার টেলিফোন পেয়েই তাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন ইতালীয় যুবক বার্তোলুচি। সেই মহিলার সুরেলা গলা শুনেই বার্তোলুচ্চি বলেছিলেন, ‘‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট হিয়ারিংটা অনেক বেশি সহজ। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটে খুঁত ধরা পড়তে পারে। আবার সেটা কম ঠাওর করা যায় বলেই লাভ অ্যাট ফার্স্ট হিয়ারিংটা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। হিসেব গুলিয়ে দিতে পারে।’’

যে ভাবে ডিএনএ থেকে ধাপে ধাপে তৈরি হয় প্রোটিন? দেখুন ভিডিও

কিন্তু প্রোটিনের গাওয়া গানের ‘ফার্স্ট হিয়ারিং’-এ ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনাটা কমই থাকে। কারণ, তাদের চেহারা (ফোল্ড) আলাদা হলেই, সাজসজ্জা (পড়ুন, গঠনসজ্জা বা স্ট্রাকচার) আলাদা হলেই তারা গান গায় আলাদা আলাদা সুরে। আলাদা আলাদা তালে, ছন্দে। আলাদা আলাদা রাগে। এমনকী, শরীরে তারা কোন রাসায়নিক, উৎসেচক (এনজাইম) বা অন্য কোনও মৌল/যৌগের সঙ্গে কতটা ভাব-ভালবাসার সম্পর্কে জড়াবে (বিক্রিয়া) বা আদৌ জড়াবে কি না, শরীরের ভেতরের কোন রাসায়নিকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা মাখোমাখো হবে বা হবে না, শত্রুদের সঙ্গে লড়ার জন্য কোন ওষুধকে সে কতটা কাজ করতে দেবে বা দেবে না, প্রোটিনদের গাওয়া বিভিন্ন সুরের গানের তাল, ছন্দ, রাগ শুনেই তা বুঝে ফেলা যাবে, সহজেই। এমনটাই দাবি দুই গবেষক রবার্ট বাইওয়াটার ও জোনাথন মিডলটনের।

আরও পড়ুন- মাছও যেন জলপরী! প্রমাণ করে চমকে দিলেন বাঙালি কন্যা

আনন্দবাজারের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ইস্টার্ন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ জোনাথন মিডলটন ই-মেলে লিখেছেন, ‘‘দেখার চেয়ে শুনেই হাজারো প্রোটিনের জটিল রহস্যের জাল কেটে ফেলার কাজটা অনেক সহজ হবে। আর সব কাজই বা চোখকে করতে হবে কেন? কান যদি কিছু কিছু কাজ শেয়ার করতে পারে, অনায়াসে করে দিতে পারে, তা হলে চোখ দিয়ে আমরা অন্য কাজগুলি করতে পারি, যেগুলি কানে শুনে হয় না।’’


আরও এক ধরনের প্রোটিন অণুর ত্রিমাত্রিক চেহারা

গবেষকরা যে পদ্ধতিতে এই প্রায় অসাধ্যসাধনটা করেছেন বলে দাবি, তার নাম- ‘সোনিফিকেশন’।

আনন্দবাজারের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ব্রিটেনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের বায়োইনফর্ম্যাটিক্স বিভাগের অধ্যাপক বাইওয়াটার ই-মেলে লিখেছেন, ‘‘কোন প্রোটিনের চেহারা কেমন, বড় না ছোট, তা ভারী না হাল্কা, তার শরীরের অণুগুলি কী ভাবে সাজানো (গঠনসজ্জা) বা তাঁদের ভাঁজগুলি (ফোল্ড) কেমন, কী ভাবে সাজানো আছে প্রোটিনগুলির শরীর, সেই তথ্যগুলিকে (ডেটা) সুরে, তালে, ছন্দে বদলে ফেলতে পেরেছি আমরা। প্রোটিনগুলির শরীর আর তাদের আলাদা আলাদা আচার-আচরণ নতুন নতুন সুর, তাল, ছন্দের জন্ম দিতে পেরেছে। এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা।’’

গবেষকরা আসলে তিনটি প্রশ্নের উত্তর পেতে চেয়েছিলেন। সেগুলি কী কী?

প্রথমত, প্রতিটি প্রোটিনের চেহারা, চরিত্র, আচার-আচরণের বৈচিত্র নিয়ে আলাদা আলাদা সুর, তাল, ছন্দের জন্ম দেওয়া সম্ভব হলে, তা শুনতে কেমন লাগে?

দ্বিতীয়ত, সেই আলাদা আলাদা সুর, তাল, ছন্দের ‘পথ’ ধরে প্রোটিনগুলির মতিগতি, চালচলন ঠিকঠাক ভাবে বোঝা যায় কি?

তৃতীয়ত, প্রোটিনগুলির গাওয়া গানের সেই আলাদা আলাদা সুর, তাল, ছন্দ তাদের চেহারা, চরিত্র, মতিগতি, চালচলনের ফারাকটাকে সত্যি-সত্যিই ফুটিয়ে তুলতে পারে কি? পারে কি সে সব নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলতে? 

গবেষকরা তাঁদের ‘সোনিফিকেশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে যেটা করেছেন, তা হল-প্রোটিনের চেহারা, চরিত্র, চালচলন, মতিগতি সম্পর্কে যে তথ্যগুলি এত দিন সারণীতে (টেবিল) সাজিয়ে রাখতেন, গ্রাফ এঁকে বুঝতে চাইতেন তাদের আদবকায়দার ফারাকটা আর সেই সব তথ্যের ভিত্তিতে কম্পিউটার সিম্যুলেশন করে প্রোটিনগুলির শরীরে ‘লুকিয়ে থাকা’ যাবতীয় রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করতেন, সেই তথ্যগুলি দিয়েই প্রোটিনদের গাওয়া গানের সুরের ভিতটা, সা রে গা মা পা... তৈরি করেছেন। তৈরি করেছেন ‘বসন্ত’ থেকে ‘খাম্বাজ’ বা ‘ভৈরবী’র মতো নানা রাগ!

কেমন শুনতে লাগে প্রোটিনের ‘গান’? দেখুন, শুনুন

এক জন সুরকার যেমন তাঁর পছন্দ মতো রাগে বা সুরে কথাগুলিকে বসিয়ে নিয়ে গান বাঁধেন, ঠিক তেমনই ওই ভিন্ন ভিন্ন সুর, তাল, ছন্দে গান গেয়ে প্রোটিনগুলি এ বার আমাদের বুঝিয়ে দিতে পারবে একে অপরের থেকে তারা কোথায় কোথায় আলাদা, কেন ও কী ভাবে তারা এক এক রকমের।  

মূল গবেষক বাইওয়াটারের কথায়, ‘‘প্রোটিনের গাওয়া গানের সুরগুলিও দারুণ দারুণ সব মেলোডি। যা শুনতে খুব ভাল লাগে। অসম্ভব সুরেলা। কোনও জগঝম্প নেই। শুনতে ভাল লাগে বলে বিজ্ঞানী, গবেষকরা সেই সব সুর বার বার শুনতে চাইবেন। আর বার বার শুনলে প্রোটিনগুলির ফারাক বোঝার কাজটাও তাঁদের অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমরা সেই ‘সোনিফিকেশন’টা করেছি একটা ওয়েব-বেসড সফটওয়্যার ‘মিউজিক্যালগরিদ্‌মস’ দিয়ে।’’

কাজটা সহজ হবে কী ভাবে?

‘আকাশ ভরা সূর্য তারা...’ গানটা জর্জ (দেবব্রত) বিশ্বাসের গলায় শোনার অভিজ্ঞতা এক রকম। আবার তা অর্ঘ্য সেন বা সাগর সেনের গলায় শোনার অভিজ্ঞতাটা একেবারেই অন্য রকম। শিল্পীদের গায়কীর ধরনটা আলাদা বলে। আবার জর্জ বিশ্বাসের যে একটা বিশেষ ধরনের শারীরিক অসুবিধা ছিল, সেটাও ওই গানটা তাঁর গাওয়ার সময় কিছুটা ধরা পড়ে যেত। তার মানে, একই সুর, তাল, ছন্দ, রাগের গানও শিল্পীদের গলা বা গায়কীর তারতম্যে শুনতে একে অন্যের থেকে অন্য রকম লাগে। আবার অনেকেই গেয়েছেন এমন কোনও গান, হঠাৎ করে শুনলে আমরা এখনও বলে উঠি, ‘এটা কণিকার (বন্দ্যোপাধ্যায়) গাওয়া’ বা ‘ওটা সন্ধ্যার (মুখোপাধ্যায়)’। কারণ, ওঁদের গায়কীটাই আমাদের মনে ধরেছে। স্মৃতি রেকর্ড করে রেখেছে, অনেকে গাইলেও।


(বাঁ দিক থেকে) প্রোটিন গবেষক রবার্ট বাইওয়াটার, স্বাগতা ঘোষ, জোনাথন মিডলটন ও পৃথা ঘোষ

বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্স (এনসিবিএস)-এর প্রোটিন গবেষক, রিসার্চ সায়েন্টিস্ট স্বাগতা ঘোষ যেমন বলছেন, ‘‘একই সুরের গান যেমন বিভিন্ন শিল্পীর গলায় শুনতে অন্য রকম লাগে, তেমনই এমন কিছু প্রোটিন রয়েছে, যাদের ভাঁজগুলি এক হলেও তাদের কাজকর্ম, চালচলন আলাদা হয়। প্রোটিনের শরীর কোন কোন অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে গড়া, সেই অ্যামাইনো অ্যাসিডের অণুগুলি প্রোটিনদের শরীরে কী ভাবে সাজানো আছে, তারা কার সঙ্গে কতটা, কী ভাবে বিক্রিয়া করবে বা করবে না, সেই সবের প্রেক্ষিতেই তাদের কাজকর্ম আলাদা হয়ে যায়।’’

তাই একই ‘ভৈরবী’ রাগে যেমন আলাদা আলাদা সুরের গান বাঁধা যায়, ঠিক তেমনই প্রোটিনদের শরীরের ভাঁজগুলি একই রকম হলেও তারা কাজ করতে পারে আলাদা আলাদা ভাবে।

আবার আলাদা আলাদা অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে শরীর গড়া হলেও দু’টি প্রোটিনের ভাঁজ একই রকম হতে পারে। গানের সুরের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। তাই প্রতিটি প্রোটিনের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে গানের ‘নোট’ তৈরি করা যেতেই পারে। তৈরি করা সম্ভব।

সব মানুষেরই যেমন দু’টো হাত, দু’টো পা, দু’টো চোখ, দু’টো কান থাকে, তা তিনি পুরুষ হোন বা মহিলা, সব প্রোটিনেরও তেমনই একটা স্বাভাবিক জ্যামিতি থাকে। বলা ভাল, একটা নির্দিষ্ট জ্যামিতি থাকে। কোনও মানুষকে যেমন ডাইনোসরের মতো দেখতে হয় না, তেমনই কোনও প্রোটিনের চেহারার সঙ্গে অবিকল মিলে যেতে পারে না কোনও কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাটি অ্যাসিডের চেহারাও।  

এনসিবিএসের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো পৃথা ঘোষের ব্যাখ্যায়, ‘‘সা রে গা মা পা দিয়ে যেমন নানা রঙের নানা সুর, তাল, ছন্দের গান বাঁধা যায়, তেমন ভাবে ২০টি অ্যামাইনো অ্যাসিডও পারম্যুটেশন-কম্বিনেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন বানাতে পারে।’’

গান অন্যতম উপায়, কিন্তু একমাত্র নয়...

তবে শুধু প্রোটিনের গাওয়া গানের ঝর্নাতলায় সব রহস্যের জট খুলে যাবে, এমনটাও কিন্তু মনে করছেন না বিজ্ঞানী, গবেষকরা। তাঁরা বলছেন, গান অন্যতম উপায় হতে পারে। কিন্তু সেটাই একমাত্র উপায় হতে পারে না।

স্বাগতার কথায়, ‘‘প্রোটিনের সাজসজ্জা (সিকোয়েন্স), চেহারা (স্ট্রাকচার), কাজকর্ম (ফাংশন) বোঝার জন্য গত কয়েক দশকে বহু পদ্ধতির ব্যবহার হয়েছে। হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে বায়োকেমিক্যাল মেজারমেন্টস, মাস স্পেকট্রোমেট্রি, ক্রিস্টালোগ্র্যাফি, এনএমআর (নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপি), ক্রায়ো-ইএম ও প্রোটিওমিক্স। সবগুলি পদ্ধতিতে পাওয়া তথ্যকে জুড়ে যেমন এত দিন আমরা প্রোটিনকে জানতে, বুঝতে চেষ্টা করেছি, তেমনই এ বার আমাদের হাতে এল একটি নতুন পদ্ধতি। সোনিফিকেশন।’’


বিভিন্ন ধরনের প্রোটিনের হরেক রকমের কাজকর্ম। সৌজন্যে: ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউট, ব্রিটেন

তবে শুধুই গান শুনে সবটা বোঝা যাবে না। তার সঙ্গে জুড়তে হবে চালু অন্য পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলি। তবেই প্রোটিনের সার্বিক ছবিটা পাওয়া যাবে। অনেক বেশি নির্ভুল ভাবে।

প্রোটিনদের চেনা, জানার কাজটা কি এ বার সহজ হল?

কেন শিশুরা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করে, বলুন তো? চেঁচিয়ে পড়লে তারা যা পড়ছে, সেটা তাদের কানে ঢোকে। আর কানে ঢুকলেই পড়াটা তাদের অনেক তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়ে যায়। বেশি বার পড়তে হয় না। বার বার পড়ে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও সে ক্ষেত্রে অনেকটাই কম থাকে।

প্রোটিনদের গাওয়া গান শোনাটাও তাই খুব জরুরি। পৃথা বলছেন, ‘‘একটা সুনির্দিষ্ট গঠনসজ্জার প্রোটিনের একটা নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডাইমেনশনাল) চেহারা থাকে। আর সোনিফিকেশনের মাধ্যমে সেই চেহারাটা বা তাদের চেহারাগুলির ফারাকটা কিছুটা সহজে বোঝা সম্ভব। তবে এই সোনিফিকেশন পদ্ধতিতে প্রোটিনের রহস্যের জাল ছেঁড়ার কাজটা কতটা সহজ হল, তা এখনই পুরোপুরি নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রোটিনকে চেনা, জানা, বোঝার আরও একটা পদ্ধতি আমাদের হাতে এল। আর সেই নতুন পদ্ধতি কাজটাকে কতটা সহজ করে তুলল, তা বুঝতে আরও একটু সময় লাগবে।’’

তার অন্য কারণও আছে। স্বাগতা ও পৃথা দু’জনেরই বক্তব্য, প্রোটিনের ভাঁজগুলি নানা রকমের নানা ধরনের হয়। তা অত্যন্ত জটিলও। প্রোটিনের সব রকম ভাঁজই যে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, এমনও নয়। বরং সঠিক ভাবে বলতে হলে, হাজারো প্রোটিনের খুব সামান্য কয়েকটি ভাঁজই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও অনেক বেশি জটিল প্রোটিনের জটিলতর ফোল্ড বা ভাঁজের রহস্যের জট সোনিফিকেশন পদ্ধতিতে খোলা যাবে কি না, বা তা কতটা খোলা সম্ভব হবে, সেটাও দেখতে হবে।

আরও পরীক্ষা দিতে হবে এই ‘সোনিফিকেশন’ পদ্ধতিকে। কেন?

দুই মূল গবেষক বাইওয়াটার ও মিডলটন দু’জনেই আনন্দবাজারকে পাঠানো ই-মেলে স্বীকার করেছেন, ‘‘আমরা এখনও পর্যন্ত মাত্র তিন ধরনের প্রোটিন সিকোয়েন্স (আলফা-হেলিক্স, বিটা-স্ট্র্যান্ডস ও মিক্সড আলফা/ বিটা টাইপ) নিয়েই এই কাজটা করেছি। পরখ করে দেখেছি। আরও অনেক অনেক সিকোয়েন্স রয়েছে প্রোটিনের। সেগুলি আরও অনেক জটিল বা জটিলতর। তাই ওই তিনটি সিকোয়েন্সই শেষ কথা নয়। হাজার হাজার প্রোটিন রয়েছে। আর পারম্যুটেশন-কম্বিনেশনের মাধ্যমে তাদের লক্ষ লক্ষ রকমের চেহারা ও চরিত্র থাকা সম্ভব। আলাদা আলাদা গানের সুর, তাল, ছন্দ, রাগে তাদের সবগুলিকেই চেনা, বোঝা যাবে কি না, তা এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয়। বরং তা জটিলতর হওয়ারই সম্ভাবনাটা বেশি। ফলে, আমাদের অারও অনেক দূর যেতে হবে।’’


বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন: কে কেমন দেখতে...

গবেষণাপত্রেও সেই ইঙ্গিতটা দিয়েছেন দুই মূল গবেষক বাইওয়াটার ও মিডলটন। এই সোনিফিকেশন পদ্ধতির সার্বিক সাফল্যের জন্য দরকার তাকে বৃহত্তর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা। পরখ করে নেওয়া।

স্বাগতা ও পৃথার কথায়, ‘‘দেখতে হবে, ডিএনএ (ডিঅক্সি রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) বা আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) অণুগুলিকেও এই ভাবে গানের সুরে সুরে আলাদা ভাবে চেনা, জানা, বোঝা যায় কি না। দেখতে হবে তা সুজটিল জিনোমের জট খোলার কাজেও লাগে কি না।’’

তাই আর্থার মিলারের চরিত্র বার্তোলুচি হয়তো কিছুটা ঠিকই বলেছিলেন! হয়তো বা একটু বাড়িয়েও বলেছিলেন! আবেগের আতিশয্যে!

শুনেই পুরোপুরি প্রেমে পড়ে যাওয়া সম্ভব না হলেও, গানের সুর, তাল, ছন্দই প্রোটিনের ‘মন’ বোঝার দরজাটা বোধহয় খুলে দিতে পারে। অন্তত, প্রাথমিক ভাবে।

সুর যে সব সময়েই অসুরবিনাশী!

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে: ইস্টার্ন ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি (আমেরিকা) ও ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউট (ব্রিটেন)